নদীর সঙ্গে আমাদের সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা প্রভৃতির সম্পর্কের কথা তো তোলাই যায়। কিন্তু নদ-নদী আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে কতটা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে, তার একটি মোক্ষম উদাহরণ হতে পারে ‘ভাতে-মাছে বাঙালি’ প্রবাদটি। প্রবাদটিতে যদিও সংখ্যাগুরু বাঙালি জনগোষ্ঠীকে নির্দেশ করা হয়েছে, প্রকৃত অর্থে বঙ্গীয় ব-দ্বীপের সব জাতি-গোষ্ঠীর জন্যই এটি সত্য। আর কে না জানে যে, সব সংস্কৃতির আদিতম উৎস হচ্ছে খাদ্য সংস্কৃতি। খাদ্যাভ্যাস থেকেই গড়ে উঠে সভ্যতা ও সমাজের বাকি বিষয়াবলি।
এ দেশে ভাত ও মাছ, দুই প্রধান খাদ্যেরই চূড়ান্ত অনুঘটক নদী। এটা ঠিক, বিল বা সাগরেও মৎস্যসম্পদ রয়েছে; কিন্তু এর যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে নদী। মাছের ধর্ম হচ্ছে, প্রজননকালে আবাসভূমি পরিবর্তন। অর্থাৎ বিলের মাছ নদীতে যায়, কিংবা নদীর মাছ বিলে যায়। যেভাবে সাগরের মাছ ইলিশ প্রজননের জন্য নদীতে আসে আর আমরা ভ্রমবশত পদ্মার ইলিশ বা মেঘনার ইলিশ নাম দিই। নদী না থাকলে এই সংযোগসূত্র ছিঁড়ে যেতে বাধ্য। আবার এই ব-দ্বীপে ধানি ভূমির উর্বরতা রক্ষার মূলে রয়েছে নদী-সিঞ্চিত পলল বা তলানিপ্রবাহ। গভীর-অগভীর নলকূপ আসার পর শুকনো মৌসুমের সেচের জন্য নদী যদিও আগের মতো একমাত্র ভরসা নয়; সেই ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরন ও উত্তোলনযোগ্য স্তর রক্ষায় এখনো সচল নদীর বিকল্প নেই।
আবার আমাদের দেশে নদী-সংস্কৃতির যে রূপান্তর ঘটছে, সেটাও একই প্রবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। যেমন : দেশের নদ-নদীর সংকট কী, এই প্রশ্নের জবাবে ছয়টি সংকটের নাম মুখস্থই বলা যায় যে প্রবাহস্বল্পতা, ভাঙন, দখল, দূষণ, বালু উত্তোলন, অপরিকল্পিত স্থাপনা। এসব সংকটের কারণ কী? প্রত্যেকটি সংকট ধরে গুচ্ছ গুচ্ছ অভিসন্দর্ভ লেখা সম্ভব; লেখাও হয়নি কম। কিন্তু এক কথায় যদি উত্তর দিতে হয়, নদীর সব সংকট ও ব্যাধির মূলে রয়েছে সাংস্কৃতিক বিমুখতা।
ছয়টি সংকট ও একটি কারণ, নদ-নদী সম্পর্কিত এই সাতটি প্রপঞ্চ আবার দুষ্টচক্রের মতো পরস্পর সম্পর্কিত। যেমন অপরিকল্পিত স্থাপনা থেকে দেখা দেয় প্রবাহস্বল্পতা। প্রবাহস্বল্পতা থাকলেই একটি নদীতে ভাঙন দেখা দেয়, চর পড়ে। চর পড়া এবং ভাঙন দেখা দেওয়া পরস্পর সম্পর্কিত। চর পড়লে ভাঙন অনিবার্য, আর ভাঙন দেখা দিলে চর পড়া অনিবার্য। চর পড়লে সেখানে দখল হয়; কৃষি, আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প স্থাপনা হয়। এসব স্থাপনা থেকে আসে দূষণ। ‘উন্নয়ন’ করার প্রশ্নে আসে বালু তোলার প্রশ্ন। আর সবই ঘটে, আগেই বলেছি, সাংস্কৃতিক বিমুখতার কারণে।
প্রশ্ন হতে পারে, সাংস্কৃতিক বিমুখতা শুরু হয়েছে কখন থেকে? যখন বাঙালির ভাত ও মাছের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক ফিকে হতে শুরু করেছে। যখন কৃষিতে নদী-জলাশয়ভিত্তিক সেচের বদলে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে আপদ হিসেবে এসেছে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক। এতে একদিকে যেমন ভাত গুণ ও স্বাদ হারিয়েছে, অন্যদিকে কৃষিজমি ধোয়া রাসায়নিক ও কীটনাশক জলাশয়ে মৎস্যসম্পদ বিনাশ করেছে।
অনেকে প্রশ্ন করেন, দেশের নদীগুলোর নাম এত সুন্দর কেন? সন্ধ্যা, সুগন্ধা, তিতাস, মালঞ্চ, সোনাভরি, সুরমা, কুহেলিয়া কোথায় পেল তাদের নাম? এর মূলে রয়েছে উপযোগিতা। জীবনদায়ী সুপেয় পানি নদী ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যেত না বলেই সবচেয়ে সুন্দর নামটি নদীর জন্যই বরাদ্দ থাকত। শুধু সুপেয় পানি নয়; সেচ, পলল ও মৎস্যসম্পদের কথা আগেই বলেছি, প্রাথমিক যুগে নৌপথই ছিল যাতায়াত ও বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম। আজও গৃহস্থালি ও শিল্প-কারখানার পানি নদী থেকেই আসে। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে চিত্তবিনোদনে নদীর উপযোগিতা। সাংস্কৃতিক বিমুখতার কারণে এসব উপযোগিতা উপেক্ষিত হতে থাকে।
নদীর ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক বিমুখতার একটি প্রতীকী চিত্র দেখা যায় বুড়িগঙ্গা পাড়ে আহসান মঞ্জিল এলাকায় গেলে। নবাবি আমলের ওই স্থাপনা নদীর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে। আর আশপাশে পরবর্তীকালে গড়ে ওঠা বাকি সব স্থাপনা নদীর দিকে পেছন ফিরিয়ে দাঁড়ানো। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, আমরা কীভাবে নদীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি।
আর নদীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নদী বা জলাভূমি দখলের যে মনস্তত্ত্ব গড়ে ওঠে, সেখানে ধরে নেওয়া হয় অবিলম্ব লাভ ও মুনাফাই উত্তম। এটা অনেকটা কৃষকের সোনার ডিম পাড়া হাঁসের গল্পের মতো। প্রতিদিন একটি করে ডিম পাওয়ার পর লোভী কৃষক ভেবেছে ওই হাঁসের বুক চিড়ে সব সোনার ডিম একদিনে বের করে নেবে। বাস্তবে দেখো যেখানে নাড়িভুঁড়ি ছাড়া কিছু নেই।
আমাদের নদীগুলো এক-একটি সোনার ডিম পাড়া হাঁস। আবহমানকাল থেকে এখানকার ভূমি গঠন করেছে, এখনো করে চলেছে দক্ষিণে; সেই ভূমির সভ্যতা, সমাজ, সংস্কৃতি, যোগাযোগ, খাদ্যাভ্যাস, উৎপাদনব্যবস্থা, যোগাযোগ, এককথায় প্রকৃতি থেকে প্রতিরক্ষা সবই গড়ে তুলেছে। এখন আমরা ভাবছি, নদীর বুক চিড়ে লাখো কোটি বছরের সম্পদ এক দিনে বের করে নেব। কিন্তু তাতে যে শুধু মুখ ব্যাদান করে থাকা দুর্যোগ ছাড়া কিছুই মিলছে না, এরই মধ্যে তা স্পষ্ট।
নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি দিয়ে আরও স্পষ্ট বোঝানো যায়। যেমন নদী থেকে বালু তোলার মাধ্যমে সেটার মৎস্যসম্পদ, জল-কাঠামো নষ্ট করা হয়। আবার সেই বালু দিয়ে দখল ও ভরাট করা হয় অন্য কোনো নদী বা জলাভূমি। আবার নদী ও জলাভূমি দখল করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া ব্যক্তিরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আর্থসামাজিক ভারসাম্য এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করে। তখন তিনি আইন ও সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিপুল বিক্রমে নদী দখল ও দূষণ চালিয়ে যেতে থাকে।
নদী সংস্কৃতি ও তার ব্যবহারিক মূল্য তখন তার বা তাদের কাছে কৌতুকের বিষয় মাত্র।