বিশেষ সাক্ষাৎকার: ‘পর্যটন হতে পারে অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি’

‘একজন পর্যটক কোনো গন্তব্যকে সরকারি না বেসরকারি—এভাবে বিবেচনা করেন না। তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিরাপত্তা, সুবিধা, সেবার মান এবং সামগ্রিক অভিজ্ঞতা। বেসরকারি খাতের সেবার মান ভালো হওয়া আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়। আমরা চাই সরকারি ও বেসরকারি—দুই খাত মিলেই কাজ করুক।’ 

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৭ পিএম

সরকার জিডিপিতে পর্যটন শিল্পের অবদান বিদ্যমান ২-৩ শতাংশ থেকে উন্নীত করে ৬-৭ শতাংশে নিতে চায়। এর মাধ্যমে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সরকার দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসুচি ছাড়াও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সহায়ক নীতিমালা তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও সংস্থার আন্ত:সমন্বয় বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আজ ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে সপ্তাহব্যাপী নানা কর্মসুচিও হাতে নেয়া হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড-এ প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা (সিইও) পদে ডেপুটেশনে নিয়োগ পেয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য (পলিসি) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী। পর্যটন শিল্প নিয়ে সরকারের ভিশন বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়ে কাজ শুরু করেছেন সরকারের এই চৌকস কর্মকর্তা। দেশ রূপান্তরকে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি জানিয়েছেন তার প্রচেষ্টার কথা। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিশেষ প্রতিবেদক এম মনিরুল আলম।

 

প্রশ্ন: আপনি দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি কেমন দেখেছেন? নতুন সরকারের নতুন ভিশন ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আপনাদের কী কী উদ্যোগ এসেছে?

উত্তর: আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার কাছে মনে হয়েছে, সরকার পর্যটন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সেই বিবেচনাটি মাথায় রেখেই আমরা কাজ করছি। এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবসের কর্মসূচি আমরা প্রায় এক সপ্তাহব্যাপী আয়োজন করেছি। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে—বাংলাদেশ পর্যটন খাতকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে এবং কীভাবে আমরা বাংলাদেশকে যথাযথভাবে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করতে পারি, সেটি তুলে ধরা। আমাদের অংশীজন বা স্টেকহোল্ডাররা বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করছেন। তাদের সঙ্গে নিয়েই, তাদের পরামর্শ ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা পর্যটনের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিচ্ছি। আমি মনে করি, পর্যটন হতে পারে অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের গল্প হয়তো আপনার-আমার কল্পনার চেয়েও আকর্ষণীয়। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামই হতে পারে পর্যটন গন্তব্য।

প্রশ্ন: বিদেশি পর্যটকদের ক্ষেত্রে একজন পর্যটক কেন মালদ্বীপ, ভুটান, থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়া বাদ দিয়ে বাংলাদেশে আসবেন? বাংলাদেশের বিশেষ আকর্ষণ কী?

উত্তর: বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন একজন বিদেশি পর্যটক নেপাল বা মালদ্বীপে না গিয়ে বাংলাদেশে আসবেন—এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের খুঁজতে হবে। রিসোর্সের দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক বেশি সমৃদ্ধ। নেপালে পাহাড় রয়েছে, কিন্তু আমাদের রয়েছে নদী, সমুদ্র এবং বিশাল জলভূমি। আমাদের সমুদ্রসৈকত রয়েছে, রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সমাদৃত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় সারা দেশে অসংখ্য নদী, খাল ও জলাধার রয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়-পর্বতও রয়েছে।

ঐতিহ্যের দিক থেকেও বাংলাদেশের রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা। আমাদের আধ্যাত্মিক পর্যটনের সম্ভাবনাও রয়েছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির মানুষের বসবাস এখানে। বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তারও দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এই সম্পদগুলোকে যদি আমরা সঠিকভাবে উপস্থাপন ও বিদেশে প্রচার করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশকে একটি নতুন গন্তব্য হিসেবে বিশ্বের পর্যটকদের কাছে তুলে ধরা সম্ভব। তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অবকাঠামোগত কিছু সমস্যা রয়েছে, নিরাপত্তার বিষয় রয়েছে। আমাদের পর্যটন সম্পদগুলোকে কীভাবে পরিকল্পিতভাবে উপস্থাপন করা যায়, সে বিষয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। এখন একজন পর্যটক শুধু একটি জায়গা দেখতে চান না। তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা নিতে চান। সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে স্থানীয় সংস্কৃতি, খাবার, পণ্য, মানুষের জীবনযাপন—সবকিছুই থাকে। এসবকে একসঙ্গে করে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।

প্রশ্ন: পর্যটনের সঙ্গে সংস্কৃতির একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সংস্কৃতির উন্নয়ন ছাড়া পর্যটনের অবদান বাড়ানো কতটা সম্ভব?

উত্তর: সংস্কৃতি পর্যটনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, তবে একমাত্র উপাদান নয়। পর্যটনের অনেকগুলো কম্পোনেন্ট রয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে কাজ করছে। এবারের আমাদের উপস্থাপনায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও শিল্পকলা একাডেমির অংশগ্রহণও রয়েছে। আমরা সবাইকে নিয়ে একটি সমন্বিত সরকার হিসেবে কাজ করতে চাই। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে যতটা উন্নত ও যথাযথভাবে উপস্থাপন করা যাবে, পর্যটন তত বেশি সমৃদ্ধ হবে।

প্রশ্ন: অভ্যন্তরীণ পর্যটনের ক্ষেত্রে সরকারি মোটেল ও স্থাপনার তুলনায় অনেক বেসরকারি রিসোর্ট ও হোটেলের সেবার মান ভালো। এ বিষয়ে আপনাদের ভাবনা কী?

উত্তর: একজন পর্যটক কোনো গন্তব্যকে সরকারি না বেসরকারি—এভাবে বিবেচনা করেন না। তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিরাপত্তা, সুবিধা, সেবার মান এবং সামগ্রিক অভিজ্ঞতা। বেসরকারি খাতের সেবার মান ভালো হওয়া আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়। আমরা চাই সরকারি ও বেসরকারি—দুই খাত মিলেই কাজ করুক। আমাদের পর্যটন গন্তব্যগুলোকে কীভাবে আরও আকর্ষণীয় করা যায়, কীভাবে নিরাপত্তা, সুবিধা ও অন্যান্য সেবা নিশ্চিত করা যায়—সেদিকে আমাদের নজর রয়েছে। বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমেই এটি টেকসই করা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

প্রশ্ন: পর্যটন মহাপরিকল্পনা এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে? পুরোনো মহাপরিকল্পনার সংশোধিত সংস্করণে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে?

উত্তর: আমরা বর্তমানে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছি। আশা করছি, অক্টোবর মাসের মধ্যে আমাদের পর্যালোচনার কাজ শেষ হবে। এরপর বিভিন্ন পর্যায়ের অনুমোদনের প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রথমে পর্যটন বোর্ডের অনুমোদন, এরপর মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটি এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় পর্যটন কাউন্সিলের অনুমোদনের বিষয় রয়েছে। আমাদের চিন্তা হচ্ছে, ২২ নভেম্বরের মধ্যে মন্ত্রণালয় পর্যায়ের প্রক্রিয়াগুলো শেষ করা। মহাপরিকল্পনায় মূল পরিবর্তন হচ্ছে অগ্রাধিকারের জায়গায়। আমাদের যে ক্লাস্টারগুলো রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কোনগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, কোনগুলোতে দ্রুত কাজ করা সম্ভব এবং কোথায় সরকারের তুলনামূলক কম সম্পৃক্ততায় উন্নয়ন করা সম্ভব—এসব বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে। অনেক জায়গায় ইতোমধ্যে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের কারণে বিভিন্ন সুবিধা তৈরি হয়েছে। সেসব জায়গাকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে সামনে আনতে চাই, যাতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যভুক্ত পর্যটকদের কাছে সেগুলো সহজে তুলে ধরা যায়।

প্রশ্ন: পর্যটন নীতিমালায় কোন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?

উত্তর: একটি জাতীয় পর্যটন নীতিমালা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জাতীয় নীতিমালা থাকলে এর ভিত্তিতে অন্যান্য আইন, বিধি ও নীতিমালা প্রণয়ন করা সহজ হয়। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে পর্যটনকে সরকারের অগ্রাধিকার খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং এই নীতিমালার মাধ্যমে অন্যান্য উন্নয়ন কর্মসূচিকেও পর্যটনের সঙ্গে সমন্বিত করা।

প্রশ্ন: বর্তমানে পর্যটন খাত জিডিপিতে প্রায় ৩ শতাংশ অবদান রাখে বলে বলা হয়। সরকার ৬-৭ শতাংশে নেওয়ার কথা বলছে। এটি কতদিনে সম্ভব?

উত্তর: আমাদের পরিকল্পনায় স্বল্পমেয়াদি তিন বছরের পরিকল্পনা, মধ্যমেয়াদে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ১০ বছরের পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের ধারণা হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রতিটি জায়গা এমনকি প্রতিটি গ্রামও একটি পর্যটন গন্তব্য হতে পারে। আমাদের দেশে পর্যটন সম্পদের ব্যাপক বৈচিত্র্য রয়েছে। একজন পর্যটক কোনো জায়গায় গেলে শুধু জায়গাটি দেখবেন না। তিনি স্থানীয় পণ্য কিনবেন, স্থানীয় খাবার গ্রহণ করবেন, স্থানীয় জীবনযাপন দেখবেন। ফলে পর্যটনের সঙ্গে স্থানীয় অর্থনীতি যুক্ত হবে। স্থানীয় মানুষ খাদ্য খাতে যুক্ত হবেন, গাইড হিসেবে কাজ করবেন, কুটির শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হবেন। স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। আমাদের গাইডদের প্রশিক্ষণের বিষয়েও কাজ করা হচ্ছে। তরুণদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে তৈরি করা গেলে তারা কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বিনিয়োগেও আসতে পারবেন।

ধরুন, কোনো একটি এলাকায় একটি নদী রয়েছে। সেখানে একজন উদ্যোক্তা একটি নৌকা তৈরি করে পর্যটকদের জন্য সেবা চালু করলেন। এটিও একটি ছোট বিনিয়োগ, যা কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির অংশ হতে পারে। এভাবে সারা দেশে পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে পর্যটন বড় অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। আমি দেশের মানুষ ও বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের বলব—বাংলাদেশে আসুন এবং বাংলাদেশকে আবিষ্কার করুন। বাংলাদেশের গল্প হয়তো আপনার কল্পনার চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে।

প্রশ্ন: পর্যটন স্পট বাছাইয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কোনো বিবেচনা থাকবে কি?

উত্তর: রাজনৈতিক বিষয় এখানে কোনো গুরুত্ব পাওয়ার কারণ নেই। মূল বিষয় হচ্ছে—কোন গন্তব্য পর্যটনের জন্য বেশি সম্ভাবনাময়, কোনটি সহজে বাজারজাত করা সম্ভব এবং কোনটির পর্যটন সম্পদ বেশি—সেটি দেখা। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিবেচনায় কোনো স্থানকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও পর্যালোচনা করা হবে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে বাস্তব সম্ভাবনার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা।

প্রশ্ন: মহাপরিকল্পনা কবে নাগাদ চূড়ান্ত ও প্রকাশ করা হতে পারে?

উত্তর: আমরা ডিসেম্বরের মধ্যেই এটি শেষ করতে চাই। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুত পরিকল্পনা শেষ করে বাস্তবায়নের দিকে যাওয়া। বাংলাদেশ সরকারের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর যে মহাপরিকল্পনা রয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যটন খাতকে জিডিপির একটি বড় অবদানকারী খাতে পরিণত করতে চাই।

প্রশ্ন: বিদেশি বিনিয়োগ এবং বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের বিষয়টি কীভাবে মহাপরিকল্পনায় যুক্ত করা হচ্ছে?

উত্তর: এ মুহূর্তে নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন কত পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। তবে লক্ষ্য হচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য পর্যটন খাতকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা। এটি শুধু পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একার কাজ নয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা বৈঠক করছি। একটি সমন্বিত বা হলিস্টিক পদ্ধতিতে কাজ করতে চাই, যাতে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয় যেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিজেরাই বাংলাদেশে পর্যটন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হন। আমাদের মূল ভিশন হচ্ছে—দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশকে একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তৈরি করা।

প্রশ্ন: গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে সমস্যা রয়েছে। এ বিষয়ে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে?

উত্তর: আমরা ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছি। পর্যটন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে সমন্বিতভাবে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছি। মহাপরিকল্পনার গুরুত্ব এখানেই। এতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় পর্যটন কাউন্সিলে যখন বিষয়গুলো চূড়ান্ত হবে, তখন এসব বাধা সমাধানের জন্য একটি সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

প্রশ্ন: বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় বাধা সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মতো বিষয়গুলো পর্যটনকে কীভাবে প্রভাবিত করছে?

উত্তর: বিষয়গুলো অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কিছু সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতার বিষয় রয়েছে। সেগুলো মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করতে হবে। বিভিন্ন মুসলিম ও ইসলামিক দেশ কীভাবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে, সে অভিজ্ঞতাও আমাদের সামনে রয়েছে। ঐতিহাসিক তথ্য, বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের এগোতে হবে।

আমরা ট্যুরিস্ট পুলিশ ও ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে সরাসরি কাজ করছি। দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও শুরু করেছি। একজন বিদেশি পর্যটক যখন দেশে প্রবেশ করেন, তখন ইমিগ্রেশন পুলিশের আচরণ তার কাছে বাংলাদেশের প্রথম অভিজ্ঞতার অংশ। আবার দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় তিনি ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যক্রম দেখেন। তাই তাদের আচরণ ও সেবার ওপর বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অনেকাংশে নির্ভর করে। এ বিষয়টিতে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। সংশ্লিষ্টরাও নিজেদের পরিবর্তনের বিষয়ে আগ্রহী।

তবে জনবলের সংকট রয়েছে। শুধু পুলিশের নয়, পর্যটন বোর্ডেও জনবলের বড় ঘাটতি রয়েছে। সঠিকভাবে সমন্বয় করার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল আমাদের নেই। এ বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। আমাদের কাঠামোগত পরিবর্তনের কাজ চলছে। পরবর্তী সময়ে আরও বড় পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে পর্যটকদের সুবিধা নিশ্চিত করতে পর্যটন বোর্ড যথাযথভাবে কাজ করতে পারে।

প্রশ্ন: সরকারের অলাভজনক বা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে না পারা পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলো বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগের বর্তমান অবস্থা কী?

উত্তর: পর্যটন বোর্ডের কর্মপরিধির মধ্যে ফ্যাসিলিটেশন ও প্রমোশন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে কীভাবে বেসরকারি খাতকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা যায় এবং একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নেওয়া যায়। সরকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তবে এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত সচেতনভাবে কাজ করতে হবে।

প্রশ্ন: বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য কী ধরনের সুযোগ বা নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে?

উত্তর: কীভাবে বেসরকারি উদ্যোক্তারা সরকারের উদ্যোগের অংশ হতে পারবেন এবং সরকার কীভাবে তাদের উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হবে—এসব বিষয় নীতিমালা ও বিধিমালায় থাকবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি কীভাবে করা যায়, সেটি নীতিমালা ও বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।

প্রশ্ন: বেসরকারি খাত থেকে এখন পর্যন্ত কী ধরনের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে?

উত্তর: বেসরকারি খাতের অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন। সরকারের অগ্রাধিকার দেওয়া বিষয়গুলোতে তারা আগ্রহী। বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশে আসার বিষয়ে কথা বলছেন।

অর্থাৎ একটি ইতিবাচক আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। আমরা আশা করছি, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে পর্যটন খাতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং পর্যটন শুধু পর্যটন খাত নয়, বরং অর্থনীতির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে দাঁড়ায়।

প্রশ্ন: আপনি বিদেশি পর্যটক ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। বিদেশি পর্যটকদের জন্য সরকার কি ওয়ান-স্টপ বা সমন্বিত কোনো পর্যটন প্যাকেজ চালু করা হবে?

উত্তর: বিদেশি পর্যটকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণ প্যাকেজ তৈরি করা মূলত বেসরকারি খাতের কাজ। দেশে বিভিন্ন ইনবাউন্ড ট্যুর অপারেটর রয়েছে। তারাই এ ধরনের প্যাকেজ তৈরি করবে। সরকারের কাজ হচ্ছে তাদের সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা। একজন বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে এসে যেন নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে বিভিন্ন পর্যটন গন্তব্য ঘুরতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

কক্সবাজার, সুন্দরবন, সুনামগঞ্জের হাওর, রাঙামাটির পাহাড় কিংবা অন্যান্য পর্যটন গন্তব্য—এসব নিয়ে বেসরকারি ট্যুর অপারেটররা পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ তৈরি করতে পারেন। সরকার তাদের নিরাপত্তা, যোগাযোগ, তথ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করবে।

এখন ডিজিটালাইজেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। একজন বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আসার আগেই ঘরে বসে জানতে পারেন কোথায় কী সুবিধা রয়েছে, কোথায় কী সমস্যা রয়েছে এবং কীভাবে তিনি ভ্রমণ করবেন। আমরা চাই, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এসব তথ্য সহজে পাওয়া যাক এবং একজন বিদেশি পর্যটকের জন্য বাংলাদেশকে আরও সুবিধাজনক ও আকর্ষণীয় করে তোলা যায়।

আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে—বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে উপস্থাপন করা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানো এবং একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরি করা। এর মাধ্যমে পর্যটন খাতকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে চাই।

প্রশ্ন: পর্যটন খাতের জন্য সাম্প্রতিক বাজেটে কী ধরনের কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে?

উত্তর: এবারের বাজেটে পর্যটন খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমি যখন এনবিআরের মেম্বার (পলিসি) ছিলাম, তখন এই বাজেট প্রণয়নের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। পর্যটন খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বাজেটের শুরু থেকেই ছিল এবং শেষ পর্যন্ত সেটি রাখা হয়েছে।

প্রশ্ন: কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য কী ধরনের কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে?

উত্তর: কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত করার ঘটনা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো হয়েছে। এর আগে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টসহ নির্দিষ্ট কিছু খাতের ক্রিয়েটররা এ ধরনের সুবিধা পেতেন। এবার বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে এর আওতায় আনা হয়েছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো পর্যটনের প্রসার ও প্রচার। বর্তমানে পর্যটনকে মানুষের কাছে তুলে ধরতে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি এ খাতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করাও এর একটি উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সরকার মনে করছে, পর্যটন খাতকে এগিয়ে নিতে নীতিগত কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন।

প্রশ্ন: পর্যটন খাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য কী ধরনের কর সুবিধা রাখা হয়েছে?

উত্তর: পর্যটন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ত্বরিত অবচয় সুবিধা (অ্যাক্সিলারেটেড ডেপ্রিসিয়েশন) দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে পর্যটন শিল্পে যারা বিনিয়োগ করবেন, তারা এই সুবিধা পাবেন।

প্রশ্ন: ত্বরিত অবচয় সুবিধাটি কীভাবে কাজ করবে?

উত্তর: সাধারণভাবে কোনো বিনিয়োগের অবচয় কয়েক বছর ধরে হিসাব করা হয়। কিন্তু ত্বরিত অবচয়ের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী তুলনামূলক দ্রুত সেই অবচয় দেখাতে পারবেন। অর্থাৎ তিন বছরের মধ্যে অবচয়ের বড় অংশ সমন্বয় করার সুযোগ থাকবে। ফলে পরবর্তী বছরগুলোর আয় থেকে ওই অবচয় সমন্বয় হয়ে যাবে এবং করের চাপ কমবে।

প্রশ্ন: এর ফলে বিনিয়োগকারীরা কত বছর পর্যন্ত কর সুবিধা পেতে পারেন?

উত্তর: বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অবচয়ের পরিমাণও বড় হয়। ফলে প্রথম কয়েক বছরে যে অবচয় দেখানো হবে, তা পরবর্তী বছরের আয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে। এর ফলে একজন বিনিয়োগকারী প্রায় পাঁচ থেকে সাত বছর পর্যন্ত কর সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। তবে এটি সরাসরি ‘পাঁচ থেকে সাত বছর করমুক্ত’ নয়; অবচয় সমন্বয়ের মাধ্যমে করযোগ্য আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি এখানে কাজ করে।

প্রশ্ন: অবচয়ের হার কীভাবে নির্ধারিত হয়?

উত্তর: সাধারণ অবচয়ের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ বা ১৫ শতাংশের মতো হার থাকতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পদের অবচয় নির্ধারণে নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। ত্বরিত অবচয়ের ফলে বিনিয়োগকারী তুলনামূলক কম সময়ে অবচয় সমন্বয়ের সুযোগ পান।

প্রশ্ন: এই কর সুবিধার মূল লক্ষ্য কী?

উত্তর: মূল লক্ষ্য হলো পর্যটন খাতে বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো এবং এ খাতের বিকাশ ত্বরান্বিত করা। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত