লিবিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক অপহরণ করে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়, গ্রেপ্তার ২

অস্ত্রের মুখে অপহরণের পর ভিডিও কলে দেখানো হয় মারধরের দৃশ্য। জীবন বাঁচাতে পরিবারকে দিতে হয় ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। 

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৩ পিএম

লিবিয়ায় বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিককে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নির্যাতনের ভিডিও পরিবারকে দেখিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে সংঘবদ্ধ চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নারায়ণগঞ্জ জেলা। গ্রেপ্তার দুজন হলেন উত্তম সরকার ওরফে সুমন (৪৪) ও মর্জিনা বেগম (৩৯)। তাদের মধ্যে মর্জিনা বেগম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) পিবিআইয়ের ফেসবুক পেজে এ তথ্য জানানো হয়।

পিবিআই জানায়, গত ১৭ মার্চ ২০২৫ লিবিয়ার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টার দিকে রাজধানী ত্রিপোলির আনজারা এলাকায় নিজ বাসার সামনে থেকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের ইদ্রিস আলীকে (৫৪) অপহরণ করা হয়। উত্তম সরকার ওরফে সুমন, আসলাম, আরিফ মোল্লা, রাজু মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা ৫ থেকে ৬ জন বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র নিয়ে তিনটি গাড়িতে করে তার বাসা ঘিরে ফেলেন। পরে অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে তাকে গাড়িতে তুলে চোখ বেঁধে দেওয়া হয়।

অপহরণকারীরা ইদ্রিস আলীর পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন, টাকা ও কাগজপত্র নিয়ে নেয়। প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা গাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর অজ্ঞাত একটি ভবনের কক্ষে তাকে আটকে রাখা হয়।

দুই দিন পর ইদ্রিস আলীকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে মারধর করা হয়। এরপর ১৯ মার্চ সকালে তার স্ত্রী ফাতেমা বেগমের মোবাইলে ইমোতে ভিডিও কল করে তাকে মারধরের দৃশ্য দেখানো হয়। একই সঙ্গে ইদ্রিসকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।

পরে ইদ্রিস আলীর স্ত্রীকে শিপন মিয়ার নামে একটি ইসলামী ব্যাংক হিসাব নম্বর দিয়ে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ইদ্রিসকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। স্বামীর জীবন বাঁচাতে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে ওই দিনই ২০ লাখ টাকা পাঠান ফাতেমা বেগম।

পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০ লাখ টাকা পাওয়ার পর দুই দিন ইদ্রিসকে মারধর করা হয়নি। এরপর আবারও তার ওপর নির্যাতন শুরু হয় এবং আরও ৩০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দিয়ে লোহার রড দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। এতে ইদ্রিসের ডান পা ভেঙে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়।

অপহরণকারীরা তাকে দিনে মাত্র একটি রুটি ও এক বোতল পানি দিত বলে জানিয়েছে পিবিআই। এভাবে দিনের পর দিন মারধরের পাশাপাশি তাকে অনাহার-অর্ধাহারে রাখা হয়।

স্বামীর জীবন বাঁচাতে ইদ্রিসের স্ত্রী ৬ এপ্রিল মেয়ের জনতা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে আরটিজিএস করে মঞ্জু নামে একটি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক হিসাবে ২৮ লাখ টাকা পাঠান। মঞ্জু চার লাখ টাকা রেখে বাকি ২৪ লাখ টাকা পরদিন মর্জিনা বেগমের ইসলামী ব্যাংক হিসাবে পাঠান। একই সময়ে ইদ্রিসের স্ত্রী আসামিদের দেওয়া একটি বিকাশ নম্বরে আরও ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাঠান।

এভাবে ব্যাংক ও বিকাশের মাধ্যমে ইদ্রিস আলীর পরিবার মোট ৫০ লাখ ৫০ হাজার টাকা পাঠায়।

পিবিআই জানায়, প্রায় এক মাস ১৪ দিন আটকে রাখার পর ৮ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার দিকে ইদ্রিস আলীর চোখ বেঁধে গাড়িতে করে ত্রিপোলির মদিনা এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাস্তার পাশে তাকে ফেলে রেখে চলে যায় অপহরণকারীরা। পরে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় ২২ জুলাই বাংলাদেশে ফেরেন ইদ্রিস আলী।

এ ঘটনায় ইদ্রিস আলী বাদী হয়ে সোনারগাঁ থানায় মামলা করেন। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সোনারগাঁ থানার মামলা নম্বর ৪১-এ পেনাল কোডের বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু হয়।

মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় ১৬ সেপ্টেম্বর পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলা স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে। মামলাটি তদন্ত করছেন এসআই মফিজুল ইসলাম।

তদন্তের অংশ হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সাইনবোর্ড এলাকা থেকে এজাহারভুক্ত আসামি উত্তম সরকার ওরফে সুমন এবং মর্জিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর তাদের আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হলে আদালত তিন দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে ২৩ সেপ্টেম্বর তাদের আদালতে পাঠানো হয়। ওই দিন মর্জিনা বেগম ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।

পিবিআইয়ের তদন্তে প্রাথমিকভাবে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, চক্রটি লিবিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের টার্গেট করত। পরে অস্ত্রের মুখে তাদের অপহরণ, শারীরিক নির্যাতন এবং ভিডিও কলে সেই নির্যাতনের দৃশ্য পরিবারকে দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক ও বিকাশ হিসাবের মাধ্যমে অর্থ আদায় করত।

চক্রটির অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত