মেসি যুগের সমাপ্তি, নতুন শুরুর পথে আর্জেন্টিনা

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩৪ পিএম

এক অনন্য মহাকাব্যের শেষ পাতায় দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনা। ২০২৬ বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ শেষে আলবিসেলেস্তেরা যখন প্রথমবার পুনর্মিলনীতে মিলিত হচ্ছে, তখন প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে জড়িয়ে রয়েছে এক গভীর বাস্তবতা। সবকিছুর মূলেই মহাতারকা লিওনেল মেসিকে ছাড়া নতুন শুরুর অগ্নিপরীক্ষা। দলে মেসি নামটা থাকাই যখন ছিল আলবিসেলেস্তেদের সবচেয়ে বড় শক্তি, এখন সেটিকে ছাড়াই ভাবতে হবে নতুন কোনো জোগানের।

কোচ লিওনেল স্কালোনির সামনেও এখন ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ, একদিকে মেসির বিদায়, অন্যদিকে পছন্দের অধিনায়ককে ছাড়াই দলের নতুন সমীকরণ মেলানো।

আর্জেন্টিনার জন্য আসন্ন ফিফা আন্তর্জাতিক বিরতির সূচিটি সাজানো হয়েছে মূলত দুটি ভিন্ন ধাপে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার কর্দোবায় বলিভিয়ার বিপক্ষে এবং ৩ অক্টোবর বুয়েনস আইরেসে বুর্কিনা ফাসোর বিপক্ষে মাঠে নামবে আর্জেন্টিনা, যে ম্যাচগুলোতে অধিনায়ক মেসিকে ছাড়াই নিজেদের ভবিষ্যৎ পথচলা খুঁজে নিতে শুরু করবে দলটি। এই প্রাথমিক পরীক্ষাগুলোর মূল উদ্দেশ্যই হলো মেসিহীন যুগে দল কীভাবে মানিয়ে নেবে, তা ঝালাই করে নেওয়া।

অন্যদিকে, আগামী ৬ অক্টোবর ঐতিহাসিক মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি হতে যাচ্ছে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের আনুষ্ঠানিক বিদায়ী মঞ্চ। সেই ম্যাচের জন্য এএফএ বিশেষভাবে ডেকে পাঠিয়েছে রদ্রিগো দি পল, জিওভানি লো সেলসো এবং পরবর্তীতে দলের সাথে যোগ দেওয়া নিকোলাস ওতামেন্দির মতো বিশ্বস্ত যোদ্ধাদের।

এই রূপান্তর পর্বের সমান্তরালে বড় এক প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে রয়েছে কোচ স্কালোনির ভবিষ্যৎ নিয়েও। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত তার চুক্তি বহাল থাকলেও, ফিফা উইন্ডোর ঠিক আগে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দরজা খোলা রেখেছেন। এই ম্যাচগুলোর মাধ্যমেই হয়ত তার বর্ণাঢ্য ও রেকর্ড গড়া কোচিং ক্যারিয়ারের তৃতীয় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। একই সাথে বর্তমান দৃশ্যপটে ফুটে উঠেছে এক অনন্য প্রজন্ম বদলের লড়াই। কিংবদন্তির ছেড়ে যাওয়া বিশাল শূন্যতা পূরণ করতে কোন তরুণরা মানসিকভাবে প্রস্তুত, তা নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করে নেওয়ার সুকঠিন দায়িত্ব এখন সফল এই কোচের কাঁধে।

মেসিবিহীন প্রাঙ্গণ ও তারুণ্যের হাতছানি

মেসি-পরবর্তী যুগে দল কীভাবে নিজেদের গুছিয়ে নেবে, তার এক সুকঠিন পরীক্ষাগারে আলবিসেলেস্তেরা। দলের এই রূপান্তর প্রক্রিয়া ও নতুনদের সুযোগ দেওয়ার নীতি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে স্কালোনি বলেন, ‘এখন থেকে আমরা সুযোগের একটি জানালা খুলে দিচ্ছি, আমরা সেটিকে সুযোগ দিতে যাচ্ছি।’

ফিফা বিরতিতে নিজেদের প্রথম ম্যাচ সামনে রেখে সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনি, ছবি: সংগৃহীত

বয়সকে পাশ কাটিয়ে কেবল পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে দল গঠনের বিষয়টি স্পষ্ট করে স্কালোনি আরও যোগ করেন, ‘বয়স কোনো কিছুর সমার্থক নয়; তারা দলে থাকবে বা নতুনরা আসবে, যতক্ষণ না তারা তাদের ক্লাবে ভালো পারফর্ম করে এবং আমরা বিশ্বাস করি যে তাদের সেখানে থাকা উচিত।’

স্কালোনির নতুন সমীকরণ

এই পরিবর্তনের যাত্রায় বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে শৃঙ্খলাজনিত নিষেধাজ্ঞা। বিশ্বকাপ ফাইনাল-পরবর্তী অনভিপ্রেত ঘটনার জেরে ডিফেন্ডার নাহুয়েল মলিনা ৭ ম্যাচের জন্য এবং মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রে পারেদেস ১০ ম্যাচের দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে পারেদেসের জাতীয় দলে থাকা নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। 

নিজের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রে পারেদেস সরাসরি স্বীকার করেন, ‘জাতীয় দলের হয়ে চালিয়ে যাওয়া আমার জন্য বেশ কঠিন হতে চলেছে। কারণ নিষেধাজ্ঞার কারণে এবং লিও’র সিদ্ধান্তের ফলে… সবকিছু আগের মতো চালিয়ে যাওয়া সত্যিই কঠিন হবে।’

এদিকে স্কালোনির চুক্তি আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকলেও ড্রেসিংরুমের সংস্কৃতি ধরে রাখতে তিনি সচেষ্ট। খেলোয়াড়দের মাঠের বাইরের সম্পর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা ব্যাখ্যা করে কোচ আলবিসেলস্তেদের কোচ বলেন, ‘প্রশিক্ষণের বাইরের যেকোনো সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সকালের নাশতা, আড্ডা কিংবা বারবিকিউর আসর খেলোয়াড়দের ভিন্নভাবে একে অপরকে চিনতে সাহায্য করে। আপনার পাশের মানুষটির সুবাদে আপনি কেবল নিজের চেয়েও বড় কিছু হয়ে ওঠেন, আর তা কেবল একে অপরকে গভীরভাবে জানার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।’ 

মেসিকে সতীর্থদের অশ্রুসিক্ত বিদায় ও স্মৃতির রোমন্থন

মেসির এই প্রস্থান সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে তাঁর ছায়াসঙ্গী ও সতীর্থদের। মিডফিল্ডার রদ্রিগো দি পল, যিনি কেবল ওই বিশেষ বিদায়ী ম্যাচের জন্যই দলে ফিরছেন, সতীর্থ ও বন্ধুকে বিদায় জানানোর বেদনা নিয়ে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। 

মনুমেন্তালের সেই বিশেষ রাত নিয়ে মিডফিল্ডার দি পল বলেন, ‘আমি এ নিয়ে খুব বেশি ভাবিনি। আমি ওই দিনটি নিয়ে খুব বেশি ভাবতে চাই না কারণ আমার মনে হয় দিনটি অত্যন্ত আবেগঘন হতে চলেছে। আমরা এমন একজন খেলোয়াড়কে বিদায় জানাতে যাচ্ছি যিনি আমাদের চিরতরে চিহ্নিত করে গেছেন, যিনি আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, আমাদের আশা জুগিয়েছেন।’ 

একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে ইন্টার মিলান স্ট্রাইকার লাউতারো মার্তিনেজের কণ্ঠেও। মেসির সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমার তার সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল এবং তিনি আমাদের যেভাবে জয়ী হতে শিখিয়েছেন ও পথ দেখিয়েছেন, তার জন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে কয়েকটি কথা বলেছিলাম। আপনার নেতৃত্ব কেবল গোল, অ্যাসিস্ট বা ট্রফির জন্য ছিল না, বরং এতদিন ধরে আমাদের জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করার সময় আপনি আমাদের যে উদাহরণ স্থাপন করে গেছেন, তার জন্য।’ 

বলিভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে অনুশীলনে আলভারেজরা, ছবি: সংগৃহীত

অনিশ্চয়তার মেঘ কাটিয়ে এক নতুন আলবিসেলেস্তের অপেক্ষা

মেসির বিদায়ের মধ্য দিয়েই যেন আলবিসেলেস্তেরেদের ড্রেসিংরুমে তৈরি হয়েছে এক বিরাট শূন্যতা। হুলিয়ান আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার কিংবা ক্রিস্টিয়ান রোমেরোদের মতো তরুণ ও অভিজ্ঞদের কাঁধে এখন বর্তেছে দলের মূল নেতৃত্বভার।

১০ নম্বর জার্সি কার গায়ে উঠবে কিংবা নতুন স্থায়ী অধিনায়ক কে হবেন, সেসব প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের জন্য জমা রয়েছে। সব ছাপিয়ে আপাতত মনুমেন্তালের শেষ আলোয় কিংবদন্তিকে বিদায় জানিয়ে আর্জেন্টিনা ফুটবল দল আনুষ্ঠানিকভাবে পা রাখছে এক সম্পূর্ণ নতুন ও অজানা ভবিষ্যতের দিকে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত