স্যান্ডপেপার নিয়ে বোমা ফাটাবেন, ওয়ার্নারকে কথা দিয়েছিলেন খাজা 

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে পরিচিত ২০১৮ সালের কেপটাউন টেস্টের সেই বল টেম্পারিং কেলেঙ্কারি বা 'স্যান্ডপেপার গেট' নিয়ে দীর্ঘ সময় পর মুখ খুলেছেন উসমান খাজা। নিজের আত্মজীবনী ‘সবর’ প্রকাশের প্রাক্কালে নাইট নিউজপেপার্স ও নিউজ কর্পকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এবং পরবর্তীতে নিজের ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে খাজা এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন, যা ক্রিকেট বিশ্বে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। 

আর এই পুরো সত্য প্রকাশের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি ছিল শৈশবের বন্ধু ও দীর্ঘদিনের ওপেনিং পার্টনার ডেভিড ওয়ার্নারকে দেওয়া তাঁর সেই বিশেষ প্রতিশ্রুতি, যে কথা তিনি শুরু থেকেই ওয়ার্নারকে দিয়ে রেখেছিলেন এবং সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতেই ৮ বছর পর তিনি এই সত্যগুলো প্রকাশ্যে এনেছেন বলে সগর্বে জানিয়েছেন।

শৈশবের বন্ধুকে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করে নিজের ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে উসমান খাজা বলেন, ‘আমি আমার শৈশবের বন্ধু ডেভিড ওয়ার্নারকে কথা দিয়েছিলাম যে আমি সত্যিটা বলব, যাতে সেও তার গল্পটা বলতে পারে। এর জন্য আমি ১০০ ভাগ ক্ষমাহীন বা বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নই।’ 

পুরো ঘটনার গভীরে গিয়ে খাজা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যে, সেদিনের সেই ঘটনার সব দায় এককভাবে স্টিভ স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নার ও ক্যামেরন ব্যানক্রফটের ওপর চাপিয়ে দিলেও আদতে তারা কেউ একক অপরাধী নন, বরং তারা ছিলেন পুরো দলের অন্যায়ের ‘ভুক্তভোগী’। 

খাজা আরও জোরালোভাবে যোগ করেন, ‘আমি কাউকে বাসের নিচে (নিজের স্বার্থ বাঁচাতে বা নিজের দোষ ঢাকতে অন্য কাউকে বিপদে ফেলা) ফেলে দিচ্ছি না। বর্তমান দলের সদস্য এবং তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে থাকা আমরা কেউই ভুক্তভোগী নই। ওই তিনজন আমাদের সবার দায়ভার নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছিল। তারাই আসল ভুক্তভোগী। মানুষ তাদের প্রতারক বলেছে, মাঠে গ্যালারির দর্শকদের কটূক্তি শুনতে হয়েছে এবং প্রকাশ্যে চরম অপমানিত হতে হয়েছে।’

বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো আসা এই কেলেঙ্কারির পর খাজা নতুন করে প্রকাশ করেছেন যে, ঘটনার পরপরই তিনি মিডিয়ার সামনে সব সত্যি বলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ নিজেই সব দায় নিজের কাঁধে নিতে চাওয়ায় এবং বারণ করায় সে যাত্রায় তিনি আর মুখ খুলতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে ইনস্টাগ্রামে খাজা বলেন, ‘স্মাজ (স্মিথ) যেমন নেতা ছিল, সে আমাকে মিডিয়ার সামনে মুখ খুলতে মানা করে। সে একাই সব দায় নিজের ঘাড়ে নিতে চেয়েছিল। আমি ওর সঙ্গে তর্ক করেছিলাম, কিন্তু সে কোনোভাবেই আমার কথা শোনেনি। সেটাই ছিল আমার প্রথমবার সত্যিটা বলতে চাওয়ার চেষ্টা।’ 

পরবর্তীতে ২০২১ সালে ক্যামেরন ব্যানক্রফট দ্য গার্ডিয়ান-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দেন যে, সে সময় বোলারদেরও বল টেম্পারিং সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা ছিল। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অজি বোলাররা যখন নিজেদের নির্দোষ দাবি করে একটি যৌথ বিবৃতি দেন, তখন তা চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল ডেভিড ওয়ার্নার ও উসমান খাজার শিবিরে। এ প্রসঙ্গে নিজের বই ও ইনস্টাগ্রামের তথ্য টেনে খাজা জানান, ‘বোলারদের সেই যৌথ বিবৃতি আমাকে বেশ ক্ষুব্ধ করেছিল, কিন্তু ড্যাভির (ওয়ার্নার) মতো এতটা নয়। ওই রাতে আমি খুব গরম কিছু টেক্সট বার্তা পেয়েছিলাম। স্মাজ কেমন অনুভব করেছিল জানি না, তবে সেও যে রোমাঞ্চবোধ করেনি তা নিশ্চিত। তবে আমি তাদের সবার বিরুদ্ধে সে সময় যুদ্ধে নামতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করিনি, এটাই সত্যি।’ 

এত কিছু জানার পরও কেন তিনি এতদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার সময়ে মুখ খুলেননি, সেটিরও যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন খাজা। নিজের দীর্ঘ চার বছরের নীরবতার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি ভিডিওতে বলেন, ‘আমি কখনও এই বিষয়ে কথা বলা প্রথম ব্যক্তি হতে চাইনি। আপনারা আমাকে যা ইচ্ছা বলতে পারেন, কিন্তু দলে থাকা অবস্থায় কীভাবে এটা উত্থাপন করতাম যখন জানতাম আমার অনেক সতীর্থ এ নিয়ে কথা বলতে চায় না? আমি সর্বদা দলকে সবার আগে রাখার বিষয়ে সচেতন ছিলাম। তবে এখন আমি আর সেই দলে নেই। এখন আমার বলা কথায় দলের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না, এখন আমি কেবল আমার নিজের হয়ে কথা বলছি।’

সবশেষে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে খাজা দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘এই তিনজন মানুষ ন্যায়বিচার পাওয়ার যোগ্য এবং আমি কারোর দিকেই আঙুল তুলছি না। বহু বছর আগে যা খোঁজ করতে চেয়েছিলাম, আমি আজও সেটাই খুঁজছি, যাতে আমরা সবাই, আমিও সহ, দল হিসেবে একসঙ্গে এই দায় কাঁধে নিতে পারি এবং একবারের মতো এই অধ্যায় পার করে সামনে এগোতে পারি। আপনারা বিশ্বাস করুন বা না করুন, সুযোগ পেলে আমি এই কাজ আবার এক নিমেষে করে দেব।’