ভালো ফলের পাশাপাশি চরিত্র গঠন জরুরি

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৬ এএম

দেশের আলোচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিরপুরের ‘মারকাযু ফয়জিল কোরআন আল ইসলামী ঢাকা’। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাটি অল্প সময়ের মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, তুরস্ক ও কুয়েতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে এবং কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে অভাবনীয় ফলাফলে আলোচনায় ওঠে আসে। ছাত্রদের সাফল্য, পড়ালেখাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং গুলশান সোসাইটি জামে মসজিদের খতিব মুফতি মুরতাজা হাসান ফয়েজী মাসুম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুফতি আতিকুর রহমান

দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় আপনার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী শেখ সাদ মুহাম্মদ নূর তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে। এই অর্জনে আপনার অনুভূতি কী?

মুফতি মুরতাজা মাসুম : আমাদের প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান ‘মারকাযু ফয়জিল  কোরআন’ যখনই দেশের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে কোনো অর্জন নিয়ে দেশে ফেরে তখন আমাদের আনন্দের সীমা থাকে না। শুধু আমি নই, আমাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শুভাকাক্সক্ষীরা ভীষণ খুশি হন। তবে এবার যুক্তরাজ্যের এ অর্জন আমাদের আনন্দে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। তা হলো, প্রথমবারের মতো ইউরোপে বাংলাদেশের খুদে হাফেজের বিশ্বজয়, সেটা আবার আমাদের প্রতিষ্ঠান ‘মারকাযু ফয়জিল কোরআন’-এর হাত ধরেই। এ কারণে আমরা খুশি, আলহামদুলিল্লাহ।

দেশ রূপান্তর : সাদ নূরের এই সাফল্যের পেছনে তার ব্যক্তিগত মেধা ও পরিশ্রমের পাশাপাশি মাদ্রাসার কী ধরনের ভূমিকা ছিল?

মুফতি মুরতাজা মাসুম : হাফেজ সাদ নূর দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগতভাবে তো চেষ্টা করছিলই। সেই সঙ্গে শিক্ষকরা তাকে বিশেষ পরিচর্যা করে আসছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় সে যুক্তরাজ্য প্রতিযোগিতার জন্য বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত হয়। প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তাকে নিয়ে আমাদের সর্বোচ্চ মেহনত চলমান থাকে এবং এর ফলেই মহান আল্লাহ তাকে প্রথমবারের মতো কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জন করার তৌফিক দান করেন।

দেশ রূপান্তর : আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় ভালো করার জন্য একজন শিক্ষার্থীকে আপনারা কীভাবে প্রস্তুত করেন?

মুফতি মুরতাজা মাসুম : প্রথমত প্রতিভা যাচাই করি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করি। বিশেষ করে ভালো হিফজের পাশাপাশি তাজবিদ, ওয়াকফ, ইবতেদা তথা শ্বাস ছোট হলে বড় আয়াতের কোথায় থামতে হবে এবং কোথা থেকে শুরু করতে হবে এ বিষয়গুলোর প্রতি সর্বোচ্চ যতœ নিয়ে থাকি। আর এ বিষয়গুলোই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভালো কিছু করার জন্য অত্যন্ত সহায়ক হয়ে থাকে।

দেশ রূপান্তর : আপনার মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষার্থী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করেছে। ধারাবাহিকভাবে এমন সাফল্যের রহস্য কী?

মুফতি মুরতাজা মাসুম : ইতিমধ্যেই ‘মারকাযু ফয়জিল কোরআন’-এর ছাত্ররা সৌদি আরব, দুবাই, তুরস্ক, ইরান ও কুয়েতে প্রথম হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও লিবিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল করতে সক্ষম হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। আমি মনে করি, এর পেছনে নিয়ামক শক্তি হলো, পরিকল্পনামাফিক ছাত্রদের গড়ে তোলা। একজন ছাত্রের পেছনে শিক্ষকরা বিরামহীন ও হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করেন। ভালো ফলাফল করলে তো ছাত্রের নাম হয়, শিক্ষকের নাম সেভাবে আসে না, কিন্তু তারপরও ওই শিক্ষক ছাত্রকে গড়ার পেছনে খাটেন শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আর ছাত্রও বুঝেন তাকে কি করতে হবে। সে তার কাজটা মনোযোগ দিয়ে করে। আর সব থেকে বড় কথা হলো, মহান রবের মহান অনুগ্রহ।

দেশ রূপান্তর : অনেক শিক্ষার্থী হিফজ শেষ করার পর মুখস্থ ধরে রাখতে পারে না। আপনার মাদ্রাসায় হিফজ মজবুত রাখার জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে?

মুফতি মুরতাজা মাসুম : হাফেজ হওয়ার পর যখন ছাত্ররা কিতাব বিভাগে অধ্যয়ন করে অথবা পড়ালেখা সমাপ্ত করে সাধারণত তখনই হিফজ ভুলে যায়। যেসব ছাত্ররা আমাদের মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে, আমরা তাদের দৈনন্দিন রুটিন মাফিক কোরআন তেলাওয়াত করতে উৎসাহের পাশাপাশি কখনো কখনো বাধ্য করে থাকি অর্থাৎ তার দৈনন্দিন পড়ালেখার রুটিনে নির্দিষ্ট পরিমাণ কোরআন তেলাওয়াত বাধ্যতামূলক থাকে। যারা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় তাদের নির্দিষ্ট অংশ অথবা পূর্ণ কোরআন থেকে ছাত্রদের সামনে প্রশ্ন করা হয়। অর্থাৎ তাকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের উপযোগী রাখতে সব সময় চর্চায় রাখা হয়। বলতে পারেন, তাকে এক ধরনের রিহার্সেলের মধ্যে থাকতে হয়। যেন তার ভয় ও জড়তা কেটে যায়। সাবলীলভাবে কোরআন তেলাওয়াত করতে সক্ষম হয়।

দেশ রূপান্তর : পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনে আপনারা কীভাবে কাজ করেন?

মুফতি মুরতাজা মাসুম : বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠন গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ভালো ও মেধাবী ছাত্র হলো, কিন্তু তার চরিত্র ঠিক নেই, এটা হতে পারে না। তাই আমরা শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে তাদের মনন গঠনকে বেশি গুরুত্ব দিই। কারণ মন থেকে আসে ইচ্ছাশক্তি। মনের জোর বা শক্তিকে বলা হয় মনোবল। যা মানুষের অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই মনের সুস্থতা ও পবিত্রতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি শারীরিক সুস্থতা-অসুস্থতাও নির্ভর করে মনের সুস্থতা-অসুস্থতার ওপর। এ জন্য ছাত্রদের বিশেষ তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞ আলেমদের মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার চর্চা করা হয়। তাদের মুখ থেকে কোরআন-সুন্নাহর অমিয় বাণী শুনে শিক্ষার্থীরা উদ্দীপ্ত হয়। তাদের নির্দেশনাগুলো হাতে-কলমে আমাদের শিক্ষকরা বাস্তবায়ন করে থাকেন।

দেশ রূপান্তর : শিক্ষক নির্বাচন, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাদানের মান নিশ্চিত করতে আপনারা কী ধরনের নীতি অনুসরণ করেন?

মুফতি মুরতাজা মাসুম : খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছেন। আসলে শিক্ষক নির্বাচন অত্যন্ত কঠিন একটি বিষয়। এক্ষেত্রে চেষ্টা করি, আমাদের পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করতে। তারা শিক্ষকদের যোগ্যতাকেই মানদণ্ড হিসেবে ধরতেন না, বরং যোগ্যতার পাশাপাশি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো গভীরভাবে লক্ষ্য রাখতেন। আমরাও সেই বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। শিক্ষকদের পড়াশোনার সময় মশক অর্থাৎ আয়াতে আয়াতে অনুশীলনের পাশাপাশি দৈনিক নির্দিষ্ট সময় ঘণ্টাব্যাপী আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত হাফেজ ও কারিদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ করানো হয়।

দেশ রূপান্তর : অভিভাবকদের কী পরামর্শ দেবেন, যারা সন্তানকে হিফজ পড়াতে চান, কিন্তু পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন?

মুফতি মুরতাজা মাসুম : অভিভাবকদের জন্য আমার পরামর্শ থাকবে, সন্তানকে ভালো হাফেজ-আলেম এক কথায় ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রথমত ভালো নির্ভরযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন করতে হবে। আর প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের মানদ- হবে একজন মেহনতি, চরিত্রবান শিক্ষক। তারপর সেখানকার আবাসিক থাকা ও খাবারের সুব্যবস্থার বিষয়টিও লক্ষ্য রাখতে হবে। তবে এটা মৌলিক বিষয় নয়, বরং যখন শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষকদের মেহনতই হবে মৌলিক বিষয়, তখনই আপনার সন্তান মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।

দেশ রূপান্তর : আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্তদের অধিকাংশই আলেম হচ্ছে না, যারা আলেম হচ্ছে, তারাও খুব মানসম্মত না। কিন্তু কৃতী হাফেজরা আপনার প্রতিষ্ঠানের কিতাব বিভাগে কৃতিত্বের সঙ্গে পড়াশোনা করে যাচ্ছে, যা অন্য প্রতিষ্ঠানে খুব একটা দেখা যায় না, এটা কীভাবে সম্ভব?

মুফতি মুরতাজা মাসুম : আলহামদুলিল্লাহ, এক্ষেত্রে ‘মারকাযু ফয়জুল  কোরআন’ অনন্য। এখানের হাফেজ ছাত্ররা যেভাবে দেশ-বিদেশে বিরতিহীন কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল করছে তদ্রƒপ কিতাব বিভাগের ছাত্ররা কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাক ও হাইয়ায় সারা বাংলাদেশে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় হওয়ার পাশাপাশি অত্যন্ত ভালো ও ঈর্ষণীয় ফলাফল করছে। আমি মনে করি, এ জন্য সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জনকারী ছাত্রদের খ্যাতির বিড়ম্বনা থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করার পাশাপাশি অর্থের মোহ যেন পেয়ে না বসে সেদিকে লক্ষ্য রাখা। ছাত্র যেন আমাকে অথবা আমার প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করার হাতিয়ার না হয় সেদিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখা জরুরি। আর এসব তখনই সম্ভব, যখন শিক্ষকের মানসিকতায় পরিবর্তন আসবে অর্থাৎ আমি আমার উচ্চাকাক্সক্ষা পূরণের জন্য আমার কলিজার টুকরা সন্তানকে অসৎ পথে ব্যবহার করব না, তখনই ইনশাআল্লাহ আমাদের ছেলেরা বিশ্বজয়ী হাফেজ হওয়ার পাশাপাশি বিদগ্ধ আলেম হিসাবে গড়ে উঠবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত