রোজা রেখে দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করার চেয়েও বড় পরীক্ষা হলো নিজের অবাধ্য প্রবৃত্তি ও ইন্দ্রিয়কে কঠোরভাবে বশে রাখা। মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করার এই অনন্য ইবাদতে শুধু পানাহার ত্যাগ করাই যথেষ্ট নয়, বরং অন্তরে একনিষ্ঠতা লালন করা প্রতিটি রোজাদারের জন্য খুবই প্রয়োজন। রমজানের রোজার প্রতিদান ব্যাপক। এর জন্য দেওয়া হবে অগণিত সওয়াব। আর তা পরিপূর্ণভাবে অর্জন করার জন্য শুধু উপবাস থাকলেই হবে না। বরং রোজার হক আদায় করতে হবে। রোজার আদব রক্ষা করতে হবে। অন্যথায় রোজা হবে সওয়াবহীন। রোজার হক ও আদব রক্ষার জন্য করণীয় হলো, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একনিষ্ঠভাবে রোজা পালন করা। কেননা তা ছাড়া কোনো ইবাদতই গ্রহণীয় হয় না।
মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, রোজা শুধু তারই জন্য। মূলত সব ইবাদতই তার জন্য। তবু রোজাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো, রোজাদার শুধু আল্লাহর জন্যই সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকেন। এ ছাড়া রোজায় লোকদেখানোর বিষয়টি খুব কম। কেননা অন্যান্য ইবাদতের আকৃতিগত রূপ আছে। যেমন : নামাজ, জাকাত কিংবা হজ পালনের সময় অন্যান্য মানুষ তা দেখে বুঝতে পারে অমুক ইবাদত পালন করা হচ্ছে। পক্ষান্তরে রোজা এমন এক ইবাদত, যেটার উল্লিখিত ইবাদতগুলোর মতো বিশেষ কোনো আকৃতিগত রূপ নেই। তাই কাউকে পানাহাররত অবস্থায় দেখা ছাড়া বোঝার উপায় নেই, সে রোজা রেখেছে কি না। সে রোজা রেখেছে কি না, তা জানেন শুধু আল্লাহ। তাই রোজায় লোকদেখানোর বিষয়টি সাধারণত সামনে আসে না। তবে রোজার ক্ষেত্রেও বিষয়টি লোকদেখানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
মহান আল্লাহ রোজার কাঠামো ও ক্রিয়াকলাপকে অন্যান্য ইবাদত থেকে আলাদা করে এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে রোজায় একমাত্র তার সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য না থাকে। আর মানুষ রোজা রাখেও সেই উদ্দেশ্যে। তবু বিভিন্ন কারণে সেই উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়ে যেতে পারে। সেই উদ্দেশ্য ব্যাহত হলে রোজা কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না।
শুধু উদরকে খাবার থেকে এবং প্রবৃত্তিকে কামাচার থেকে বিরত রাখার নাম রোজা নয়। এগুলোর সঙ্গে জিহ্বা, কান ও চোখেরও রোজা রয়েছে। রোজা রেখে জিহ্বাকে সংযত করতে না পারলে রোজা হবে সওয়াবহীন। জিহ্বা অধিকাংশ অনিষ্টের মূল। অধিকাংশ গুনাহের কাজ সংঘটিত হয় জিহ্বার মাধ্যমে। তাই রোজা রেখে মিথ্যা বলা, পরনিন্দা করা, কুৎসা রটানো, ঝগড়া করা, গালি দেওয়া ও অশ্লীল কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, সুফিয়ান ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘আমি এক দিন রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! যে জিনিসগুলো আপনি আমার জন্য ভয়ের বস্তু বলে মনে করেন, তার মধ্যে অধিক ভয়ংকর কোন জিনিস? সুফিয়ান (রা.) বলেন, এটা শুনে রাসুল (সা.) নিজের জিহ্বা ধরে বললেন, এটা।’ (তিরমিজি)
যেসব কথা মুখে বলা না জায়েজ, সেসব কথার প্রতি কর্ণপাত করারও একই হুকুম। যদি অশ্রাব্য কোনো কথা কানে চলে আসে কিংবা কোনো মজলিসে যদি কারো গিবত হতে থাকে, তাহলে আবশ্যক হলো তা করতে নিষেধ করা, না শুনলে ওই স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়া। অন্যথায় ইচ্ছাকৃতভাবে অশ্রাব্য কথা ও গিবত শ্রবণ করার কারণেও রোজা সওয়াবহীন হয়ে যাবে। কেননা অশ্রাব্য কথা বলা ও গিবত করা যেমন অপরাধ ঠিক একই অপরাধ অশ্রাব্য কথা ও গিবত শোনা।
মনকে প্রবৃত্তি থেকে ফিরিয়ে রাখতে চোখের সংযমের গুরুত্ব অনেক। কেননা দৃষ্টি প্রথমত আকর্ষণ জাগায়। আকর্ষণ মানুষের চিন্তাকে বিভ্রমে নিমজ্জিত করে। অতঃপর মানুষ অশালীন কাজে জড়িয়ে পড়ে। তাই নিষিদ্ধ দৃষ্টিপাত থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। অন্যথায় নিষিদ্ধ দৃষ্টিপাত রোজার শক্তিকে স্তিমিত করে দেবে। তাই আসুন, রোজার হক পরিপূর্ণভাবে আদায় করি। অন্যথায় রোজা হবে শুধু উপবাসের নাম।
লেখক : ইমাম ও খতিব, দারোগা আমীর উদ্দিন ঘাট মসজিদ, বাবুবাজার, ঢাকা