কর আদায়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মুখ্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দেওয়া তথ্য, বছরে যত কর আদায় হয়, ছাড় দেওয়া হয় তারচেয়ে বেশি। অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে তাদের উপস্থাপিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বার্ষিক কর আদায়ের হার যেখানে জিডিপির ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ, সেখানে কর ছাড়ের হার হচ্ছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। স্বভাবতই তাতে কিছু প্রশ্ন জাগে। যেমন এক. এই বিপুল পরিমাণ করছাড় কেন দেওয়া হচ্ছে এবং তা কারা পাচ্ছে? দুই. এই কর ছাড়ের ফলে সৃষ্ট বাজেট ঘাটতি সরকার কীভাবে মেটাচ্ছে এবং সে ক্ষেত্রে বাড়তি কর কোথায় কার ওপর বসানো হচ্ছে? তিন. উল্লিখিত করছাড় সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য করণীয় কী এবং সেসব করার পথে বাধা কোথায়?
প্রথম প্রশ্নের সূত্রে বলি, বর্তমানে যেসব ক্ষেত্রে বা যাদের করছাড় দেওয়া হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে ক. উৎসাহ ও প্রণোদনা জোগানোর লক্ষ্যে পণ্য রপ্তানি, রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল আমদানি, সিএমএসএমই ও নারী উদ্যোক্তা, নতুন শিল্প স্থাপন, অনুন্নত এলাকায় শিল্প স্থাপন, শিল্পনীতির অগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত ক্ষেত্রগুলোয় বিনিয়োগ ইত্যাদি, খ. অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, সমিতি, সংগঠন ইত্যাদি, গ. পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ঘ. ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর চাপ ও সুপারিশ, ঙ. সিদ্ধান্ত প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রাজনীতিক ও নির্বাহীদের ব্যক্তিগত বিবেচনা ও সুপারিশ ইত্যাদি।
উল্লিখিত কর ও শুল্ক ছাড়ের সিদ্ধান্তগুলো এক সময় ছিল না। বিশেষ পরিস্থিতিতে এসব গৃহীত হয়েছে এবং যুক্তি অনুযায়ী সেসব পরিস্থিতি কেটে যাওয়ার পর ওই সব কর-শুল্ক ছাড়ের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহৃত হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সেগুলো আর কোনো দিনই পূর্বাবস্থায় ফিরে আসেনি, যেমনটি পণ্যমূল্য একবার বৃদ্ধি পাওয়ার পর জোগান বৃদ্ধি ও চাহিদা হ্রাসের পরও তা আর এ দেশে প্রায় কখনোই ফিরে আসে না। এ ক্ষেত্রে দুটি উদাহরণ সামনে আসে। বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে তৈরি পোশাকশিল্পে নগদ প্রণোদনা ও অন্যান্য কর-শুল্ক ছাড় যুক্ত করা হয়েছিল ১৯৮০-এর দশকে। প্রায় চার দশকের ব্যবধানে এ খাতের পূর্বের সেই নাজুক পরিস্থিতি প্রায় পুরোপুরি কেটে গেলেও সেই নগদ প্রণোদনা ও কর-শুল্ক ছাড় এখনো বহাল আছে। শুধু বহালই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নানা আঙ্গিকে তা আরও বাড়ছেও। একইভাবে, রমজান মাসে ও অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে যেসব কর-শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়, তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব কি বাজারে পড়ে কিংবা ওইসব কর-শুল্ক ছাড় কি অধিকাংশ ক্ষেত্রে আর কখনো প্রত্যাহার করা হয়?
এবার দ্বিতীয় প্রশ্নের প্রতিক্রিয়া। ‘অলাভজনক’ প্রতিষ্ঠানের নামে যেসব প্রতিষ্ঠানকে করছাড় দেওয়া হয়, বাস্তবে সেসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই আসলে অলাভজনক নয়, যেমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যদি কার্যতই অলাভজনক ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হয়, তাহলে অবশ্যই ছাত্রবেতন কমাতে হবে অথবা সরকারকে কর দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে চলতি অর্থবছরের আওতায় মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানি ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে কর অব্যাহতি দানের বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক। বলুন, কোন যুক্তিতে চলতি বাজেটে মোবাইল সিমের ওপর থেকে ৩০০ টাকা কর মওকুফ করা হলো, যার কোনো উপকার গ্রাহক পাবেন না? বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত ১১ বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের কর কেন কমানো হলো? এতে করে রোগীর ব্যয় কি এক পয়সাও কমবে? আর বলতেই হবে যে, ছাড়কৃত এসব কর-শুল্ক শেষ পর্যন্ত দরিদ্র জনগণের ওপর প্রত্যক্ষ কর বাড়িয়েই পূরণ করা হবে।
তৃতীয় প্রশ্নের প্রতিক্রিয়া হলো দেশে বিরাজমান করছাড় সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় ও এর বাস্তবায়ন-পথের বাধাগুলো কী কী, তার সবই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জানা আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও যে করছাড় সংক্রান্ত এ অপসংস্কৃতির অবসান ঘটছে না, তার কারণ এই রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। এসব কর-শুল্ক ছাড়ে যারা মূল সুবিধাভোগী, তারাই আবার জনপ্রতিনিধি হয়ে এসব ছাড় বিষয়ক সিদ্ধান্তের মালিক। আর সে কারণেই এ কথা বারবার ওঠে আসছে, জাতীয় সংসদ হয়ে উঠছে এ যেন ‘ব্যবসায়ীদের ক্লাব’। কিন্তু সংবিধানের সম্মতি ও মৌলিক মানবাধিকারের অংশ হিসেবে ব্যবসায়ীদের জনপ্রতিনিধি হতে কোনো বাধা নেই। তারপরও বিষয়টি উত্থাপিত হওয়ার কারণ, জনপ্রতিনিধি হয়েই তারা সর্বাগ্রে ওই জাতীয় কর-শুল্ক ছাড়ের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস অবশ্য জনপ্রতিনিধি না হয়েও ক্ষমতা গ্রহণ করেই সর্বাগ্রে নিজ প্রতিষ্ঠানের ৬৬৬ কোটি টাকা কর মাফ করে দিয়েছিলেন।
অতএব বোঝাই যাচ্ছে, কর আদায়ের চেয়ে আরও বেশি পরিমাণ কর কারা কার স্বার্থে মাফ করে দিচ্ছেন। দেশে কর-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত নিম্নতর (৬ দশমিক ৬ শতাংশ) বলে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক, সিদ্ধান্ত প্রণেতা, দাতা ও অর্থনীতিবিদরা যে নিরন্তর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, তা যথার্থ মনে করি। কিন্তু মূল উদ্বেগ এ নিম্নহারের জন্য পোষণ না করে তা করা উচিত সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক ও আমলাদের স্ববিরোধী ও অস্বচ্ছ আচরণের বিষয়ে। এ আচরণের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা গেলে কোনো সংস্কার ছাড়াই এবং নতুনভাবে কর আরোপ না করেই কর আদায়ের পরিমাণ অন্তত দ্বিগুণ করা সম্ভব। কিন্তু সেটি না করে অনেকেই ছুটছেন তথাকথিত সংস্কারের পেছনে। রাজনীতিক ও আমলাদের মনোজগৎ ও আচরণে পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত যা কখনোই সফল হওয়ার নয়। কর ছাড়ের অপসংস্কৃতির নিষ্কৃতি প্রয়োজন দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থ ও প্রয়োজনে।
লেখক : সাবেক পরিচালক, বিসিক