নিখোঁজ জিডি থেকে তথ্য নিয়ে অপহরণ নাটক

নিজেদের কাছে কোনো ভুক্তভোগী না রেখেই অপহরণের নাটক সাজিয়ে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করত একটি অনলাইন প্রতারকচক্র। ফেসবুকে নিখোঁজের বিজ্ঞপ্তি দেখে পরিবারের সদস্যদের নম্বর সংগ্রহ করে অপহরণকারী পরিচয়ে ফোন করত চক্রের সদস্যরা। পরে ভুক্তভোগীর কণ্ঠ নকল করে মারধর ও নির্যাতনের অভিনয় করে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায় করত তারা।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এমন একটি প্রতারকচক্রের মূলহোতা ফয়সাল আহমেদ ও তার সহযোগী আল-আমিনকে (৩৩) গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। সে সময় প্রতারণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ডিজিটাল আলামতও উদ্ধার করা হয়েছে।

গতকাল রবিবার এসআরবি-৩-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড মিডিয়া অফিসার মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান।

মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী জানান, গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানায় করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও এক ভুক্তভোগীর পরিবারের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রতারকচক্রের বিষয়ে তদন্ত শুরু করে এসআরবি। হৃদয়ন আনসারী নামে এক তরুণ গাজীপুর থেকে রাজধানীর মগবাজারে যাওয়ার পথে অপহরণের শিকার হয়েছেন বলে তার পরিবারকে ফোন করে জানানো হয়। অজ্ঞাত পরিচয়ের ব্যক্তিরা ফোন করে দাবি করেন, হৃদয়ন তাদের জিম্মায় রয়েছেন। তাকে ছাড়িয়ে নিতে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিতে হবে। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন বিকাশ ও নগদ নম্বরে ৪০ হাজার টাকা পাঠান। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও হৃদয়নের কোনো সন্ধান না পেয়ে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেন।

এ কর্মকর্তা বলেন, বিকাশ ও নগদ নম্বরের সূত্র ধরে ছায়া তদন্ত শুরু করে এসআরবি। গত ২৮ অক্টোবর যাত্রাবাড়ী এলাকায় একটি বিকাশের দোকান এবং টাকা দাবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজনকে আটক করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রতারকচক্রের দুই সক্রিয় সদস্যের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে পৃথক অভিযানে ফয়সাল ও আল-আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন জানিয়ে মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী বলেন, তারা দীর্ঘদিন ফেসবুকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে দেওয়া বিজ্ঞপ্তি থেকে পরিবারের সদস্যদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করতেন। পরে অপহরণকারী পরিচয়ে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করতেন। টাকা আদায় করতেন বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে।

তিনি জানান, চক্রটির কাছে প্রকৃতপক্ষে কোনো ভুক্তভোগী থাকত না। পরিবারের সদস্যরা অপহৃত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে চাইলে চক্রের সদস্য আল-আমিন ওই ব্যক্তির কণ্ঠ নকল করে কথা বলতেন।

সে সময় মারধর ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এমন অভিনয় করে পরিবারের সদস্যদের আবেগতাড়িত করা হতো। এতে আতঙ্কিত হয়ে স্বজনরা টাকা পাঠাতেন। জিজ্ঞাসাবাদে তারা এভাবে প্রতারণা করে টাকা আদায়ের কথা স্বীকার করেছেন। তাদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের এমএফএস লেনদেন পর্যালোচনা করেও এর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।

মেহেদী ইমরান সিদ্দিকী জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পিসিপিআর পর্যালোচনায় তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক অপহরণ মামলা ও জিডির তথ্য পাওয়া গেছে। কারও মোবাইল ফোন হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে অবশ্যই থানায় জিডি বা মামলা করতে হবে। হারানো ফোনে ব্যবহৃত সিম বন্ধ না করলে প্রতারকচক্র ওই সিম ব্যবহার করে নতুন করে বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) হিসাব খুলে প্রতারণা করতে পারে। এতে প্রকৃত মালিক অপরাধে জড়িত না থেকেও আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন।

এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার হলে আতঙ্কিত না হয়ে কাছাকাছি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এসআরবি-৩। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।