যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃতিবাদী, কবি ও দার্শনিক হেনরি ডেভিড থরো বলেছেন, ‘বনের ভেতর হাঁটা মানে নিজের ভেতরে ফিরে যাওয়া।’ আর ফরাসি অণুজীববিজ্ঞানী ও রসায়নবিদ লুই পাস্তুর বলেছেন, ‘বিজ্ঞান মানুষকে প্রকৃতি ও বনের কাছাকাছি নিয়ে যায়।’ বন এত গুরুত্ববহ সত্ত্বেও আমাদের দেশে বনের অবস্থা কতটা বিপন্ন-বিপর্যস্ত, এর নজির ফিরে ফিরে আসে সামনে। দেশের বনাঞ্চলে ক্ষমতাবান আর লোভাতুরদের আগ্রাসনের থাবা কতটা প্রকট হয়ে উঠেছে এরই ফের সাক্ষ্য মিলেছে ৩ অক্টোবর দেশ রূপান্তরে। ‘চুনতিতে শত একর বন উজাড়’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে, এর সারমর্ম হলো দেশের অন্যতম সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্যে চুনতির বৈশিষ্ট্য নিপতিত দখলদারদের লোভের ফাঁদে। আমরা জানি, এই বনাঞ্চল এশীয় হাতির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল ও চলাচলের করিডর হিসেবে পরিচিত। চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে অবস্থিত প্রায় ৭ হাজার ৭৬৪ হেক্টর আয়তনের এই অভয়ারণ্যের হারবাং বনবিটে সংরক্ষিত বনভূমি উজাড় করে একের পর এক গড়ে তোলা হচ্ছে ছনখোলা! দখলদারদের থাবায় ইতিমধ্যে শত একর বন উজাড় হয়ে গেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বন বিভাগের তথ্যের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, হারবাং অভয়ারণ্য এলাকায় সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনের পরিমাণ ২ হাজার ৬২১ দশমিক ৯৫ একর। এর মধ্যে সরকারি হিসাবে জবরদখলের পরিমাণ ২৫১ দশমিক ১১ একর। স্থানীয়দের দাবি, বাস্তবে দখলের পরিমাণ ৫০০ একরের বেশি। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে অন্তত ১৫টি এলাকায় প্রায় ১০০ একর বনভূমিতে ছনখোলা গড়ে ওঠার চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হারবাং স্টেশনের জোবাইর মাঝি দখলদারের কাছ থেকে একরপ্রতি বছরে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা ‘খাজনা’ হিসেবে নিয়ে বনভূমি ধ্বংসের সুযোগ করে দিচ্ছেন! উত্তর হারবাং মধ্য বৃন্দাবনখীল এলাকার অনেক বনভূমি মাহমুদুল হকের দখলে রয়েছে। পাশাপাশি বনের অন্য এলাকায়ও বড় একটি অংশ দখলের অভিযোগ রয়েছে দেখা যাচ্ছে, ওই বনভূমি ও অভয়ারণ্য ব্যক্তি ও মহল বিশেষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চুনতির বৃক্ষ উজাড় ও ভূমি দখলের চিত্র সংগতই প্রশ্ন দাঁড় করার, বন-সম্পদ ও ভূমি বেদখল হয়ে যাওয়ার দায় কি সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষেরই এড়ানোর অবকাশ আছে? বন বিভাগের পুরনো ব্যবস্থাপনা প্রতিবেদনেও দখল ও বৃক্ষনিধনের কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু তাদের তো প্রতিবেদন দাখিল করেই দায়িত্ব ফুরিয়ে যায় না, বরং তাদের দায় হলো বিনাশী কর্মকা- বন্ধ করা। একদিকে বনভূমি কমে যাওয়ায় হাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসার ঝুঁকিও বাড়ছে, অন্যদিকে প্রাণ-প্রকৃতিসহ এর অভিঘাত লাগছে, অন্যদিকে বনজ উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নেতিবাচক দিক আরও আছে। সমান্তরালে রয়েছে অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টিও। দখলদাররা কেউ কেউ তাদের অপকর্মের কথা স্বীকার করলেও দেশ রূপান্তরের কাছে দায়িত্বশীল কারও কারোর প্রতিক্রিয়া প্রশ্নবোধক, সমান্তরালে তাদের দায়িত্বহীনতার বিষয়টিও প্রতিবিধানের তাগিদ দেয়। চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জ কর্মকর্তার সঙ্গে দেশ রূপান্তরের তরফে বারবার যোগাযোগের চেষ্টার পরও তার সাড়া মেলেনি।
বন বিভাগের অনেক কর্মকর্তারই ব্যর্থতার খতিয়ান বলতে গেলে দেশজুড়ে কমবেশি দৃশ্যমান। চুনতি অভয়ারণ্যের নীরব আর্তনাদে দায়িত্বশীল কেউই কেন করছেন না কর্ণপাত, সবার আগে এর অনুসন্ধান ও প্রতিবিধান জরুরি। বন বিভাগের অসাধুদের যোগসাজশে বৃক্ষ ও বন উজাড়ের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও এসব অনাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার নয় কেন? এই ‘কেন’র পেছনে আরও অনেক প্রশ্ন সারিবদ্ধ হয়। এমনিতেই দেশে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল আশঙ্কাজনক হারে কমছে। বসবাসের নিশ্চিন্ত জায়গা হারিয়ে বনের প্রাণী বাধ্য হয়ে চলে আসছে লোকালয়ে। সেখানে তাদের অবাধ বিচরণের সুযোগ তো থাকেই না, বরং প্রতি মুহূর্তে তাড়া করে নৃশংসতার হুমকি। অন্যদিকে আমরা হারাচ্ছি জাতীয় সম্পদ। আমরা মনে করি, বন বিভাগের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বেদখলকৃত ভূমি উদ্ধার করে দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে নির্মোহ অবস্থানের বিকল্প নেই। বন বিভাগের দায়িত্বশীলদের নাকের ডগায় এভাবে ব্যক্তি বা মহল বিশেষের মুষ্টিবদ্ধ হতে পারে না জাতীয় সম্পদ। কোনোভাবেই ছাড় পেতে পারে না দখলদাররা।