ফাঁদে ফাইলবন্দি পরোয়ানা

আপডেট : ২০ জুন ২০২৬, ০৮:২৪ এএম

জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে গত বছরের ২৩ অক্টোবর সাতক্ষীরা সদরে নাহিদ ও রিপনসহ তাদের বাহিনীর সদস্যরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রমজান আলীর বাড়িতে হামলা চালায়। এতে গুরুতর আহত রমজান আলীর মেজ ভাই আব্দুর রহমান বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। কিন্তু আসামিরা ধরা না পড়ায় বাদী আদালতের শরণাপন্ন হন। পরে আদালত নাহিদ, রিপন, সিরাজুল ইসলাম, আব্দুল গফফার, জিল্লু, আব্দুল গফফারের স্ত্রী শাহানারা খাতুন, তাদের মেয়ে খুকু মনির বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করলেও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।

নাম প্রকাশ না করে ফেনীর এক ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বছর তিনেক আগে একটি নারী নির্যাতন মামলায় দুই আসামিকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। অথচ তারা দিব্যি এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আদালত থেকে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়না জারি করা হলেও তারা আছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এভাবে সারা দেশের থানাগুলোতে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে হাজার হাজার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও হুলিয়া। অথচ এসব পরোয়ানা কার্যকর করার দায়িত্ব মাঠ পুলিশের।

জানা যায়, গত পাঁচ বছরে প্রায় ৮০ হাজার আসামির বিরুদ্ধে পরোয়ানা-হুলিয়া জারি করেছে আদালত। আসামিদের মধ্যে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নারী-শিশু নির্যাতন, দস্যুতা, ছিনতাইসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে। তা ছাড়া ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়ের হওয়া রাজনৈতিক মামলার আসামিও আছে এ তালিকায়। কিন্তু পরোয়ানাভুক্ত এসব আসামি না ধরার পেছনে আসামিদের স্থান পরিবর্তন, নাম-পরিচয় ভুল এবং থানা পুলিশ ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তাদের উদাসীনতার অভিযোগ আছে। আবার অনেক আসামি তদবির ও অর্থের বিনিময়েও গ্রেপ্তার এড়াতে পারছে। আর ফাইলবন্দি পরোয়ানার স্তূপ বাড়ছে।

তবে ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশ সদর দপ্তর সবকটি ইউনিটপ্রধানদের বিশেষ বার্তা দিয়েছে। বার্তায় বলা হয়েছে, যেসব আসামির বিরুদ্ধে পরোয়ানা বা হুলিয়া আছে, তাদের ধরতে না পারলে কারণসহ লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। এর পাশাপাশি পুলিশের কোনো সদস্য বা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের অবহেলার তথ্য পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।  

জানা গেছে, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ‘গ্রেপ্তারি পরোয়ানা’। আইন অনুযায়ী কোনো অপরাধীকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে বা তদন্তের স্বার্থে তা ইস্যু করা হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ পরোয়ানার কার্যকারিতা, অপব্যবহার ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ নিয়ে বিচার বিভাগ ও জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেক সময় দেখা যায়, ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে বা যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই জারি করা পরোয়ানার কারণে নিরপরাধ ব্যক্তি দীর্ঘ সময় কারাভোগ করছেন। তবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও হুলিয়ার মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আফতাব উদ্দিন সিদ্দিকী রাগীব দেশ রূপান্তরকে বলেন, সব হুলিয়াই পরোয়ানা কিন্তু সব পরোয়ানা হুলিয়া নয়। হুলিয়া হলো পরোয়ানার পরের ধাপ, পরোয়ানায় কাজ না হলে হুলিয়া জারি করে আদালত। পরোয়ানায় আসামির সম্পত্তি ক্রোক করা যায় না, আর হুলিয়ায় আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে আসামির সম্পত্তি ক্রোক করা যায়। পরোয়ানার বিষয়টি পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে থাকে, আর হুলিয়া আসামির বাসস্থান বা জনসমাগমস্থলে সেঁটে দেওয়া হয় কিংবা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।   

পুলিশসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিভিন্ন থানায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত প্রায় ৮০ হাজার আসামি দীর্ঘদিন ধরে পলাতক বা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। এর মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে হুলিয়াও রয়েছে। আসামি হাজিরের জন্য থানাগুলোতে জারি হওয়া পরোয়ানাগুলোর প্রায় ৭৫ শতাংশই বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে। পলাতক থাকার প্রধান কারণগুলো হচ্ছেআসামির ঠিকানা পরিবর্তন ও নাম-পরিচয় শনাক্ত করতে না পারা। এ ছাড়া পুলিশের জনবল সংকট ও সদিচ্ছার অভাবও উল্লেখযোগ্য। থানাগুলোতে বিপুলসংখ্যক ওয়ারেন্ট ইস্যু থাকলেও সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে এবং প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে নিয়মিত অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। পরোয়ানায় আসামির ঠিকানা ও নাম প্রায়ই ভুল বা অসম্পূর্ণ থাকার কারণে তারা গা ঢাকা দিচ্ছে। অনেক সময় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের ধরে না। ফলে পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের আইনের আওতায় আনার পরিকল্পনা এখন অনেকটাই ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। তা ছাড়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সহিংসতা, নাশকতা এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনের জের, হত্যাকান্ডসহ বিভিন্ন ধরনের মামলার আসামিদের ধরা যাচ্ছে না নানা কারণে। আদালতের নির্দেশনুযায়ী, আসামিদের গ্রেপ্তারে বিষয়টি বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকায় তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার পরিকল্পনা আছে পুুলিশ সদর দপ্তরের।

পুলিশ সূত্র জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও কঠোর অবস্থান ও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার লেশমাত্র নেই। উল্টো ঢালাও মামলার ফাঁদে পড়ে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, আর লাখ লাখ মানুষের মাথার ওপর ঝুলছে গ্রেপ্তারের খড়্গ। পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা, রাজনৈতিক সমঝোতা, তদন্তে গাফিলতি এবং আদালতের আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে এই বিশালসংখ্যক আসামিকে ধরার তোড়জোড় এখন কেবলই কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থাকছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলন-পরবর্তী সহিংসতা এবং সরকার পরিবর্তনের অন্তর্র্বর্তীকালে দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নাম উল্লেখসহ হাজার হাজার ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামি করা হয়। পুলিশের পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলায় দায়ের হওয়া এমন মামলার সংখ্যা কয়েক হাজার, যেখানে মোট আসামির সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়ে গেছে। কোনো কোনো একটি নির্দিষ্ট মামলায় বা থানা এলাকার এজাহারেই পাঁচ থেকে ১০ হাজার অজ্ঞাতনামা আসামি করার নজির রয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পরোয়ানা ফিকে হয়ে যাওয়ার পেছনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক একাধিক কারণ আছে। মামলাগুলোতে সুনির্দিষ্ট নাম না থাকায় মাঠপর্যায়ের একশ্রেণির অসাধু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও বাণিজ্যের অভিযোগ আছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশ সদর দপ্তরের কঠোর নজরদারি ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার কারণে ঢালাও গ্রেপ্তার বন্ধ রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়া কাউকে আটক-গ্রেপ্তার না করার নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে অভিযানে স্থবিরতা এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ বাহিনীর চেইন অব কমান্ড এবং মাঠপর্যায়ের কাঠামোতে বড় ধরনের রদবদল হয়েছে। অনেক পুলিশ সদস্য এখনো এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপে ভুগছেন। তা ছাড়া নিয়মিত অপরাধ (চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাই ও মাদক) দমনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল সংকট আছে থানায়। ফলে আসামি ধরতে নানা সমস্যার মধ্যেই থাকতে হচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশন) রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। অনেক সময় আসামিদের ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া যায় না। আদালতের নির্দেশ মেনেই কাজ করছে পুলিশ। তবে পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে পুলিশকে বিভিন্ন দিকনির্দেশনামূলক বার্তা দেওয়া হয়েছে।     

জানা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৪১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা আছে। আসামির মধ্যে রাজনীতিবিদ, বিচারক ও আমলার সংখ্যাই ৭২ জন। বাকি আসামিদের মধ্যে পুলিশের সংখ্যা ৬২ ও ৯ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ও বরখাস্তকৃত কর্মকর্তা আছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধারণত কারও বিরুদ্ধে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা পরোয়ানা বা হুলিয়া থাকলে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, এক জেলার বাসিন্দা অথচ অন্য দূরবর্তী কোনো জেলায় তার নামে সিআর মামলা করে পরোয়ানা জারি করানো হয়েছে, যেখানে আসামি কোনোদিন যাননি। পরোয়ানা তামিল করার ক্ষেত্রে পুলিশের যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতি থাকার বিষয়ে অভিযোগ আসছে তা সত্য। আবার অনেক সময় নামের মিল থাকার কারণে ভুল ব্যক্তিও গ্রেপ্তার হচ্ছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত