কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে সিডিএ’র

‘ওয়ান সিটি টু টাউন’

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৬ এএম

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) একটি আধুনিক শিল্প ও আবাসিক হাব বা মেগাসিটি গড়ে তুলতে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। কর্ণফুলী টানেলকে কেন্দ্র করে নদীর দক্ষিণ পাড়ে আনোয়ারায় ৭ হাজার ৩১৫ একর জমির ওপর এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। সিডিএ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে রূপরেখাও দিয়েছে। তবে এটি বাস্তবায়িত হলে হারিয়ে যাবে ১ হাজার ৭৮২ একর কৃষিজমি।

কৃষিশুমারির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের আনোয়ারার ২৩ হাজার ৯৬৭টি কৃষি পরিবারের মধ্যে ৯৯ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষক। সংখ্যায় যারা ২৩ হাজার ৭৭৬ জন। মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে এই বিপুল ক্ষুদ্র চাষি তাদের একমাত্র জীবিকা হারাবেন। বর্তমানে এই উপজেলায় ২৪ হাজার ৮৩৩ জন মানুষ সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। জমি হারানোর ফলে এই বিশাল শ্রমশক্তি পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।

আনোয়ারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামীম আহমদ সরকার বলেন, ‘উপজেলার অধিকাংশ কৃষিজমি তিন ফসলি। ধানের পাশাপাশি এখানে সবজিরও ব্যাপক আবাদ হয়। এমনিতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে লোকজন কৃষিজমি কিনে আবাসিক এলাকা গড়ে তুলছেন। এতে কৃষিজমি কমছে। নতুন শহর বাস্তবায়ন করা হলে কৃষিজমি আরও কমে আসবে।’

এদিকে কৃষিজমি হ্রাস ও পরিবেশগত ঝুঁঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে সিডিএ’র উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী বলেন,‘কর্ণফুলী ও আনোয়ারা উপজেলায় অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন হচ্ছে। যার কারণে কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। এজন্য মাস্টার প্ল্যানে ২ হাজার ৩৮৮ একর কৃষিজমি সংরক্ষণ করা হয়েছে। এতে করে যত্রতত্র গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকা ও কলকারখানা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’

সিডিএ’র দেওয়া ‘আনোয়ারা অ্যাকশন এরিয়াপ্ল্যান (২০২৫-৫০)’-এর খসড়া পর্যালোচনায় দেখা যায়, কৃষিজমির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত আসতে যাচ্ছে উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নে। সেখানে বিদ্যমান ৪৯৪ একর কৃষিজমির ৯৮ শতাংশই শিল্প ও সাধারণ নগর ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে সেখানে আবাদি জমি অবশিষ্ট থাকবে মাত্র ৯ একর। এ ছাড়া শিল্পায়ন ও নগরায়ণের চাপে চাতরী ইউনিয়নে ৫৪৬ একর এবং বারখাইন ইউনিয়নে ৩৪৮ একর কৃষিজমি কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এখানকার মোট জমির ৫৭ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে কৃষি ও মৎস্য খাতে। এর পাশাপাশি আবাসিক কাজে ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ২৭ এবং শিল্প খাতে আড়াই শতাংশ।

সূত্র জানায়,২০৫০ সাল নাগাদ আনোয়ারায় জনসংখ্যা ৭ লাখ ২৪ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস করা হয়েছে। বর্তমানে এখানে কোরিয়ান ইপিজেড,কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো), চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লি. (সিইউএফএল) ও ডাই অ্যামোনিয়া ফসফেট (ডিএপি) ফার্টিলাইজার কোম্পানি লি. কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নতুন পরিকল্পনায় ৭৭৪ দশমিক ৪ একর জমি নিয়ে চায়নিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড) এবং শিল্প খাতে ৫৫০ একর জমি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই শিল্প জোনে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হয়েছে। নগরায়ণের এই বিপুল চাপ সামলাতে আনোয়ারায় ৪৭ দশমিক ৮ কিলোমিটার নতুন ও উন্নত সড়কের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আনোয়ারা-পটিয়া সড়ককে ১৬০ ফুট প্রশস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ১ হাজার যানবাহন ধারণক্ষমতার একটি ট্রাক টার্মিনাল, একটি আধুনিক বাস টার্মিনাল, সাতটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চারটি উচ্চবিদ্যালয় এবং ৯টি ক্লিনিক স্থাপনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এদিকে আনোয়ারা এলাকাটি ঘূর্ণিঝড় এবং মৌসুমি বন্যার উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে।

শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে প্রাকৃতিক জলাধার ও খোলা জায়গা কমে যাবে, যার ফলে এলাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করবে। জলাবদ্ধতা রোধে ১১৪ দশমিক ২৩ কিলোমিটার নতুন সেকেন্ডারি ড্রেন এবং ২ দশমিক ৬২ কিলোমিটার নতুন খালের অ্যালাইনমেন্ট প্রস্তাব করা হয়েছে। জোয়ারের পানি ঠেকাতে পারকি খাল, সাপমারা খাল, মোহছেন আউলিয়া খাল, ইছাখালী ও মুরালী খালে সাতটি রেগুলেটর স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে পারকি খালের মুখে একটি বড় রেগুলেটর নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া পলি জমা রোধে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চারটি সিল্ট ট্র্যাপ বসানো হবে। কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে শিল্পবর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ার আশঙ্কা থাকায় পরিবেশদূষণ রোধে ‘ইকো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনিং’ এবং নদীর তীরে বনায়ন বা গ্রিন বেল্ট কর্মসূচি হাতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

কৃষিজমি ধ্বংস করে এমন মেগাসিটি নির্মাণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. অলক পাল বলেন, ‘তিন ফসলি জমিতে শহর গড়ে তোলা বাঞ্ছনীয় নয়। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে অংশীজনের মতামতসহ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার বলে মত দেন। নয়তো এটি পরিবেশের ওপর যেমন প্রভাব ফেলবে, তেমনি খাদ্য নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হবে। তিনি কৃষিজমি বাদ দিয়ে নদীর পাড়কে ঘিরে স্যাটেলাইট টাউন গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।’

আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন মনে করেন, ‘চায়না অর্থনৈতিক অঞ্চল চালুর মাধ্যমে পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রাম একটি আধুনিক শিল্প উপশহরে রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং কর্ণফুলী টানেলের বহুমুখী সুফলও বাড়বে। গড়ে উঠবে ওয়ান সিটি টু টাউন। সম্ভাবনা বড়,তবে বাস্তবায়নই মূল পরীক্ষা।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত