কক্সবাজারের টেকনাফের দুর্গম পাহাড়গুলো এখন আর শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, তা পরিণত হয়েছে এক ভয়ংকর অপরাধের অভয়ারণ্যে। দীর্ঘদিন ধরে এই পাহাড়গুলোকে নিরাপদ আস্তানা বানিয়ে একাধিক সশস্ত্র চক্র চালিয়ে যাচ্ছে অপহরণ, জিম্মি বাণিজ্য, মুক্তিপণ আদায় ও মানব পাচারের মতো জঘন্য অপরাধ। গত বৃহস্পতিবার যৌথ বাহিনীর এক অভিযানে এই চক্রের বন্দিশালা থেকে ৫৬ জিম্মি উদ্ধার হওয়ার পর বেরিয়ে এসেছে পাহাড়ের ভেতরের অন্ধকার জগতের গা শিউরে ওঠা তথ্য।
কর্মকর্তারা বলেছেন, পাহাড়ে অপরাধের মূল চক্রকে সমূলে উৎপাটন করতে যৌথ বাহিনীর চিরুনি অভিযান অব্যাহত থাকবে। এরই মধ্যে অভিযানের দুই দিনের মাথায় গত শনিবার বিকেলে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের রইক্ষ্যং পাহাড়ি এলাকায় মোহাম্মদ রিহান (১১) নামের এক মাদ্রাসাছাত্রকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করেছে ডাকাতদল। অপহৃত রিহান স্থানীয় কৃষক জমিল হোছেনের ছেলে এবং বড়খিল নূরানি মাদ্রাসার পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। রিহানের মায়ের আর্তনাদ আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব অপরাধী চক্রের অন্যতম হচ্ছে মো. আলম, হাসান, নুর আলম, জাবু ডাকাত, বদরুদ্দীন ওরফে বদরুজ বাহিনী, খায়ের, পুতিয়া, সালমান শাহ, হাকিম বাহিনী, কালা বাঁশি, সানাউল্লাহ ওরফে সানা, রবিউল্লাহ, সাদ্দাম, মোহাম্মদ শাহ, হারুন, হামিদ।
চোখ বেঁধে হাঁটিয়ে জিম্মি বেচাকেনা : অপহরণ, জিম্মি বাণিজ্য, মুক্তিপণ আদায় ও মানব পাচারের চক্রটি কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ বা বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে অপহরণ করে। উখিয়ার মরিচ্যার বাসিন্দা মেহেদী হাসানকে গত ২৮ অক্টোবর টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ থেকে অপহরণ করা হয়। তার চোখ বেঁধে টানা একদিন পাহাড়ি পথে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় মানব পাচারকারীদের গহিন আস্তানায়। সেখানে তাকে দুই লাখ টাকায় অন্য একটি দালাল চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পাহাড়ের বন্দিশালাগুলো কেবল জিম্মি রাখার জায়গা নয়, এটি মূলত ‘মানুষ কেনাবেচার হাট’।
মানব পাচারের দালাল বলে পরিচিত বাহারছড়ার আহমদ কবির জানান, আলম, সালমান শাহ ও সাদ্দাম, হারুন বাহিনী প্রথমে অপহৃতদের লেদা, রঙ্গিখালী পাহাড়ি আস্তানায় আটকে রাখে। এরপর সাগরপথে মালয়েশিয়া বা অন্য কোথাও পাচারের জন্য ট্রলার আসার দিনক্ষণ ঠিক হলে, জিম্মিদের টেকনাফের বাহারছড়ার নোয়াখালীপাড়া ও কচ্ছপিয়া পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখান থেকে বিভিন্ন দালালের কাছে চড়া দামে মানুষ বিক্রি করে দেওয়া হয়।
এর আগে ২০ অক্টোবর রাতে বাহারছড়ার রফিক নামের একজনকে তার সুপারি বাগান থেকে অপহরণ করা হয়। অপহরণকারীরা তার পরিবারের কাছে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। তিন দিন পর ২৩ অক্টোবর তাকে ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে উদ্ধার করে পরিবার। রফিক দক্ষিণ শিলখালী এলাকার মমতাজ আহমেদের ছেলে ও বাহারছড়া ইউনিয়ন ছাত্রদল সভাপতি আবদুল্লাহ কায়সারের ভাই।
আরেক অপহৃত মাহমুদুল হাসানের এক স্বজন বলেন, ‘মেরিন ড্রাইভ থেকে মাহমুদুলকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। মনে করেছিলাম, ওকে আর জীবিত পাব না। পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে আমাদের কাছে মুক্তিপণ চাওয়া হয়। দালালরা হুমকি দিচ্ছিল যে, টাকা না পেলে ওকে মেরে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হবে। দুইদিন পর লাখ টাকা মুক্তিপণ দিলে মাহমুদুলকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আমরা এখনো আতঙ্কের মধ্যে আছি। এই পাহাড়ের জল্লাদদের যেন কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়।’
আরাকান আর্মির সাবেক যোদ্ধার রাজত্ব ও অত্যাধুনিক অস্ত্র : পাহাড়ের এই বন্দিশালাগুলো কতটা সুরক্ষিত এবং ভয়ংকর, তা উঠে এসেছে সম্প্রতি যৌথ বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া জিম্মিদের জবানবন্দিতে। তাদেরই একজন কক্সবাজারের ভারুয়াখালী এলাকার মো. ইসমাইল জানান, জিম্মিদের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি ও ভয় দেখাতে ভারী এবং অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের গহিন পাহাড়ে ঝুপড়ি ঘরে আটকে রেখে সব সময় ভারী অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানো হতো। অস্ত্রধারীদের মধ্যে সানাউল্লাহ ও সাদ্দাম নামে দুইজন ছিল সবচেয়ে নিষ্ঠুর। তারা বন্দিশালায় প্রায়ই বুক ফুলিয়ে বলত, আগে মিয়ানমারে ‘আরাকান আর্মি’র হয়ে যুদ্ধ করেছে। ফলে অস্ত্র চালানো এবং নির্যাতন করায় তারা অত্যন্ত দক্ষ।’
উখিয়ার শহিদুল ইসলাম বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে যৌথ বাহিনী বন্দিশালার কাছাকাছি পৌঁছলে কয়েকটি গুলির শব্দ শোনা যায়। বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে আলম বাহিনীর প্রধান আলম চিৎকার করে সানাউল্লাহ ও সাদ্দামকে সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়। তখন সানাউল্লাহ ও অন্য সন্ত্রাসীরা অত্যাধুনিক ‘জি-৩ রাইফেল’ দিয়ে যৌথ বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। তীব্র গোলাগুলির ভেতরে আমরা সুযোগ বুঝে দৌড়ে পালিয়ে আসি।’
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা বদিউল আলম বলেন, ‘ওরা মানুষ নয়, পিশাচ। আলম, সানাউল্লাহ ও সাদ্দামের মতো পেশাদার যোদ্ধা এবং খুনিরা পাহাড়ে রাজত্ব করছে। চোখের সামনে যেভাবে জি-৩ রাইফেল দিয়ে গুলি চালাতে দেখেছি, তা মনে করলে এখনো শরীর শিউরে ওঠে। যৌথ বাহিনী সঠিক সময়ে না পৌঁছলে হয়তো আমাদের লাশ সাগরে ভেসে বেড়াত।’
পাহাড় থেকে পাহাড়ে বন্দিশালা : টেকনাফ-কক্সবাজার প্রধান সড়ক থেকে কিছুটা দূরত্বের আনসার ক্যাম্প এবং বিজিবি ক্যাম্প। তাছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কঠোর নজরদারি থাকে। এসব নিরাপত্তা চৌকি ও নজরদারি এড়িয়েই অপরাধীরা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে অপহৃতদের দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে যায়। স্থানীয়দের কাছ থেকে ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, হ্নীলা ইউনিয়নের উনচিপ্রাংয়ের জুম পাহাড় এবং মিজ্জির পাহাড়সহ বিভিন্ন দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এই সশস্ত্র চক্রগুলো তাদের মূল ঘাঁটি গড়েছে। এই নেটওয়ার্কের মূল শক্তি আসছে সীমান্ত পাড়ের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির অভিজ্ঞতা থেকে। চক্রের অন্যতম প্রধান সানাউল্লাহ ওরফে সানা দীর্ঘদিন মিয়ানমারে আরাকান আর্মির হয়ে যুদ্ধ করেছেন। বছর দুয়েক আগে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার পর তিনি টেকনাফ-উখিয়ার পুরনো অপহরণকারী আলমের সঙ্গে হাত মেলান। সানাউল্লাহর মাধ্যমেই আলম আরাকান আর্মির উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে, ওপার থেকে অস্ত্র ও যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা শতাধিক সদস্যকে যুক্ত করে গড়ে তোলা হয় এই দুর্ধর্ষ অপহরণ সিন্ডিকেট।
স্থানীয়রা জানান, এই চক্রের অন্যতম শুটার কালা বাঁশি, যাকে স্থানীয় অপরাধজগতে ‘মগ বাগি’ নামে ডাকা হয়। তিনি অস্ত্র চালনায় অত্যন্ত দক্ষ এবং অতীতে আরাকান আর্মির ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা ছিলেন।
সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যোগ দিচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের যুবকরা : সীমান্ত পার হয়ে ওপারে গিয়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেওয়ার এই বিপজ্জনক প্রবণতা এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ। এ বিষয়ে ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক, অতিরিক্ত ডিআইজি মো. কাওসার সিকদার বলেন, ‘মাঝেমধ্যেই উখিয়া-টেকনাফ থেকে অনেক তরুণ-যুবক, বিশেষ করে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে গিয়ে সেখানকার সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। সেখানে হাতে-কলমে ভারী অস্ত্র চালানো রপ্ত করে তারা আবার সীমান্ত পেরিয়ে এপারে চলে আসে। এরপর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঢুকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে তারা এসব বড় ধরনের অপরাধমূলক সিন্ডিকেট গড়ে তুলছে।’ পাহাড়কে অপরাধমুক্ত করতে এবং এই জিম্মি বাণিজ্যের চিরতরে অবসান ঘটাতে স্থানীয় জনগণ এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর স্থায়ী ও কঠোর ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানাচ্ছেন।
বিশেষ অভিযান চলবে : টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। সম্প্রতি অভিযান পরিচালনাকারী যৌথ বাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘টেকনাফের পাহাড়ের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত দুর্গম, যা অপরাধীরা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। আলম বাহিনীর মতো সশস্ত্র গ্রুপগুলোর কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে। তবে আমাদের অভিযান চলমান আছে। কোনো সন্ত্রাসী বা মানব পাচারকারীকে বাংলাদেশের মাটিতে আস্তানা গড়তে দেওয়া হবে না। ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করা হয়েছে এবং এই চক্রের মূল হোতা আলম ও সানাউল্লাহসহ পুরো গ্যাংকে আইনের আওতায় আনতে চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় ও বিস্তারিত তথ্য নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাদের নিজ নিজ পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।’ বৃহস্পতিবারের অভিযান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে অভিযান শেষে ৫৭ জনকে উদ্ধারের কথা জানানো হলেও, পরে কঠোর স্ক্রিনিং ও তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে তাদের মধ্যে একজন ভুক্তভোগী নন, বরং তিনি এই মানব পাচার ও অপহরণকারী চক্রের সক্রিয় দালাল বা মধ্যস্থতাকারী। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগী ও উদ্ধার হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ৫৬ জন।
তিনি আরও বলেন, অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে আটককৃত দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িত মূল চক্রকে সমূলে উৎপাটন করতে পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় যৌথ বাহিনীর চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।