জলাশয়ে কচুরিপানা জমিয়ে তৈরি করা ভাসমান বেডে সবজি ও বিভিন্ন জাতের চারা উৎপাদন করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন পিরোজপুরের নাজিরপুর ও পার্শ্ববর্তী নেছারাবাদ উপজেলার কৃষকেরা। প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই কৃষিপদ্ধতিকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। এতে পুরুষদের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীরাও যুক্ত হয়েছেন কৃষিকাজে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এই কৃষিপদ্ধতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ ভাসমান কৃষি ও সবজির চারা উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে পিরোজপুর শহর থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ী দোবরা ইউনিয়নের বৈঠাকাটা বাজারসংলগ্ন মুগারঝোর গ্রামে। এ ছাড়া উপজেলার কলারদোয়ানিয়া, মালীখালী এবং নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামেও বিস্তৃত হয়েছে এই কৃষিকাজ।
বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকায় প্রায় ছয় মাস পানি জমে থাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে জমিতে সবজি চাষ ও চারা উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়ে। এ সমস্যার বিকল্প হিসেবে স্থানীয় কৃষকেরা জলাশয়ের পানিকেই চাষাবাদের মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন।
ভাসমান বেড তৈরির জন্য বর্ষার শুরুতে খাল-বিলের কচুরিপানা একত্র করে পচানো হয়। পরে কয়েক স্তরে সাজিয়ে ২ থেকে ৩ ফুট পুরু এবং ৫০ থেকে ১০০ ফুট লম্বা ধাপ তৈরি করা হয়। এসব ধাপে শসা, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, বরবটি, করলা, টমেটো, চালকুমড়া ও বেগুনের বীজ বপন করে চারা উৎপাদন করা হয়। পাশাপাশি লালশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক ও পুঁইশাকও চাষ করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর মৌসুমে ভাসমান বেডে বিভিন্ন জাতের প্রায় এক কোটি সবজির চারা উৎপাদিত হয়। এসব চারা বিক্রি করে আয় হয় প্রায় ১০ কোটি টাকা। জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চলে এই উৎপাদন ও বেচাকেনা। এখানকার চারা ও তাজা সবজি দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সরবরাহ করা হয়। দক্ষিণাঞ্চলের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চল থেকেও কৃষকেরা চারা কিনতে আসেন। বর্তমানে এই পেশার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন প্রায় ছয় হাজার কৃষক।
ভাসমান কৃষির গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ সামলান গ্রামের নারীরা। পুরুষেরা যখন জলাশয়ে ধাপ তৈরি ও যাতায়াতের কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন নারীরা লতা সংগ্রহ, ম্যাদা তৈরি, বীজ বপন এবং চারার পরিচর্যা করেন। বাড়ির আশপাশে কিংবা জলাভূমির কাছে বসেই চলে তাঁদের এসব কাজ।
স্থানীয় কৃষকদের এই ভাসমান চাষাবাদের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় উদ্ভাবনী কৌশল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) নাজিরপুর ও নেছারাবাদের এই কৃষিপদ্ধতিকে ‘গ্লোবাল ইম্পর্ট্যান্ট এগ্রিকালচারাল হেরিটেজ সিস্টেম’ (জিআইএএইচএস) বা বিশ্ব গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ঐতিহ্য পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ভাসমান কৃষিকে ঘিরে নাজিরপুরের বৈঠাকাটা হাটেও গড়ে উঠেছে জমজমাট বাজার। শনিবার ও মঙ্গলবার বসা এই হাটে ভোর থেকেই নদীর বুকে সারি সারি নৌকায় চলে জলজ উদ্ভিদ কেনাবেচা। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে বিক্রেতারা নৌকায় করে এসব উপকরণ নিয়ে আসেন। কৃষকেরা সেখান থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনে ভাসমান বেড তৈরির কাজ শুরু করেন।
হাটে শ্যাওলা বিক্রি করতে আসা বাগেরহাটের চিতলমারীর আরমান খান (৪৫) বলেন, তিনি চিতলমারী থেকে শ্যাওলা নিয়ে এসে বিক্রি করেন। প্রতি কুড়ি শ্যাওলা ১৬০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হয়। বেচাকেনা মোটামুটি ভালো। ভালো দিনে আট থেকে নয় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে বাজার খারাপ থাকলে বিক্রি কমে যায়।
শ্যাওলা কিনতে আসা আব্দুল কাইউম মোল্লা (৩৩) বলেন, ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদনের জন্য শ্যাওলা কিনতে এসেছেন। এসব শ্যাওলা দিয়ে বেড তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও চারা উৎপাদন করবেন।
দেউলবাড়ী দোবরা ইউনিয়নের মুগারঝোর গ্রামের কৃষক আসলাম ফকির (৫৫) জানান, গত সাত থেকে আট বছর ধরে তিনি ভাসমান বেড তৈরি ও সবজির চারা উৎপাদন করছেন। নিজের কাজের পাশাপাশি গ্রামের অসচ্ছল ও কর্মহীন মানুষদেরও এ কাজে যুক্ত করেছেন। বর্তমানে তাঁর উদ্যোগে অনেকেই কাজ করছেন।
তিনি বলেন, এলাকায় অনেক অসহায় পরিবার রয়েছে। তাঁদের ভাসমান পদ্ধতিতে চারা উৎপাদনের কাজে যুক্ত করতে চান। এ জন্য বিনা সুদে ঋণ প্রয়োজন। সরকার এ ধরনের ঋণের ব্যবস্থা করলে এলাকার বেকার তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
পার্শ্ববর্তী বলদিয়া গ্রামের নারী শ্রমিক মিনারা বেগম (৩৬) বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করেও তিনি মাত্র ২০০ টাকা মজুরি পান। এক হাজার ম্যাদা তৈরি করে পাওয়া যায় ১৫০ টাকা। এত কম আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। নারীদের অন্য কাজের সুযোগ না থাকায় তাঁরা এই কাজ করছেন। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে তাঁদের জন্য ভালো হতো।
পিরোজপুরের কাউখালী বাজারের সবজির চারা বিক্রেতা মান্নান বেপারী (৫২) বলেন, তিনি নাজিরপুরের ভাসমান বেড থেকে প্রতি পিস চারা পাঁচ থেকে সাত টাকায় কিনে আনেন। পরে বাজারের দিনে বিভিন্ন জাতের সবজির চারা ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি করেন।
জাত, আকার, চাহিদা ও বাজারের ওপর ভিত্তি করে চারার দাম ওঠানামা করে। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দামের পার্থক্য থেকে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে বিক্রেতাদের আয় হয়। এভাবে চারা উৎপাদনকারী কৃষক, পাইকার, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও খুচরা বিক্রেতাদের নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
তবে এই কৃষিকে আরও লাভজনক করতে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। তাঁদের মতে, দূর-দূরান্তে চারা ও পচনশীল সবজি সরবরাহের জন্য উন্নত পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি মৌসুমি মূলধনের সংকট কাটাতে সহজ শর্তে স্বল্প সুদে বা সুদমুক্ত ঋণ এবং আধুনিক বীজ সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক কীটনাশক ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, নাজিরপুর ও নেছারাবাদে ভাসমান বেডে উৎপাদিত সবজির চারা খুলনা, যশোর, ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। কৃষি অফিস থেকে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত কৃষকদের নিয়মিত প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।