মুক্তাঙ্গনের মুক্তি নেই

একসময় গণতান্ত্রিক আন্দোলন, রাজনৈতিক বিতর্ক আর জনতার প্রতিবাদে মুখর থাকত রাজধানীর ঐতিহাসিক মুক্তাঙ্গন। সেই মুক্তাঙ্গন এখন ভাড়ার গাড়ির মালিকদের দখলে। দখলমুক্ত করার দাবিতে উচ্চ আদালতে রিট করেছেন এলাকাবাসীর প্রতিনিধি পরিচয়ে এক ব্যক্তি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনিও মুক্তাঙ্গনের একজন গাড়িচালক। জনস্বার্থের আড়ালে দখল ধরে রাখার কৌশল হিসেবেই কি এই রিট উঠেছে সেই প্রশ্ন। যে মুক্তাঙ্গন ছিল জনগণের কথা বলার জায়গা, সেটি কীভাবে বন্দি হয়ে পড়ল তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক নেতারা।

রাজনীতিবিদরা বলছেন, প্রত্যেক আধুনিক শহরে জনগণের প্রতিবাদ জানানোর একটি নির্দিষ্ট জায়গা থাকে। সাধারণ মানুষ সরকার বা অন্য কোনো কারণে বিক্ষুব্ধ হলে সেখানে গিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন, রাজনৈতিক মতামত জানায় এবং নানা বিষয়ে বিতর্ক করেন। এরমধ্য দিয়ে শুধু জনমত গড়ে ওঠে তাই নয়। নতুন প্রজন্ম কথা বলা, প্রতিবাদ করা শেখার পাশাপাশি রাজনৈতিক শিষ্টাচার শেখে। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের নামে রাজধানীর সব প্রতিবাদ জানানোর জায়গাকে ধ্বংস করেছে।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সাল থেকে রাজনৈতিক দলের সভাসমাবেশ করার জন্য মুক্তাঙ্গন ব্যবহারের নির্দেশ দেন। তবে ইতিহাস বলছে পাকিস্তান আমলে প্রায় ৮৪ শতাংশ জমির ওপর মুক্তাঙ্গন গড়ে ওঠে। তখন মূলত মুক্তাঙ্গন একটি পার্ক হিসেবে ব্যবহার হতো। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজনৈতিক কর্মসূচি সীমিত করার উদ্যোগ নেয়। এই প্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ২৬ এপ্রিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এক আদেশে মুক্তাঙ্গনে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি মুক্তাঙ্গনে পাবলিক টয়লেট উদ্বোধন করেন। এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ময়লা স্থানান্তর কেন্দ্র (এসটিএস) গড়ে তোলে। ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনের মতো বড় আন্দোলনে দলে দলে মানুষ মুক্তাঙ্গনে এসে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সেই মুক্তাঙ্গন এখন ভাড়ায় চালিত গাড়ি ব্যবসায়ীদের দখলে।

বিশ্বের বড় শহরে মানুষের প্রতিবাদ জানানোর জায়গা আছে : বিশ্বের বিভিন্ন বড় শহরে নাগরিকদের প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশের জন্য ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে। এর মধ্যে লন্ডনের হাইড পার্কের স্পিকার্স কর্নার, ভারতের নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর, মিসরের কায়রোর তাহরির স্কয়ার, ইউক্রেনের কিয়েভের মাইদান স্কয়ার, তুরস্কের ইস্তাম্বুলের তাকসিম স্কয়ার, সিঙ্গাপুরের হং লিম পার্ক, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ইউনিয়ন স্কয়ার, ফ্রান্সের প্যারিসের রিপাবলিক স্কয়ার, আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসের প্লাজা দে মায়ো এবং স্পেনের মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেল সোল। এসব স্থান কোনোটি উন্মুক্ত মতপ্রকাশের কেন্দ্র, কোনোটি আবার ঐতিহাসিক গণআন্দোলন ও নাগরিক প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সেখানে আমাদের মুক্তাঙ্গন বন্দি হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজনৈতিক নেতারা।

রিট কাহিনি : জনৈক মো. জামাল উদ্দিন এলাকাবাসীর পক্ষে রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক মুক্তাঙ্গনকে দখল এবং দূষণমুক্ত করতে একটি রিট আবেদন করেন। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল এ সংক্রান্ত একটি আদেশ দেয়। ওই আদেশে বলা হয়, পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসক বিষয়টি নিষ্পত্তি করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবেন।

মুক্তাঙ্গন এ সংক্রান্ত দুটি সাইনবোর্ডে উচ্চ আদালতের এই নির্দেশনা টানিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ রয়েছে মুক্তাঙ্গনে জনস্বার্থে দূষণ এবং দখলমুক্ত রাখা এবং যেকোনো স্থাপনা নির্মাণ বন্ধের এলাকাবাসীর আবেদনের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত এই রায় দেয়। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে মনে হতে পারে এই জামাল উদ্দিনের এই উদ্যোগ খুবই মহৎ। কিন্তু জামাল উদ্দিনের পরিচয় ধরে অনুসন্ধান করলে বোঝা যায় কৌশলে মুক্তাঙ্গন দখলে রাখতে এই রিট আবেদন করা হয়েছে।

এই জামাল উদ্দিন কে মুক্তাঙ্গনের অন্য চালকদের কাছে তার পরিচয় নিশ্চিত হতে চাইলে তারা বলেন, জামাল উদ্দিন তাদের মতোই একজন চালক। তিনিও এখানের একটি গাড়ি চালান।

রিট আবেদন করা সেই জামাল উদ্দিনকেই খুঁজে পাওয়ার পর জানতে চাইলাম আপনার বাড়ি কোথায়? তিনি জানালেন তার স্থায়ী নিবাস কুমিল্লাতে। তাহলে পল্টনের এলাকাবাসীর পক্ষে তিনি রিট করলেন কেন? জানালেন তিনি ছোট বেলা থেকে পল্টন থাকতেন। তার ভোটার আইডিতে পল্টনের ঠিকানা দেওয়া। তবে এই এলাকায় বাসা ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় তিনি আর এখানে এখন থাকতে পারছেন না। প্রয়োজন হলে আবার তিনি পল্টন চলে আসবেন।

জামাল উদ্দিন এখন পরিবার নিয়ে বসবাস করেন রাজধানীর মুগদাপাড়ায়। কুমিল্লার মানুষ মুগদাপাড়ায় বসবাস করে রাজধানীর পল্টনের এলাকাবাসীর পক্ষে নিলেন কি করে জানতে চাইলে বলেন, তার কিছু মুরব্বি আছে। তাদের সঙ্গে কথা না বলে এ বিষয়ে তিনি আর কোনো কথা বলতে পারবেন না। তার মুরব্বি কারা? এমন প্রশ্নে জানালেন মুরব্বিতো একজন না অনেকÑ কার কার কথা বলবেন তিনি।

মুক্তাঙ্গন কাদের দখলে : মুক্তাঙ্গনের রেন্ট এ কার ব্যবসায়ীদের সুপারভাইজার আনোয়ার হোসেন সাগর জানালেন, এখানে ৭০ থেকে ৮০ জন মালিক রয়েছেন। যাদের প্রত্যেকের একাধিক গাড়ি রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এখানে গাড়ি রাখার জন্য প্রতি গাড়িতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের তিন হাজার করে টাকা দিতে হতো। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর একটি পক্ষ চাঁদা দাবি করতে এসেছিলেন। কিন্তু সম্মিলিতভাবে তাদের মালিক ও চালকরা প্রতিরোধ করেছেন। আর এখন তো তাদেরই সময়। তাদের সময়ে তিনি আসলে কে? জানতে চাইলে বললেন, তিনি মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দলের ঢাকা দক্ষিণের সদস্য। তাদের এখানে পল্টন থানা বিএনপি এবং শ্রমিক দলের নেতাদেরও গাড়ি রয়েছে উল্লেখ করে স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতার নাম উল্লেখ করে বলেন, এরা আমাদের সঙ্গে রয়েছেন। আর মালিকদের তো একটা হ্যাডম আছে। তারা তো আর যে সে মালিক না।

রাজনৈতিক নেতারা কি বলছেন : জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী ফয়জুল হাকিম বলেন, রাজনৈতিক নেতারা যাতে না দাঁড়াতে পারে এ জন্য মুক্তাঙ্গনে সিটি করপোরেশন ডাস্টবিন নির্মাণ করেছে। সরকারের এই আচরণ অন্যায্য। এরপর গাড়ি ব্যবসায়ীরা বাকিটা দখল করে নেয়। আমরা বারবার বলে আসছি জনগণের প্রতিবাদ জানানোর নির্দিষ্ট জায়গা থাকতে হবে। সব বড় আধুনিক শহরে এটি রয়েছে। রাজনৈতিক এসব কর্মসূচিতে প্রবীণদের প্রতিরোধের ভাষা তরুণদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। আমরা রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই বয়োজ্যেষ্ঠদের দেখে শিখেছি প্রতিবাদ। প্রতিবাদ মানে অসহিষ্ণু আচরণ নয়। রাজনৈতিক কর্মসূচির জায়গা না থাকাতে তরুণরা রাজনৈতিক শিষ্টাচার শিখতে পারছে না।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ কাফি রতন বলেন, আওয়ামী লীগ মুক্তাঙ্গনকে ধ্বংস করেছে। এখানে সিটি করপোরেশন একটি ডাস্টবিন নির্মাণ করেছে। এখন গন্ধে মুক্তাঙ্গনে দাঁড়ানো যায় না। আমরা মুক্তাঙ্গন থেকে এসব সরিয়ে নেওয়ার জন্য বারবার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের কথা বলার স্বাধীনতা নানাভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। মুক্তাঙ্গন তাদের একটি নজির মাত্র।

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) জেনারেল সেক্রেটারি বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি স্বাধীনতার পর থেকে জনগণের একত্রিত হওয়ার স্থানগুলোর ওপর এক ধরনের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। আমরা মুক্তাঙ্গনে নানা দাবিতে একত্রিত হতাম। কিন্তু এক সময় মেয়র হানিফ এসে বললেন এখানে সভা-সমাবেশ করলে সচিবালয়ের সমস্যা হয়। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার গঠন করলেও মুক্তাঙ্গনকে আর জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। আরও পরে এসে মেয়র হানিফের ছেলে মেয়র সাঈদ খোকন মুক্তাঙ্গনে ডাস্টবিন নির্মাণ করেন। তিনি বলেন, সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা যার পাশে বাসস, ভূমি অফিস এবং পোস্ট অফিস রয়েছে সেখানে ডাস্টবিনতো এমনিতেই পরিবেশ দূষণ করে। মুক্তাঙ্গনের আজকের এই অবস্থা আমাদের মনে হয়, সরকার পরিবেশ দূষণ মেনে নিতে পারলেও জনগণের কথা বলাটা সহ্য করতে পারে না।

ঢাকা জেলা প্রশাসন কিছুই জানে না : আইন অনুযায়ী এই জমির মালিকানা রয়েছে ঢাকার জেলা প্রশাসনের কাছে। সিটি করপোরেশন জমিতে স্থাপনা নির্মাণ করলেও মুক্তাঙ্গনের সব নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা জেলা প্রশাসনের কাছে। জামাল উদ্দিন রিটে জেলা প্রশাসনকেও বিবাদী করেছে। মুক্তাঙ্গন বিষয়ে মো. জলাল উদ্দিনের রিট আবেদনের বিষয়ে জানার জন্য ঢাকার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি। তাকে মুক্তাঙ্গনের বিষয়ে কথা বলার আগ্রহ জানিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ কল করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। এরপর ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আব্দুর রফিউল আলমের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি এই রিট আবেদনের বিষয়ে কিছু জানাতে পারেনি। এমনকি মুক্তাঙ্গন কোথায় তিনি শুরুতে তা চিনতেই পারেননি।