 নিত্যপণ্যের দাম

বাজারে তদারকি-নজরদারি বাড়ান

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০৮ এএম

সাধারণ মানুষের কাছে বাজার যেন ভীতিকর ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে গিয়ে সিংহভাগ মানুষকে হাত গুটিয়ে কোনো রকমে সদাই সেরে ঘরমুখী হতে হয়। আয়-রোজগারের সঙ্গে মিলে না বাজারের হিসাব। এই পরিস্থিতি নতুন নয়, কিন্তু জীবনযাত্রার পথে ক্রমাগত সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন উপসর্গ, যা স্বস্তির নয়। এরই ফের চিত্র উঠে এসেছে ৮ নভেম্বর দেশ রূপান্তরের অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। কনজুমারস ফোরাম (সিএফ) প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের বাজার পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনের সূত্রে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবর মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় ১৫ ধরনের পণ্যের দাম গড়ে ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মাছের দাম। এ সময়ে মাছের দাম গড়ে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে সাত ধরনের পণ্যের দাম ছিল স্থিতিশীল এবং দুটি পণ্যের দাম কমেছে। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, মফস্বলে উৎপাদিত সবজি যে দামে কেনা হয় ঢাকা কিংবা বিভাগীয় ও জেলা শহরে বিক্রি হচ্ছে তুলনামূলক অনেক বেশি দামে।

আমরা জানি, মধ্যস্বত্বভোগীরা নানা রকম কারসাজি করে স্থানীয় উৎপাদকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত করে ও ভোক্তার পকেট কাটে। আমরা দেখছি, যেসব পণ্য আমদানি করতে হয় না, চাহিদা অনুসারে ঘাটতি নেই সরবরাহে, সেসব পণ্যের দামও হুটহাট বাড়িয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা নিজেদের উদর ভরে। কৃষক যাতে ন্যায্য দাম প্রাপ্তিতে বঞ্চিত না হয়, এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে নানা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি সেসব বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও নেওয়া হলেও অগ্রগতির চিত্র বিবর্ণ। মাঠপর্যায়ের কৃষক এবং শহরের বাজারের মাঝে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার খবর পুরনো। মাছের ক্ষেত্রেও চিত্র একই। মৎস্যজীবী ও কৃষক পানির দামে পণ্য বিক্রি করলেও ভোক্তাকে চড়া দামে তা কিনতে হয়।

অন্যান্য নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রেও যে তুঘলকিকা- পরিলক্ষিত হয়, এর পেছনেও  রয়েছে বহুবিধ কারণ। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পণ্যের দামের অযৌক্তিক পার্থক্যের প্রধান কারণ হলো স্বল্পসংখ্যক কোম্পানির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির উদ্দেশ্যে অবৈধ মজুদদারি এবং স্তরে স্তরে চাঁদাবাজি। কেবল খুচরা বিক্রেতাদের জরিমানা করে বা মাঝে মধ্যে লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে সিন্ডিকেটের হাত থেকে বাজার মুক্ত করা সম্ভব নয়, তা নিকট অতীতেও এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বলেছি। আমরা মনে করি, বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার লক্ষ্যে সরকারের উচিত সরবরাহ শৃঙ্খলে থাকা ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধানের পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়া। পণ্যের অবৈধ মজুদদারি রোধ করার পাশাপাশি উৎপাদনকারী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তার হাত পর্যন্ত পৌঁছানোর মধ্যবর্তী পথ সিন্ডিকেটমুক্ত করার আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা স্পষ্টতই এও মনে করি, বাজারে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

মূল্যস্ফীতির চাপে ভোক্তার নাকাল হওয়ার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত হলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল পক্ষগুলোর তৎপরতা নজরে আসে, দৃশ্যত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা আমাদের কাছে মনে হয় টোটকা দাওয়াইর মতো। আগে বাজার ব্যবস্থাপনার গলদ সারাতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বাজারে তদারকি-নজরদারি নিবিড় করতে হবে। সরকারের তরফে বাজারে স্বস্তি ফেরানোর নানা পদক্ষেপ নিলেও কেন এর সুফল স্থায়ী হয় না এর উৎসে নজর দিতে হবে। আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতায় আরও আছে পবিত্র রমজানে, ঈদে কিংবা অন্যান্য উৎসব-পার্বণে বাজারে বাড়তি উত্তাপ সৃষ্টি হয়। অসাধু ব্যবসায়ীরা ওত পেতে থাকে যেকোনো সুযোগের। জ¦ালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পণ্যের সরবরাহ খরচ কিছুটা বেড়েছে বটে, কিন্তু এই অজুহাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা মুনাফা লুটছে কয়েকগুণ বেশি, বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে এই অভিযোগও। বাজারে বিরাজমান উপসর্গগুলো যাদের দ্বারা সৃষ্ট তাদের অনৈতিকতার প্রতিকার-প্রতিবিধানে নিতে হবে কঠোর অবস্থান। বাজারে কোথায় ও কীভাবে একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হয়, তা চিহ্নিত করতে সরকারকে আইনি উদ্যোগ নিতে হবে। টেকসই বাজার-ব্যবস্থাপনাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমভাবেই জরুরি। ন্যায্যমূল্যে খাদ্যপণ্য সরবরাহ নিশ্চিত সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির কার্যক্রমের পরিসর বাড়ানোও বাঞ্ছনীয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত