ডা. আসাফুজ্জোহা রাজ
রাজ ডেন্টাল ক্লিনিক, কলাবাগান, ঢাকা
ডায়াবেটিস এমন এক রোগ যা নিয়ন্ত্রণে না রাখলে শরীরের প্রায় সব অঙ্গের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এ রোগ শনাক্ত হলে প্রথমে যতটা সতর্কতা দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে কেন যেন উদাসীনতা বা অবহেলা বাড়ে।
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থেকে মুখের রোগ তৈরির যোগসূত্র আছে। সেখানে শুধু দাঁত নয়, মাড়ি, জিহ্বা, তালু, চোয়ালের ভেতরের অংশ, ঠোঁট, লালা ও লালা গ্রন্থি, চোয়ালের হাড় সবই অন্তর্ভুক্ত।
ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রিত না থাকলে মুখের মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো ঘটে।
লালা নিঃসরণ কমে গিয়ে মুখ শুষ্ক হয় ফলে লালার স্বাভাবিক কাজ যেমন মুখ ও দাঁতকে ধৌত করা, জীবাণুর বৃদ্ধি রোধ করা, খাবার খেতে ও স্বাদ গ্রহণে সাহায্য করা, মুখে ঘর্ষণজনিত ক্ষুদ্র আলসার প্রতিরোধ করা প্রভৃতি ব্যাহত হয়। ফলে মাড়ি রোগ, দাঁতে গর্ত বা ক্যারিজ, মুখে জ্বালাপোড়া, খাদ্য গ্রহণে সমস্যা, মুখে দুর্গন্ধসহ নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে।
রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়ায় ও রক্তে শ্বেতকণিকার কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়ার ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে যাওয়া ও সহজে প্রতিহত না হওয়ার প্রবণতা থাকে। ফলে ডায়াবেটিক রোগীদের মুখে ছত্রাক সংক্রমণসহ নানা ধরনের সংক্রমণ অনেক বেশি দেখা যায় আর সহজে এমনকি ওষুধেও ভালো হয় না।
ডায়েবেটিস নিউরোপ্যাথি থেকে মুখের মধ্যে অনেক সময় জ্বালাপোড়া হতে পারে।
মুখের নিঃসৃত তরলের সঙ্গে সুগার থাকাতে দাঁতে ক্যারিজ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
মাড়ি রোগের সঙ্গে ডায়াবেটিসের নিবিড় সম্পর্ক। ডেন্টাল চেকআপে অনেক রোগীর প্রথম ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়। মাড়ির সংক্রমণ থেকে মাড়ি ফুলে যায়, রক্ত পড়ে, দাঁত নড়ে যায়Ñ এমনকি পড়েও যেতে পারে। গবেষণা বলে প্রতি পাঁচটির মধ্যে একটি দাঁত হারানোর কারণ ডায়াবেটিস।
দীর্ঘমেয়াদি মাড়ি রোগ ইনসুলিনের কার্যকারিতা হ্রাস করে রক্তে সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, পক্ষান্তরে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস মাড়ি রোগকে ত্বরান্বিত করে। মাড়ি রোগ থেকে সংক্রামক রক্তবাহিকায় মিশে শরীরের যে কোনো অংশে চলে যেতে পারে। হার্টের রোগ তৈরির একটি কারণ দীর্ঘমেয়াদি মাড়ি রোগ। স্ট্রোক, অগ্ন্যাশয়, অপরিণত শিশু জন্ম, কিডনি, হাড় ক্ষয়সহ ফুসফুসের কিছু রোগের সঙ্গে মাড়ি রোগের সম্পর্কের প্রমাণ তুলে ধরছেন গবেষকরা।
আমাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে নানা রোগের মধ্যে ডায়াবেটিস উল্লেখযোগ্য রোগ। দেশের একটি বড় অংশের ডায়াবেটিস রোগী জানেন না তার ডায়াবেটিস আছে। ডেন্টাল ক্লিনিক থেকে ডায়াবেটিস শনাক্তের রোগীর সংখ্যা নিছক কম নয়। যাদের পরিবারের ইতিহাস আছে, হঠাৎ ওজন কমে বেশি ক্ষুধা লাগে, প্রস্রাবের মাত্রা বেড়ে যায়, ক্লান্ত অবসাদ লাগে, বিভিন্ন ক্ষত বা ঘা দেখা যায় তাদের অবশ্যই ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা উচিত। রোগ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকলে প্রায় আশি ভাগ ডায়াবেটিস টু-কে প্রতিহত করা সম্ভব। শুধু প্রয়োজন সচেতনতা, সঠিক স্বাস্থ্যজ্ঞান ও তার অনুশীলন।
মুখের যতেœ নিয়মিত ও সঠিক নিয়মে মুখ পরিষ্কার, স্বাস্থ্যবান্ধব খাদ্য গ্রহণ আর ছয় মাস পর পর অনুমোদিত ডেন্টাল চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে জোরালো তাগিদ দেয়।
কিছু রোগীর ভ্রান্ত ধারণা ডায়াবেটিসের কারণে ডেন্টাল চিকিৎসা নেওয়া যাবে না, ফলে রোগকে পুষে রেখে মুখ ও সার্বিক শারীরিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে চরম হুমকির দিকে নিয়ে যায়। ডেন্টাল চিকিৎসক রক্তে সুগারের মাত্রা নির্ণয়ের মাধ্যমে চিকিৎসা প্রদান করবে, অনিয়ন্ত্রিত সুগার থাকলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শে সহনীয় সুগারের মাত্রায় ডেন্টালের সব ধরনের চিকিৎসা নিরাপদ। তবে চিকিৎসা নেওয়ার আগে মনগড়া নিয়মে ইনসুলিনের মাত্রা বা ওষুধ বাড়িয়ে অথবা দীর্ঘ সময় অভুক্ত থেকে সুগার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে আসলে অনেক সময় হাইপোগ্লাইসেমিয়ার মতো জটিলতার আশঙ্কা থাকে।