বাংলাদেশে বেকারত্বের হার বাড়ছে। এই ঊর্ধ্বমুখী হার অন্যতম প্রধান সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নিকট অতীতে প্রক্ষেপণ অনুযায়ী দেখা গেছে, দেশের সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৪.৬৩% থেকে ৫.০%-এ উন্নীত হয়েছে। তবে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র দেখা গেছে দেশের শিক্ষিত ও তরুণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে। প্রায় সমসময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩৬%, যার অর্থ চাকরির বাজারে প্রবেশ করা প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জনই কর্মহীন থাকছেন। ভিন্ন আরেকটি পর্যবেক্ষণেও জানা যায়, দেশে মোট বেকারের একটি বড় অংশই শিক্ষিত যুবসমাজ। যেখানে নিরক্ষর মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার খুবই কম (১.২৫%), সেখানে বিশ^বিদ্যালয় বা স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে এই হার ১৩.৫%-এর বেশি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মূলত তাত্ত্বিক জ্ঞাননির্ভর। বর্তমান করপোরেট ও বৈশ্বিক চাকরির বাজারের উপযোগী ব্যবহারিক ও কারিগরি দক্ষতার অভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রাপ্ত তরুণরা চাকরি পাচ্ছেন না।
দেশের জিডিপি বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে নতুন কর্মসংস্থান বা মানসম্মত চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না, যাকে অর্থনীতিবিদরা কর্মসংস্থানহীন অর্থনীতি বলছেন। পর্যবেক্ষকদের অনেকেরেই অভিমত, পাঠ্যক্রমে তত্ত্ববিদ্যার পাশাপাশি আইটি, ফ্রিল্যান্সিং, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। তরুণদের স্টার্টআপ বা নতুন ব্যবসায় উদ্বুদ্ধ করতে সহজ শর্তে ঋণ ও জামানতবিহীন অর্থায়নের ব্যবস্থা এবং কর মওকুফ ও প্রণোদনার মাধ্যমে বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উৎসাহিত করা। সমাজে অস্থিরতা বাড়লে আমরা এর কারণ খুঁজি এবং প্রথমেই বলি বেকারত্বের কথা। কাজ নেই, আয় নেই, তাই মানুষ বিশেষ করে যুবসমাজ অপরাধে জড়ায় বা রাজনৈতিক উত্তেজনার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তা হয়তো কিছুটা সত্য, কিন্তু পুরো নয়। দীর্ঘদিন কর্মহীনতা মানুষকে হতাশ করে, আত্মসম্মান ক্ষুণœ করে, পারিবারিক টানাপড়েন বাড়ায়। এই পরিস্থিতিতে কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াতে পারে, এটাই মনোবিজ্ঞানে চাপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বেকারত্বের প্রবণতা যেন একই সমান্তরালে এগিয়ে চলেছে। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী আমাদের জন্য একদিকে সম্ভাবনার বিশাল দুয়ার খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা পৃথিবীর বহু দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এই বিপুল জনগোষ্ঠী উপযুক্ত কর্মপরিবেশ ও সুযোগ পেলে দেশ ও সমাজের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু কর্মসংস্থানের অভাবে তাদের একটি বড় অংশ হতাশা, অনিশ্চয়তা ও নানা সামাজিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগজনক।
আগেই বলেছি, বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের প্রবণতা বর্তমানে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এক সময় সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া কিংবা লিবিয়া হয়ে ইউরোপে যাওয়ার বিপজ্জনক প্রচেষ্টা সংবাদপত্রের শিরোনাম হতো। বর্তমানে রাশিয়ায় বাংলাদেশি যুবকদের গমন এবং তাদের অনেককে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই ইউক্রেন যুদ্ধের মতো চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়ার মর্মান্তিক খবর আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কর্মক্ষম এই জনগোষ্ঠীর জন্য দেশে ও বিদেশে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ কীভাবে সৃষ্টি করা যায়? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে কৃষির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের প্রভাবে প্রচলিত চাকরির বাজার ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় দক্ষ শ্রমিক তৈরি করাকে বেকারত্ব নিরসন এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় কেবল প্রচলিত অর্থে দক্ষতা অর্জন করলেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের শৈশবে ‘এইম ইন লাইফ’ বা জীবনের লক্ষ্য নিয়ে রচনা লিখতে গিয়ে ডাক্তার কিংবা প্রকৌশলী হওয়ার বাইরে অন্য পেশার কথা কল্পনা করাই কঠিন ছিল। অথচ পরবর্তী সময়ে ডেটাবেইস অপারেটর, সফটওয়্যার ডেভেলপার কিংবা প্রোগ্রামারের মতো পেশা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ভবিষ্যতেও এমন অনেক পেশার আবির্ভাব ঘটবে, যেগুলোর নাম বা ধারণা আজ আমাদের কাছে অজানা। তবে একটি পেশা মানবসভ্যতার সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত টিকে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে সেটি কৃষি। খাদ্য উৎপাদন, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মানবজীবনের অস্তিত্ব রক্ষায় কৃষির বিকল্প নেই। অতএব, কৃষিকে শুধু অতীতের পেশা কিংবা স্বল্প আয়ের জীবিকা হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর, লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
বাংলাদেশে কৃষিকাজের আর্থিক ও সামাজিক আকর্ষণ নানা কারণে সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের একটি বড় অংশ কৃষক কিংবা কৃষিশ্রমিক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে আগ্রহী নয়। অথচ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি কর্মীরা কৃষিক্ষেত্রে কাজ করে সাফল্য অর্জন করেছেন। এই বাস্তবতায় আফ্রিকার কৃষি হতে পারে বাংলাদেশের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত। আফ্রিকার বহু দেশে হাজার হাজার একর উর্বর জমি দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলক কম মূল্যে লিজ নেওয়া কিংবা ক্রয় করার সুযোগ রয়েছে। চীনসহ বিভিন্ন দেশ নিজেদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আফ্রিকার কৃষি খাতে বিনিয়োগ করেছে। এসব বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং খাদ্য সরবরাহের স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের কয়েকজন উদ্যোক্তাও নানা প্রতিকূলতা ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে জমি লিজ নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করেছেন। তাদের অভিজ্ঞতা ও সাফল্য বৃহত্তর উদ্যোগের সম্ভাবনাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার একটি দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়। অথচ বৈধ উপায়ে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলে একদিকে অবৈধ অর্থ স্থানান্তর রোধ করা যেমন জরুরি, অন্যদিকে বৈধ ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের পথ উন্মুক্ত করাও সময়ের দাবি। বিদেশে কৃষি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করে একটি বিশেষ নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। প্রয়োজনে দেশে সমপরিমাণ সম্পদ বা অর্থ সরকারের কাছে জামানত রেখে বিদেশে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। এ ধরনের বিনিয়োগের লক্ষ্য হবে অর্থ পাচার নয়, বরং বৈধভাবে সম্পদ সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
আফ্রিকা এখন বাংলাদেশের কাছে অপরিচিত কোনো অঞ্চল নয়। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের পেশাদারত্ব, আন্তরিকতা ও মানবিক আচরণের কারণে আফ্রিকার বহু দেশের মানুষের কাছে বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে। এই অর্জিত আস্থা ও সুসম্পর্ককে অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরিতে কাজে লাগানো সম্ভব। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কৃষিজমি লিজ নেওয়া বা ক্রয়, কৃষি অবকাঠামো নির্মাণ এবং উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের সীমিত পরিসরে বৈধ অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে তরুণদের কৃষি, কৃষিপ্রযুক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্য বিপণনের কাজে নিয়োগের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। আফ্রিকার কৃষি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনগত কাঠামো, জমির মালিকানা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা বিবেচনায় রাখতে হবে। শুধু জমি অধিগ্রহণ নয়, স্থানীয় জনগণের সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময়ের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের বেকারত্ব নিরসন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কৃষিকে কেন্দ্র করে আফ্রিকায় একটি সমন্বিত কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে। সরকারি নীতিসহায়তা, বেসরকারি উদ্যোক্তা, ব্যাংকিং সুবিধা এবং দক্ষ জনশক্তিকে একত্রিত করে একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে এ উদ্যোগ শুরু করা সম্ভব। আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী কোনো বোঝা নয়; তারা জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই সম্পদকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে জনসংখ্যার সম্ভাবনা অভিশাপে পরিণত হবে। প্রয়োজন সমস্যাটিকে কেবল বেকারত্বের পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে, একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করা। মনে রাখতে হবে, উন্নয়নের নানা সূচকে অগ্রগতির খতিয়ান সত্ত্বেও দেশের শ্রমবাজারে বেকারত্বের ঊর্ধ্বমুখী হার সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষিত ও তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে কর্মহীনতার এই প্রবণতা শুধু অর্থনৈতিক অপচয়ই নয়, বরং বহুমুখী নেতিবাচকতার সৃষ্টি হচ্ছে । জনমিতিক লভ্যাংশের যে সুবর্ণ সুযোগ দেশের সামনে রয়েছে, তা যথাযথ কর্মসংস্থানের অভাবে যেন মুখ থুবড়ে না পড়ে তা গভীরভাবে আমলে রাখা জরুরি।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত মেজর, গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
directoradmin2007@gmail.com