নবম পে-স্কেলে বেতন পরিশোধ করতে আজ সোমবার (৫ অক্টোবর) থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের হিসাব ও পুনঃনির্ধারণের জন্য ‘পে ফিক্সেশন’ নামে একটি অনলাইন নিবন্ধনের কাজ শুরু হচ্ছে। এজন্য সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অর্থ মন্ত্রণালয় পরিচালিত আইবিএএস প্লাসের (ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম বা সমন্বিত বাজেট ও হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি) ’পে ফিক্সেশন ২০২৬’ মডিউল-এ লগইন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে জানান, বাস্তবায়ন অনুবিভাগ ৫ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে ‘পে ফিক্সেশন’ সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দিয়েছে। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, নিবন্ধন একটি চলমান প্রক্রিয়া। যারা অক্টোবরেই যাবতীয় বর্ধিতসহ যাবতীয় বেতন-ভাতা নিতে চান তাদের জন্য সময়সীমা ২০ অক্টোবর পর্যন্ত।
সূত্র জানায়, পে ফিক্সেশন চূড়ান্ত করার পর নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে বেতন বিল তৈরি হবে। একই সঙ্গে নতুন ও পুরনো বেতনের পার্থক্য অনুযায়ী বকেয়া পাওনার হিসাবও চূড়ান্ত করা হবে। এরপর অক্টোবর মাসের বেতনের সঙ্গে প্রায় তিন মাসের বকেয়া দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। কে কত টাকা বকেয়া পাবেন, তা নির্ভর করবে নতুন বেতন নির্ধারণের ওপর।
বর্ধিত বেতন-ভাতার হিসাব হবে যেভাবে : ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যে মূল বেতন ছিল, সেটিকে ভিত্তি ধরে নতুন কাঠামোয় ১ জুলাই থেকে বেতন নির্ধারণ করা হবে। নতুন ও পুরনো মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেওয়া হবে। অবশিষ্ট অংশ দেওয়া হবে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে পূর্ণ নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
পে ফিক্সেশন করতে প্রয়োজন : আইবাস প্লাসে পে ফিক্সেশন করার আগে চাকরিজীবীদের নিজেদের চাকরিসংক্রান্ত তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখতে হবে। বিশেষ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর, জন্মতারিখ, বর্তমান পদবি ও গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে থাকা মূল বেতন, আগের বেতন নির্ধারণের তথ্য, পদোন্নতির তথ্য, বদলির তথ্য, সময় স্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার তথ্য, এসব তথ্যের পক্ষে থাকা অফিস আদেশ ও প্রয়োজনীয় নথি এবং আইবাস প্লাস প্লাসে নিবন্ধিত মোবাইলফোন নম্বর এই তথ্যগুলো হাতের কাছে রাখা প্রয়োজন।
তথ্য দেওয়ার সময় চাকরিজীবীদের আগের বেতন নির্ধারণের তথ্যও ভালোভাবে মিলিয়ে দেখতে হবে। কারণ নতুন বেতন নির্ধারণ শুধু বর্তমান মূল বেতনের ওপর নির্ভর করবে না; আগের চাকরির ইতিহাস ও বেতন নির্ধারণের তথ্যও এতে গুরুত্বপূর্ণ।
আইবাসে লগইন : পদমর্যাদা অনুযায়ী আইবাস প্লাসে প্রবেশের পদ্ধতিও আলাদা। গেজেটেড কর্মকর্তারা নিজেদের ব্যবহারকারী পরিচয় ও গোপন সংকেত ব্যবহার করে সরাসরি ব্যবস্থায় প্রবেশ করবেন। নন-গেজেটেড কর্মচারীরা জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও জন্মতারিখ ব্যবহার করে প্রবেশ করবেন।
প্রবেশের সময় নিবন্ধিত মোবাইলফোন নম্বরে একবার ব্যবহারযোগ্য সংকেত বা ওটিপি পাঠানো হবে। সেই সংকেত দিয়ে প্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। প্রবাসে থাকা চাকরিজীবীদের নিবন্ধিত ই-মেইল ঠিকানায়ও ওটিপি পাঠানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, তাদের পে ফিক্সেশনের আগে এনআইডি নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। তথ্য সঠিকভাবে যাচাই করে আবেদন জমা দিতে হবে। আবেদন জমা দেওয়ার পর নিবন্ধিত মোবাইলফোন নম্বরে স্বয়ংক্রিয় খুদে বার্তা যাবে। এরপর দেওয়া তথ্য সংশ্লিষ্ট বেতন ও হিসাব পরিশোধ কর্মকর্তার কাছে যাচাইয়ের জন্য যাবে। নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে চাকরির নথি অনুযায়ী আগের চাকরি ও বেতনের তথ্যও যাচাই করা হবে।
তথ্য ভুল হলে করণীয় : পে ফিক্সেশনের সময় কোনো তথ্য ভুল বা অসম্পূর্ণ দিলে বেতন নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে নাম, এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ, পদবি, গ্রেড ও মূল বেতনের তথ্যে ভুল থাকলে তা সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। পদোন্নতি, বদলি, সময় স্কেল, সিলেকশন গ্রেড বা উচ্চতর গ্রেডের তথ্য বাদ পড়লেও নতুন বেতন নির্ধারণের হিসাবে সমস্যা হতে পারে। তাই এসবের পক্ষে থাকা অফিস আদেশ ও নথি আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা জরুরি।
চূড়ান্ত অনুমোদন : তথ্য সঠিক থাকলে অনলাইনে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে। শুধু অনলাইনে তথ্য পূরণ করলেই পে ফিক্সেশন শেষ হবে না। সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কার্যালয় অনলাইনে দেওয়া তথ্য ও চাকরির নথি যাচাই করবে। তথ্যের সঙ্গে নথির অসংগতি পাওয়া গেলে সংশোধন করতে হতে পারে। তথ্য দিতে কোনো সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার সহায়তা নেওয়া যাবে।
উচ্চতর গ্রেড : নতুন বেতনকাঠামোয় উচ্চতর গ্রেডের হিসাবেও কিছু বিধান রয়েছে। কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়া একই পদে আট বছর পূর্ণ করলে এবং চাকরি সন্তোষজনক হলে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর একই পদে আরও ছয় বছর চাকরি করলে দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রয়েছে। তবে আগের বেতনকাঠামোয় একই পদে দুই বা ততধিক সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড পেয়ে থাকলে নতুন কাঠামোয় ওই পদে আর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
অন্যদিকে, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত একই পদে একটিমাত্র উচ্চতর স্কেল বা গ্রেড পাওয়া থাকলে পরবর্তী ছয় বছর পূর্তির পর দ্বিতীয় উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার বিধান রয়েছে। এ কারণে পে ফিক্সেশনের সময় শুধু বর্তমান বেতনের তথ্য দিলেই হবে না। আগের পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড এবং বেতন নির্ধারণের ইতিহাসও সঠিকভাবে দিতে হবে।
হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ : পে ফিক্সেশন সুষ্ঠুভাবে শেষ করতে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনলাইন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগের ‘সেবা দেওয়া সক্ষম করতে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ কর্মসূচি’ (এসপিএফএমএস)-এর আওতায় আইবাস প্লাস প্লাস এ প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। প্রশিক্ষণে প্রধান হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা (সিএএফও), বিভাগীয় হিসাব নিয়ন্ত্রক (ডিসিএ), জেলা হিসাব ও অর্থ কর্মকর্তা (ডিএএফও) এবং উপজেলা হিসাব কর্মকর্তা (ইউএও) কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন।