ইতিহাস গড়ে টানা দুই মৌসুমে গোল্ডেন বুট জিতলেন মেসি 

মেজর লিগ সকারের নিয়মিত মৌসুমের শেষ ম্যাচে ইন্টার মায়ামি জয় না পেলেও ব্যক্তিগত প্রাপ্তির খাতায় ঠিকই এক অভূতপূর্ব মাইলফলক যোগ করেছেন লিওনেল মেসি। টানা দ্বিতীয়বারের মতো এমএলএসের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘গোল্ডেন বুট’ নিজের নামে নিশ্চিত করেছেন তিনি। লিগের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ব্যাক-টু-ব্যাক গোল্ডেন বুট জেতার এই অনন্য রেকর্ড গড়লেন আটবারের ব্যালন ডি'অর জয়ী এই ফরোয়ার্ড।

এমএলএস নিয়মিত মৌসুমে ৩১ ম্যাচে (২৯টি শুরুর একাদশে) মাঠে নেমে লিগ সর্বোচ্চ ২৬টি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ১৭টি গোল। অর্থাৎ, ৪৩টি গোলে সরাসরি অবদান রেখে গোল ও অ্যাসিস্ট, উভয় তালিকাতেই শীর্ষে থেকে মৌসুম শেষ করলেন গত মাসে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়া এই ফুটবল জাদুকর। 

নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এফসি ডালাসের ক্রোয়েশিয়ান ফরোয়ার্ড পেটার মুসাকে (২২ গোল) ৪ গোলের স্পষ্ট ব্যবধানে পেছনে ফেলে এককভাবে এই শীর্ষস্থান ধরে রাখেন তিনি। মেসির এই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের প্রশংসায় মায়ামির প্রধান কোচ ক্রিস্টিয়ান ‘কিলি’ গঞ্জালেস সম্প্রতি এক প্রেস কনফারেন্সে বলেছিলেন, ‘আমার মতে মেসিই সর্বকালের সেরা, এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। সতীর্থদের প্রতি তাঁর সম্মানের জায়গায় কারও সঙ্গে তাঁর তুলনা চলে না।’ 

ঈর্ষণীয় ধারাবাহিকতা ও অতীতের সাফল্য

মেসির এই সাফল্য কেবল চলতি মৌসুমেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং গত কয়েক বছর ধরে মেজর লিগ সকারে তাঁর আধিপত্য অবিসংবাদিত। এর আগে ২০২৫ সালের মৌসুমেও দুর্দান্ত ফর্মে থেকে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন তিনি। সেবার মাত্র ২৮টি নিয়মিত মৌসুমের ম্যাচে মাঠে নেমে ২৮ গোল করার পাশাপাশি লিগ সর্বোচ্চ ১৯টি অ্যাসিস্ট করেছিলেন এই আর্জেন্টাইন জাদুকর। সেবার ডেনিস বাউঙ্গা এবং স্যাম সারিজ ২৪টি করে গোল করে তাঁর পেছনে থাকলেও মেসির ধারেকাউরে কেউ পৌঁছাতে পারেননি। ২০২৫ সালের সেই নান্দনিক পারফরম্যান্সের সুবাদেই তিনি বছরের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘এমভিপি’অর্জন করেছিলেন।

শুধু তা-ই নয়, মায়ামির জার্সিতে নিজের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মৌসুম অর্থাৎ ২০২৪ সালেও লিগের সেরা খেলোয়াড় বা এমভিপি নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন মেসি। বর্তমান ফর্ম ও দুর্দান্ত স্ট্যাটাস বিবেচনায় চলতি ২০২৬ সালেও তিনি এমভিপি পুরস্কার জয়ের দৌড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী ও স্পষ্ট ফেভারিট হিসেবে টিকে আছেন। যদি তিনি এবারও এই স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হন, তবে এমএলএসের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা তিনবার এমভিপি জেতার এক অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড নিজের নামের পাশে লিখে ফেলবেন এই মহাতারকা।

৩-০ থেকে শার্লটের নাটকীয় ঘুরে দাঁড়ানো

নিয়মিত মৌসুমের শেষ ম্যাচে আজ ঘরের মাঠ নু স্টেডিয়ামে শার্লট এফসির মুখোমুখি হয়েছিল মায়ামি। শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের গ্লাভসে রাখে মেসিরা। ১৪তম মিনিটে মেসির একটি কর্নার কিক শার্লটের লুকা দে লা তরে ঠিকঠাক ক্লিয়ার করতে না পারলে সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইয়ান ফ্রে প্রথম গোলটি করেন। ৩৩তম মিনিটে মেসির নেওয়া আরও একটি কর্নার থেকে লুইস সুয়ারেজ দারুণ হেডে ব্যবধান ২-০ করেন। এরপর ৪২তম মিনিটে বক্সের বাহির থেকে রদ্রিগো ডি পলের দূরপাল্লার জোরালো শটে ৩-০ গোলের বড় সুবিধা নিয়ে বিরতিতে যায় স্বাগতিকরা।

ডি পল-সুয়ারেজদের নৈপূণ্যে ৪২ মিনিটেই ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছিল মায়ামি, তবে নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ড্র করে শার্লট, ছবি: সংগৃহীত

তবে বিরতির পর খেলার গতিপথ পুরোপুরি পাল্টে যায়। ৫০ ও ৫৫তম মিনিটে লিয়েল আবাদা জোড়া গোল করে শার্লটকে ম্যাচে ফেরান। এরপর ম্যাচের ৯০তম মিনিটে টাইগার স্মলসের শট পোস্টে লেগে ফেরত আসলে রিবাউন্ডে গোল করে রদোলফো আলোকো ৩-৩ সমতা আনেন। ইনজুরি টাইমে মেসির একটি শট পোস্টে লেগে ফেরত আসলে জয়বঞ্চিত থাকতে হয় মিয়ামিকে। ৩-৩ গোলের এই ড্রয়ের পরও ৬০ পয়েন্ট নিয়ে ইস্টার্ন কনফারেন্সের পয়েন্ট তালিকায় দ্বিতীয় স্থান নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে মেসি বাহিনী।

প্লে-অফে যেভাবে এগোবে মেসিরা

নিয়মিত মৌসুমের রোমাঞ্চকর লড়াই শেষে এবার শুরু হচ্ছে আসল পর্ব, এমএলএস কাপের প্লে-অফ। ইস্টার্ন কনফারেন্সে ৬০ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকা মায়ামি প্রথম রাউন্ডের ‘বেস্ট-অফ-থ্রি’ সিরিজে সপ্তম বাছাই কলম্বাস ক্রুর মুখোমুখি হবে। ঘরের মাঠে ম্যাচ দিয়ে প্লে-অফ অভিযান শুরু করার সুবিধা পাবে মায়ামি।

মেসিদের লিগে কনফারেন্সে সেরা দল হিসেবে ৭৭ পয়েন্ট তুলে ইতিহাস গড়েছে ন্যাশভিল এসসি, যা ২০২৪ সালে করা মায়ামির ৭৪ পয়েন্টের রেকর্ডটি ভেঙে দিয়েছে। প্লে-অফের প্রথম পর্বে ইস্টার্ন কনফারেন্সে অন্য ম্যাচগুলোতে মুখোমুখি হবে নিউ ইংল্যান্ড ও ফিলাডেলফিয়া এবং শার্লট ও শিকাগো। অন্যদিকে ওয়েস্টার্ন কনফারেন্সে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করেছে ভ্যাঙ্কুভার, যারা প্লে-অফে সিয়াটল ও সল্টলেকের মধ্যকার ওয়াইল্ড-কার্ড বিজয়ীর মুখোমুখি হবে।