মার্কিন নির্বাচনে ৯৭ মুসলিম প্রার্থীর জয়ে নতুন রেকর্ড

২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জাতীয়, অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ে জয় পেয়েছেন ৯৭ জন মুসলিম আমেরিকান প্রার্থী।

৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তাদের এই সাফল্য দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে।

কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) ৫ নভেম্বর প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাবের ভিত্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।

সিএআইআরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট ১৬৮ জন মুসলিম আমেরিকান প্রার্থী দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনের বাধা পেরিয়ে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেন। তাদের মধ্যে জয়ী হন ৯৭ জন। আরও ১৫ জন তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তাদের চূড়ান্ত ফল এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ৮২ জন মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন। সে হিসাবে এবার জয়ীর সংখ্যা বেড়েছে। ২১ টি অঙ্গরাজ্যে তাদের এই সাফল্য ছড়িয়ে পড়েছে। জয়ীদের মধ্যে অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় নির্বাচিত হয়েছেন ৩৮ জন।

এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে যাচ্ছেন সাতজন মুসলিম আমেরিকান। তাদের একজন মিশিগান থেকে নির্বাচিত সিনেটর আবদুল এল-সাইয়েদ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সিনেটে তার মেয়াদ ছয় বছর। 

অন্য ছয়জন নির্বাচিত হয়েছেন প্রতিনিধি পরিষদে। তাদের মধ্যে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ইলহান ওমর, রাশিদা তালিব, আন্দ্রে কারসন ও লতিফা সিমন। নতুন করে নির্বাচিত হয়েছেন নিউ জার্সির অ্যাডাম হামাওয়ি এবং নিউইয়র্কের দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের। অ্যাডাম হামাওয়ি নিউ জার্সি থেকে প্রথম মুসলিম হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন।

এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে আয়েশা ওয়াহাব পুনর্নির্বাচনে এগিয়ে রয়েছেন। তিনি নিজের বিজয় ঘোষণা করলেও তার আসনের চূড়ান্ত ফলাফল নিশ্চিত হয়নি। তিনি জয়ী হলে কংগ্রেসে মুসলিম সদস্যের সংখ্যা আটজনে পৌঁছাবে।

কংগ্রেসের বাইরেও বিভিন্ন পর্যায়ে মুসলিম প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে ৩৯টি পদে, কাউন্টি ও পৌরসভা পর্যায়ে ১৬টি পদে এবং শিক্ষা ও স্কুল বোর্ডে ২৭টি পদে জয়ী হয়েছেন মুসলিম প্রার্থীরা।

এ ছাড়া আটজন বিচারিক পদে নির্বাচিত হয়েছেন। এসব ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের চিত্র তুলে ধরেছে।

নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীদের এই সাফল্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে রিপাবলিকান দলের কয়েকজন রাজনীতিকের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সমালোচনা করেছে।

সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেটের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং দ্য মুসলিম থ্রেট’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ৪৬ জন রিপাবলিকান নির্বাচিত কর্মকর্তা মুসলিম ও ইসলামকে লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ১ হাজার ১১১টি বিদ্বেষ ও ষড়যন্ত্রমূলক পোস্ট দিয়েছেন।

এ ধরনের বক্তব্য ও বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড মুসলিম ভোটারদের অংশগ্রহণ কমিয়ে দেবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। তবে নির্বাচনের ফলাফল ও ভোটার জরিপে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে।

সিএআইআর ও সিএআইআর অ্যাকশনের পরিচালিত জরিপে অংশ নেওয়া মুসলিম ভোটারদের ৯৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা ভোট দিয়েছেন। ভোট দেওয়া উত্তরদাতাদের ৮০ শতাংশ ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের এবং ৬ শতাংশ রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন।

জরিপে অংশ নেওয়া ৭০ শতাংশ মুসলিম ভোটার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ ও মুসলিমবিরোধী মনোভাব তাদের ভোট দিতে উৎসাহিত করেছে।

অর্থাৎ বিদ্বেষমূলক বক্তব্য তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করার পরিবর্তে ভোটাধিকার প্রয়োগে আরও সচেতন করেছে বলে জরিপে উঠে এসেছে। তবে এই জরিপের ফলাফল ৫২২ জন মুসলিম ভোটারের উত্তরের ভিত্তিতে তৈরি।

এবারের নির্বাচনে মুসলিম আমেরিকান ভোটারদের সিদ্ধান্তে গাজা ও ফিলিস্তিন পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সিএআইআরের জরিপে ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা গাজা পরিস্থিতি ও ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকারকে তাদের ভোটের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ৮০ শতাংশ বলেছেন, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান তাদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে।

তবে ভোটারদের বিবেচনায় কেবল ফিলিস্তিন ইস্যুই প্রাধান্য পায়নি। জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, কর্মসংস্থান এবং স্বাস্থ্যসেবার বিষয়গুলোও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

জরিপে ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তাদের ভোটের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধও ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেছে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।

নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ্যে তুলে ধরার প্রবণতা। তারা ধর্মীয় পরিচয় গোপন না করে রাজনৈতিক প্রচারণায় নিজেদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধের কথা বলেছেন।

সিনেটর নির্বাচিত আবদুল এল-সাইয়েদের বিজয় ভাষণেও বিষয়টি উঠে আসে। ভাষণের শুরুতে তিনি ‘ইনশাআল্লাহ’ ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ শব্দ ব্যবহার করেন। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে কথা বলার সময় তিনি নিয়মিত ‘ইনশাআল্লাহ’ বলতেন উল্লেখ করে বিজয়ের পর বলেন, এবার সেই ‘ইনশাআল্লাহ’ পরিণত হয়েছে ‘আলহামদুলিল্লাহ’-তে। তার এ বক্তব্যে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি মুসলিম আমেরিকানদের রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে একই রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দলীয় পরিচয়, অর্থনীতি, অভিবাসন, নাগরিক অধিকার ও পররাষ্ট্রনীতির মতো বিষয়ে তাদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

জরিপে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের প্রতি মুসলিম ভোটারদের ব্যাপক সমর্থন দেখা গেলেও সবাই একই রাজনৈতিক দলের প্রতি অনুগত নন।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মুসলিম আমেরিকান প্রার্থীদের জয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও অংশগ্রহণের পরিচয় দিচ্ছে।

একই সঙ্গে ইসলামবিদ্বেষ, গাজা পরিস্থিতি, নাগরিক অধিকার ও অর্থনৈতিক সংকটের মতো বিষয়গুলো মুসলিম ভোটারদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলছে, তাও স্পষ্ট হয়েছে।

নির্বাচনের এই ফলাফল দেশটির রাজনৈতিক পরিসরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র : মিডল ইস্ট আই, সিএআইআর, সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট