এলপিজির বাজারে অস্থিরতা

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১০ এএম

দাম বৃদ্ধির পরও অস্থিরতা কাটেনি এলপিজি বাজারে। গতকাল সোমবারও আগের মতোই সংকটের অজুহাতে বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রি করছিলেন দোকানিরা। সরকারি হস্তক্ষেপ, এলপিজি অপারেটরদের নির্দেশনা এবং এরপর দাম বৃদ্ধি এই তিন পদক্ষেপের কোনোটিই এলপিজির বাজারে স্বস্তি আনেনি। সোমবারও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির এলপিজির সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকায়। কিছু দোকানি জানিয়েছেন, তাদের কাছে এলপিজি নেই। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) অপারেটররা যে হিসাব দিয়েছেন, সেখানে দেখা গেছে, গত ২০ সেপ্টেম্বরের পর থেকে কোম্পানিগুলো বাজারে সরবরাহ কমিয়েছে। এতে বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে।

বাজারে সংকট শুরুর পর থেকে এলপিজি অপারেটররা দাবি করে আসছেন, জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ায় তারা এলপিজি আমদানি করতে পারেননি। অন্যদিকে সরকারের তরফ থেকে যে আমদানির তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে, সেখানে বলা হয়েছে গত মাসে দেড় লাখ টনের বেশি এলপিজি আমদানি হয়েছে। গত কয়েক মাসে এক লাখ ২০ হাজার থেকে এক লাখ ৩০ হাজার টন আমদানি করা হয়েছে। ফলে বাজারে কোনো সংকট নেই।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন (লোয়াব) সভাপতি ও ডেলটা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, এলপিজির সংকট হওয়ার পর গত ২৮ তারিখে জ্বালানিমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন। ওই বৈঠকেই বলা হয়, বাজারে কোনো সংকট নেই। এরপরও বাজারে স্বস্তি না আসায় লোয়াব থেকে ২৯ তারিখ আলাদা বিবৃতি দেওয়া হয়। সেখানে কেউ যাতে বিইআরসি নির্ধারিত দামের বাইরে এলপিজি বিক্রি না করে, এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতেও কাজ না হলে জ্বালানিমন্ত্রী জেলা প্রশাসকদের আলাদা করে নির্দেশনা দেন। আমরা লোয়াব থেকে সরকারের সব পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছি। আমরা বলেছি, অপারেটর থেকে ডিলার এমনকি খুচরা ব্যবসায়ী যারাই এলপিজি নিয়ে অন্যায্য বাণিজ্য করবে, প্রত্যেকের জন্য আইন যেন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়।

বিইআরসি সূত্র জানায়, এলপিজি আমদানিকারকরা ২০ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বাজারে এলপিজি সরবরাহ কমিয়েছেন। কোনো কোনো কোম্পানি মাসের শেষ দিকে এসে বাজারে এলপিজি বিক্রি বন্ধ রেখেছে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। বিইআরসি আমদানিকারকদের কাছে বিক্রির তথ্য চাইলে ১১ কোম্পানি এ তথ্য সরবরাহ করে। বিইআরসির একটি সূত্র বলছে, মাসের শুরুতে যেভাবে এলপিজি বিক্রি হয়েছে, শেষের দিকে এসে অপারেটররা তা কমিয়েছেন। অর্থাৎ বিক্রির ধারাবাহিকতা নেই। যদিও বিইআরসির কেউ এ বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি। তবে সূত্রটি বলছে, বিক্রির তথ্যের সঙ্গে ব্যাংক হিসাব তলব করলে বোঝা যেত, প্রকৃত অর্থে তারা যা বলছে, সেই পরিমাণ এলপিজি বাজারে ছেড়েছে কি না।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদকে ফোন করা হলে তিনি সাড়া দেননি।

অভিযোগ উঠেছে, দাম বৃদ্ধি পাবে এমনটি বুঝতে পেরেই বাজারে চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি ছাড়েননি অপারেটররা। আর এ কারণেই এলপিজির সংকট দেখা দিয়েছে।

এলপিজি অপারেটরদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বড় তিনটি কোম্পানি, যাদের হাতে মার্কেটের অন্তত ৪০ শতাংশ শেয়ার ছিল, তারা পুরোদমে আমদানি ও বিতরণ করছে না। স্বল্প পরিমাণ আমদানি ও বিতরণ করায় বাজারে একটি গ্যাপ তৈরি হয়েছে। বড় তিন কোম্পানির মধ্যে রয়েছে বসুন্ধরা এলপিজি, বেক্সিমকো এলপিজি ও ইউনিগ্যাস।

বসুন্ধরা এলপিজির এক কর্মকর্তা জানান, বাজারে তাদের ৬০-৭০ লাখ এলপিজির সিলিন্ডার রয়েছে। এলপিজির বাজারের অন্তত ২০ শতাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু এখন কোনো রকম নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও ব্যবসায় ভাটা পড়েছে তাদের।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই বিপাকে রয়েছে বেক্সিমকো। বাজারে এই কোম্পানিটিরও ২০ থেকে ২৫ লাখ সিলিন্ডার রয়েছে। এর বাইরে এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ইউনিগ্যাসের ২৫ থেকে ৩০ লাখ সিলিন্ডার রয়েছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এক কোটির বেশি সিলিন্ডার প্রতি মাসে আগে বাজারে এলেও এখন সেখানে ভাটা পড়েছে। বাজারে থাকা এক কোম্পানির সিলিন্ডার অন্য কোম্পানি রিফিল করে না।

টিএমএসএস এলপিজির কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, বাজারে সংকট তৈরির এটিও অন্যতম কারণ। এই এক কোটি সিলিন্ডার আগে প্রতি মাসে রিফিল হতো। বাজারে তাদের আলাদা গ্রাহক আছে। বাজারে অন্যরা সিলিন্ডার বৃদ্ধির চেষ্টা করছে। কিন্তু খুব সহজেই তা হওয়া কঠিন।

গতকাল বনশ্রী সি ব্লকের একটি দোকানে এলপিজির দাম জানতে চাইলে বিক্রেতা বলেন, ১২ কেজির বোতলের দাম ২ হাজার ৭০০ টাকা। পূর্ব রামপুরার মোল্লাবাড়ির আরেকটি দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার দোকানে এলপিজি নেই। কখন আসবে, তাও জানাতে পারেননি তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত