৫২-তে কেট উইন্সলেট

জীবনটাই যার সিনেমা

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম

হলিউডে যে ক’জন অভিনেত্রী নিজেদের বহুমুখী অভিনয় প্রতিভা, ব্যক্তিত্ব এবং চরিত্র রূপায়নে নিখুঁত দক্ষতার মাধ্যমে দর্শক হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম একজন কেট উইন্সলেট। অনেক চড়াই-উৎরাই পার করে আজকের অবস্থানে এসেছেন তিনি। অস্কারজয়ী এই তারকা আজ স্পর্শ করলেন জীবনের ৫২ তম বসন্ত। ১৯৭৫ সালের ৫ অক্টোবর ইংল্যান্ডের রিডিংয়ে জন্ম নেওয়া কেটের জীবনটাই যেন এক চলচ্চিত্র। ছেলেবেলায় কেটকে ডাকা হতো ‘ব্লাবার’ নামে।  শরীর নিয়ে অপমান, অভিনয়জগতে প্রবেশের সংগ্রাম, ২২ বছর বয়সে ‘টাইটানিক’ দিয়ে বিশ্বখ্যাতি, খ্যাতির চাপ, ব্যক্তিজীবনের ভাঙাগড়া, নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় নিয়ে বিতর্ক—সব পেরিয়ে আজ কেট উইন্সলেট এমন এক অভিনেত্রী, যিনি বয়স বাড়াকে লুকিয়ে নয়; বরং নিজের শক্তি হিসেবেই গ্রহণ করেছেন। সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করা এই তারকা শৈশব থেকেই নাটকের প্রতি তার ছিল গভীর অনুরাগ ও স্বাভাবিক আকর্ষণ। মাত্র কয়েক বছর বয়সেই মঞ্চ এবং ছোট পর্দায় কাজ শুরু করার মাধ্যমে অভিনয়ের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। পরবর্তীতে নিজের নিষ্ঠা ও সহজাত প্রতিভার জোরে তরুণ বয়সেই বিশ্ব চলচ্চিত্রের বৃহত্তম মঞ্চে প্রবেশ করেন এবং বিশ্বজুড়ে বিনোদনপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে বিশেষ পরিচিতি তৈরি করেন।

কেট উইন্সলেটের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় মাইলফলক অর্জিত হয় ১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র টাইটানিক-এর মাধ্যমে। পরিচালক জেমস ক্যামেরনের এই ঐতিহাসিক ছবিতে ‘রোজ দেউইট বুকাতার’ চরিত্রে তার অনবদ্য ও হৃদয়স্পর্শী অভিনয় বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। টাইটানিক বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রেকর্ড পরিমাণ ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি কেটকে বৈশ্বিক তারকার অলৌকিক উচ্চতায় নিয়ে যায় এবং সেরা অভিনেত্রী হিসেবে একাডেমি পুরস্কারের (অস্কার) মনোনয়ন এনে দেয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত দ্য রিডার চলচ্চিত্রে অসাধারণ ও গভীর অভিনয় শৈলী প্রদর্শনের মাধ্যমে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে বহু প্রতীক্ষিত একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে হেভেনলি ক্রিয়েচার্স, সেন্স অ্যান্ড সেনসিবিলিটি, ইটার্নাল সানশাইন অব দ্য স্পটলেস মাইন্ড, লিটল চিলড্রেন এবং মেয়ার অব ইস্টটাউন-এর মতো অসংখ্য ব্যবসাসফল ও সমালোচক-প্রশংসিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের কাজের বৈচিত্র্য প্রমাণ করেছেন। বহুমুখী এই আন্তর্জাতিক তারকার জীবন ও শিল্পযাত্রা রূপালি জগতের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পী ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণার নাম।

বিবিসি রেডিও ৪-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কেট জানান, একসময় পাপারাজ্জিরা তাঁকে অনুসরণ করত, তার ফোনে আড়ি পাতা হয়েছিল, এমনকি আবর্জনার ঝুড়িও খোঁজা হতো। স্থানীয় দোকানদারদের জিজ্ঞেস করা হতো, তিনি কী কিনছেন—সবই নাকি বোঝার চেষ্টা করার জন্য, তিনি কোনো ডায়েট করছেন বা করছেন না। ‘এটা ছিল একেবারেই ভয়ংকর,’ বলেন কেট। তিনি জানান, কয়েক বছর পর দ্বিতীয় বিয়ের ভাঙনের সময়ও তাঁকে একই ধরনের অনধিকার চর্চার মুখে পড়তে হয়। সেই সময় গণমাধ্যমের চাপ সামলাতে তিনি যে ‘উপায়গুলো’ কাজে লাগাতেন, সেগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে খানিকটা রসিকতার সুরেই বলেন, ‘একটা ভালো খাবার, কারও সঙ্গে মন খুলে কথা বলা, এক কাপ ভালো কফি, একটু রেডিওহেড (ব্যান্ড) শোনা...এসব থাকলে জীবন অনেক ভালো লাগে।’

২১ বছর বয়সে ‘টাইটানিক’-এর শুটিংয়ের সময় নিজের শরীর ও মানসিক অবস্থার দিক থেকে তিনি খুব একটা ভালো জায়গায় ছিলেন না, স্বীকার করেন কেট। ছবিটি বানানোর অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ, কিন্তু মুক্তির পর তাঁর জীবন যেন পুরোপুরি ওলট–পালট হয়ে যায়। ‘আমি সেই দুনিয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না,’ বলেন তিনি। শৈশব থেকেই নিজের শরীর নিয়ে কটূক্তির শিকার হওয়ার কথাও মনে করেন অভিনেত্রী। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহপাঠীরা তাঁকে ‘ব্লাবার’(চর্বিযুক্ত) বলে ডাকত। পরে এক নাট্যশিক্ষক তাঁকে বলেছিলেন, অভিনেত্রী হতে চাইলে তাঁকে নাকি ‘মোটা মেয়ের চরিত্রেই’ সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

কেটের ব্যক্তিজীবনও কম আলোচিত নয়। ১৯৯৮ সালে সহকারী পরিচালক জিম থ্রিপলটনকে বিয়ে করেন তিনি। তাঁদের মেয়ে মিয়া থ্রিপলটনের জন্ম ২০০০ সালে। ২০০১ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। এরপর ২০০৩ সালে কেট বিয়ে করেন পরিচালক স্যাম মেন্ডেসকে। তাঁদের ছেলে জো জন্ম নেয় একই বছর। মেন্ডেসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও শেষ হয় ২০১০ সালে; পরের বছর তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। ২০১২ সালে কেট বিয়ে করেন এডওয়ার্ড অ্যাবেল স্মিথকে, যিনি একসময় ‘নেড রকনরোল’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাদের ছেলে বেয়ার জন্ম নেয় ২০১৩ সালে। তিন সন্তানকে নিয়ে পরিবার কেটের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি। কাজ বাছাইয়ের সময় সন্তানদের কথাও বিবেচনা করেন তিনি। মেয়ে মিয়া এখন নিজেও অভিনয় করছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত