জিডিপির হিসাবে গরমিল

বিগত সরকারের আমলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাব নিরূপণে গরমিল পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সমন্বয়ে গঠিত এ সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির ফরেনসিক অডিটে এসব অসংগতি উঠে এসেছে। গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিবিএস মিলনায়তনে জাতীয় পরিসংখ্যান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকির বক্তব্যে এসব তথ্য উঠে আসে।

‘নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য পরিসংখ্যান, টেকসই উন্নয়ন ও পরিকল্পনার ভিত্তি’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে এদিন দিবসটি উদ্যাপন করা হয়। বিবিএসের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকারের সভাপতিত্বে সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. শামীমুল হক। এ ছাড়া আলোচনায় অংশ নেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বিবিএসের পরিচালক কবির উদ্দিন আহাম্মদ এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কোনো সরকার তথ্যের কারসাজি করলে তা হবে নিজের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। কারণ, সরকারের কর্মসূচি সফল করতে হলে প্রথমেই সঠিক তথ্য থাকতে হবে। তথ্য হচ্ছে একটি সরকারের ব্যালান্স শিটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই বিবিএসকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম এগিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সেগুলোর বাস্তবায়নও চলছে।

বিগত সময়ের পরিসংখ্যান তদন্তের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ফরেনসিক অডিট করা হয়েছে অতীতের অনিয়মের গভীরে যাওয়ার জন্য, কাউকে লক্ষ্যবস্তু করার জন্য নয়। তথ্য যত বেশি উন্মুক্ত করা হবে, তত বেশি ভুল ও অসংগতি সামনে আসবে। এ থেকে সংশোধনের সুযোগ তৈরি হবে।

তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছেন, তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে কোনো ধরনের সন্দেহ থাকা চলবে না। জনগণ যাদের বিশ্বাস করে ক্ষমতায় বসিয়েছে, সেই সরকারের তথ্যের ওপরই যদি তাদের আস্থা না থাকে, তাহলে নির্বাচিত সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না। এ কারণে নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ পরিসংখ্যান নিশ্চিত করতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ ছাড়া রাজনৈতিক গণতন্ত্রীকরণ কার্যকর হবে না। এ জন্য পরিসংখ্যান ব্যুরোর কার্যক্রম কীভাবে আরও গণমুখী ও জনমুখী করা যায়, কীভাবে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, নির্ভরযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, গত ১৭ বছরে পরিসংখ্যানকে ব্যাপকভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে। মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে পরিসংখ্যানকে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ পরিসংখ্যানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকে নির্ভরযোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে সরকার কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো মানসম্পন্ন পরিসংখ্যান তৈরি, জননীতি বাস্তবায়নে পরিসংখ্যানের কার্যকর ব্যবহার এবং সবার জন্য সহজলভ্য পরিসংখ্যান নিশ্চিত করা।

এদিকে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, অতীতে পরিসংখ্যানের বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। ফলে এখন সঠিক তথ্য প্রকাশ করলেও মানুষ তা বিশ্বাস করতে চায় না। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার তথ্যের বিকৃতি বন্ধ, পরিসংখ্যানের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

বিগত সরকারের আমলে পরিসংখ্যান নিয়ে মানুষের আস্থার সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলে পরিসংখ্যান নিয়ে যা হয়েছে, তাতে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। এখন যথাযথ তথ্য দিলেও মানুষ তা বিশ্বাস করতে চায় না। এ আস্থা ফিরিয়ে আনতে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের উদ্যোগে ফরেনসিক অডিট করা হয়েছে। অতীতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাব কীভাবে করা হয়েছে এবং এর ভিত্তি কতটা সঠিক ছিল, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সহযোগিতায় বিবিএস যৌথভাবে এ গবেষণা করেছে। গবেষণায় জিডিপি নিরূপণের পদ্ধতিতে যথেষ্ট ত্রুটি পাওয়া গেছে। এসব ত্রুটি জনসমক্ষে তুলে ধরা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, সরকার কোনো ধরনের তথ্যের বিকৃতি চায় না। কারণ, বাংলাদেশকে নিয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশ কতটুকু এগোল, তা নির্ধারণ করতে হবে। কোথাও ভুল হলে সংশোধন করতে হবে।