২০১৭ সালে ‘হালদা’ নামের একটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল। এর কাহিনি লিখেছিলেন আজাদ বুলবুল আর পরিচালনা করেছিলেন প্রখ্যাত অভিনেতা ও নির্মাতা তৌকীর আহমেদ। হালদা নদী ও এর ওপর নির্ভরশীল জেলেদের জীবন নিয়ে এই সিনেমা নির্মিত হয়। বাংলাদেশের একমাত্র মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদী ও এর পরিবেশ সংকট ও জেলেদের জীবন নিয়ে এটিই প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এই সিনেমায় হালদার দুই পাড়ের জেলেদের জীবন, রুই মাছের ডিম সংগ্রহ আর প্রকৃতির সঙ্গে ভালোবাসা ও সংগ্রামের ছবি তোলা হয়েছে। এখানে দেখানো বদি একজন গরিব মাছের ডিম সংগ্রহকারী আর হাসুও আরেক জেলের মেয়ে। এদের প্রেমের সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসে নদীর পাড়ে অবৈধ ইটভাটা, কলকারখানার বর্জ্য ও রাসায়নিক নিষ্কাশন কীভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে নদী ও তার মৎস্য সম্পদকে।
দখল আর দূষণে বিপন্ন হালদা।
সম্প্রতি বেসরকারি সামাজিক উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থা ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান অপিনিয়ন (ইকো) হালদা নদী ও এর দূষণ নিয়ে একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করে। গবেষণাটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত হয়। গবেষণায় হালদার দুই তীরে মোট ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে বৃক্ষ ২১২, গুল্ম ১৩৩, লতা ১৩৩, বীরুৎ ৫২২ এবং পরজীবী উদ্ভিদ ৯ প্রজাতির। ২টি নগ্নবীজী, ৭টি ছত্রাক, ১৩টি মসবর্গীয় ও ৩৫টি ফার্ন প্রজাতি রয়েছে। এখানে ৭৬৫টি প্রজাতির স্থানীয় উদ্ভিদ আর ২৪৪ প্রজাতির বিদেশি উদ্ভিদ দেখা গেছে। এ ছাড়া গবেষকরা হালদা নদী দূষণের ৫৭টি উৎস শনাক্ত করেছেন। চট্টগ্রামের একমাত্র সুপেয় পানির উৎসও এই হালদা নদী। এখান থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম ওয়াসা ১৮ কোটি লিটার পানি সংগ্রহ করে, যা ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষের জীবন বাঁচায়। অথচ এই নদীকে সইতে হচ্ছে কত অত্যাচার। এর বুকে আগে রাবার ড্যাম বসানো হয়েছে। নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে শিল্প কারখানা। সেখানকার বর্জ্য এসে পড়ছে নদীতে। হাঁস-মুরগির খামার করা হচ্ছে। এমনকি তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্যও পড়েছে এখানে। হালদা নদীতে শুধু অবৈধভাবে মাছই ধরা হয় না, কারেন্ট জাল ও বিষ ব্যবহার করেও ক্ষান্ত নন তারা। প্রতিনিয়ত ঘর-গৃহস্থালি, নদীসংলগ্ন অনেক কল কারখানার বর্জ্য এসে যোগ হয় এখানে। অবৈধ বালু উত্তোলন তো আছেই। এসব কারণে হালদার প্রাণ ওষ্ঠাগত, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এর দায় কার? সহজ উত্তর নিশ্চয় সংশ্লিট দায়িত্বশীল সব পক্ষের।
হালদা রিসার্চ অ্যান্ড ল্যাবরেটরির তথ্যমতে, ২০২৩ সালে হালদা নদী থেকে ১৮ হাজার কেজি কার্প জাতীয় মাছের ডিম সংগ্রহ করা হয়। হালদা থেকে ২০২০ সালে ডিম পাওয়া গিয়েছিল ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি। ২০২১ সালে ডিম পাওয়া যায় ৮ হাজার কেজি। ২০২২ সালে প্রায় ৬ হাজার কেজি। ২০২৩ সালে ৪৩৭ কেজি। হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির তথ্যমতে, ২০১৮ সালে ডলফিন পাওয়া গেছে ১৬৭টি, ২০২০ সালে ১২৭টি। গাঙ্গেয় ডলফিন পৃথিবীর বিপন্ন প্রজাতির একটি। পৃথিবীতে এর সংখ্যা মাত্র ১,১০০টি। এর মধ্যে হালদাতে রয়েছে ১৭০টি। হালদা নদী দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও ডিম ছাড়ার ক্ষতি হয়। এখানে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালাবাউশ প্রভৃতি মাছ প্রাকৃতিক উপায়ে ডিম ছাড়ে। পানিতে রাসায়নিক বর্জ্য, পোলট্রি, ফার্মের মলমূত্র ও অতিরিক্ত অ্যামোনিয়ার ফলে মা মাছের ডিম ছাড়ার হরমোনজনিত প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। অক্সিজেনের মাত্রা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় ও বিষাক্ত পদার্থের কারণে ডিম থেকে সুস্থ সবল রেণু ফোটার হার মারাত্মকভাবে কমে যায়। কারখানার বর্জ্য ও তেল মেশার কারণে কচ্ছপ, কাঁকড়া ও দেশি প্রজাতির মাছ যেমন মহাশোল, চিতল এসব হারিয়ে যেতে বসেছে। এসব কারণে মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকার ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে। ডিম সংগ্রহ পেশার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পানির গুণগত মান নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে পানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে হালদার পানি। এর ফলে নদীর বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে মারাত্মক ক্ষতি করছে। হালদায় মূলত শিল্প কারখানার বর্জ্য পড়ে দূষিত হচ্ছে। পাশের পেপার মিল, টেক্সটাইল, ট্যানারি ও অন্যান্য কারখানার বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া কৃষিজমিতে কীটনাশকের ব্যবহার নদীকেও দূষিত করছে। বালএহড ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা থেকে নির্গত তেল ও মোবিল পানির ওপর আস্তরণ তৈরি করে, যা জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর সালোকসংশ্লেষণ ও শ্বসনে প্রভাব ফেলছে।
এই অবস্থায় কলকারখানা ও পোলট্রি ফার্মগুলোতে ইটিপি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা দরকার। ইটিপি হলো এফ্লুয়েন্ট ট্রিটম্যান্ট প্ল্যান্ট। এর মাধ্যমে শিল্প কারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য পদার্থ পরিশোধন করা হয়। কারখানা থেকে বের হওয়া দূষিত পানিকে রসায়নিক ও জৈবিক প্রক্রিয়ায় বিশুদ্ধ করা হয়। শিল্প কারখানার বর্জ্যে সিসা, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, অ্যামোনিয়া, সালফাইড ও বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ থাকে। ইটিপির মাধ্যমে পানি দূষণ যেমন কমিয়ে আনা যায়, তেমনি সামগ্রিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা, নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা, আইনের কঠিন প্রয়োগ করাটাও জরুরি হয়ে পড়েছে। ঠেকাতে হবে দখলের অপপ্রক্রিয়াও। হালদা আমাদের কাছে শুধু একটি নদী নয়, এটি একটি জাতীয় সম্পদ ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যকে আমাদের বাঁচাতে হবে।
লেখক : জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ গবেষক
mitra_bibhuti@yahoo.com