বড় পরীক্ষার সামনে আইজেনকট

ইসরায়েলের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সুযোগ এসেছে তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের সামনে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে গিয়ে সাবেক এই সেনাপ্রধানকে এমন কিছু দলের সমর্থন নিতে হতে পারে, যাদের সঙ্গে তার রাজনৈতিক অবস্থানের মৌলিক বিরোধ রয়েছে। একদিকে আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া সরকার গঠন কঠিন, অন্যদিকে সেই সমর্থন নিতে গেলে নিজের জোটেই ভাঙন ধরার আশঙ্কা। ফলে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলেও ক্ষমতার পথ এখনো অনেক দূরে আইজেনকটের। গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এই পরিস্থিতিতে শনিবার ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন মধ্য-ডানপন্থি নেতা আইজেনকটকে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন হারজগ। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শেও দেখা যায়, নেতানিয়াহুর চেয়ে বেশি আইনপ্রণেতা আইজেনকটকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান।

আর এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েছেন আইজেনকট। নির্বাচনী প্রচারে তিনি নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে ইসরায়েলকে নতুন পথে পরিচালনার অঙ্গীকার করেছিলেন। তবে সেই লক্ষ্য পূরণ করতে হলে আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে তাকে কার্যকর একটি রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলতে হবে। ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন। কিন্তু নির্বাচনের ফল কোনো পক্ষকেই সেই নিশ্চয়তা দেয়নি। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩ আসন। আইজেনকট ও তার জায়নিস্ট মিত্রদের দখলে রয়েছে ৪৮ আসন। অন্যদিকে দুটি আরব-নেতৃত্বাধীন দল সম্মিলিতভাবে পেয়েছে রেকর্ড ১৯ আসন। অর্থাৎ নির্বাচনে আলাদা অবস্থানে থাকা আরব দলগুলোই এখন সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনায় ৬৭ জন আইনপ্রণেতা আইজেনকটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। বিপরীতে নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানিয়েছেন ৪৬ জন। তবে প্রেসিডেন্টের কাছে কাউকে সমর্থন জানানো আর তার নেতৃত্বে সরকারে যোগ দেওয়া এক বিষয় নয়। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতার সুপারিশ পেলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ঐকমত্য এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি আইজেনকট। সবচেয়ে বড় জটিলতা আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে। আইজেনকট চাইলে তাদের সহযোগিতায় সরকার গড়তে পারেন। কিন্তু তার জোটের কয়েকটি ডানপন্থি ইহুদি দল আগেই জানিয়ে দিয়েছে, আরব দলগুলোর সমর্থননির্ভর কোনো সরকারে তারা অংশ নেবে না।

আইজেনকট এই জটিলতা কাটাতে সামনে এনেছেন ‘জাতীয় জরুরি সরকার’ গঠনের ধারণা। শুক্রবার তিনি জানান, যত দ্রুত সম্ভব নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে স্থিতিশীল ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান। একই সঙ্গে আরেকটি নির্বাচন এড়ানোও তার লক্ষ্য। আইজেনকটের পরিকল্পনায় একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে কিছু দল আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিসভায় অংশ না নিয়েও বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন দিতে পারে। পরবর্তী সময়ে তাদের জোটে যোগ দেওয়ার সুযোগও রাখা হতে পারে। সরকার গঠনের আলোচনায় আইজেনকট চারটি মৌলিক শর্ত নির্ধারণ করেছেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, সম্ভাব্য অংশীদারদের ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। সমর্থন করতে হবে দেশটির স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং সবার জন্য বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবার নীতি। পাশাপাশি হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে সেটিকে ভেঙে দেওয়ার অবস্থান নিতে হবে। এই শর্তগুলোই আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার পথে বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।

আরব-নেতৃত্বাধীন রা’আম আইজেনকটের বেশিরভাগ শর্ত মেনে নিয়েছে। দলটি সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানালেও, হামাসকে সরাসরি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেনি। তবে জয়েন্ট লিস্টের অবস্থান আরও জটিল। বামপন্থি ও ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকদের নিয়ে গঠিত এই জোট ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাকালীন ‘ইহুদি গণতন্ত্র’ ধারণার বিরোধিতা করে। ফলে দুই আরব দলের সমর্থন পাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি সেই সমর্থনের বিনিময়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান অক্ষুণœ রাখাও আইজেনকটের জন্য বড় পরীক্ষা।