সত্য বলা বারণ: ছড়াগ্রন্থ ও সমাজচরিত্র

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৯ পিএম

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে।’ অথচ সেই সহজ কথাকেই সহজ, সরল ও ছন্দময় করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক অনন্য মাধ্যম ছড়া। একসময় ছড়া মূলত শিশুসাহিত্যের পরিসরেই সীমাবদ্ধ ছিল। সময়ের বিবর্তনে সেই সীমা অনেক আগেই অতিক্রান্ত হয়েছে। আজকের ছড়া শুধু শিশুর মনোরঞ্জন করে না; বরং সমাজের অসংগতি, রাষ্ট্রের সংকট, মানুষের নৈতিক অবক্ষয় এবং সময়ের নানা অসংগতির বিরুদ্ধে সচেতনতার ভাষা হয়ে উঠেছে।

জাতীয় দৈনিকগুলোর পাতায় ‘সমকালীন ছড়া’ এখন পাঠকের কাছে সময়ের দর্পণ। সেই ধারারই একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন ছড়াকার লুৎফুর রহমানের সম্প্রতি প্রকাশিত ছড়াগ্রন্থ ‘সত্য বলা বারণ’। গ্রন্থটি কেবল সমকালীন ঘটনাবলির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এর ভেতর দিয়ে সমাজের কিছু চিরন্তন অসংগতি, মানুষের নৈতিক সংকট এবং সময়ের চরিত্রকে ছন্দের শরীরে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন কবি।

বাংলা ছড়াসাহিত্যের বরপুত্র লুৎফর রহমান রিটন এবং এই গ্রন্থের রচয়িতা লুৎফুর রহমান—নাম ও পরিচয়ের কিছু সাদৃশ্যের পাশাপাশি ছড়ার প্রতি তাঁদের গভীর অনুরাগেও রয়েছে মিল। লুৎফর রহমানের একটি বইয়ের ভূমিকায় রিটন লিখেছিলেন, ‘তার সাথে আমার ৪ মিল। নামের প্রথম অংশ, সেও প্রবাসী, আমিও প্রবাসী। সেও ছড়া ভালোবাসে, আমিও। সেও জাতির পিতা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপসহীন, আমিও।’

লুৎফুর রহমানের ছড়া পড়তে গিয়ে কোথাও কোথাও রিটনের ছড়ার স্মৃতি মনে পড়ে। তবে অনুকরণের জায়গায় থেমে না থেকে লুৎফুর নিজস্ব কণ্ঠও নির্মাণ করেছেন। ছন্দকে তিনি কেবল ছন্দের নিয়মে আবদ্ধ রাখেননি; বরং ছন্দের ভেতর দিয়ে বড় কোনো ঘটনা, সামাজিক অসঙ্গতি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী সংকটকে অল্প কথায়, তীক্ষ্ণ ব্যঞ্জনায় তুলে ধরেছেন। গতানুগতিক তাল, লয় ও মাত্রার পরিচিত কাঠামোর বাইরে গিয়েও তাঁর ছড়া পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখে। জাতীয় পত্রিকার পাতায় যেসব তরুণ ছড়াকার নিজেদের স্বতন্ত্র উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন, লুৎফুর রহমান তাঁদের অন্যতম।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এবং লন্ডন বইমেলা উপলক্ষে ঢাকার প্রতিভা প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয় ‘সত্য বলা বারণ’। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের এক অস্থির সময়ে প্রকাশিত এই গ্রন্থের ছড়াগুলো যেন ছন্দের বিস্ফোরণ—যেখানে ক্ষোভ আছে, অভিমান আছে, প্রতিবাদ আছে; আছে দেশ ও মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতাও। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে বিলেতপ্রবাসী লেখক ও সংগঠক নোমান আহমদকে। গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছেন বিশিষ্ট ছড়াসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম। তিনি যথার্থই লিখেছেন, ‘সমাজের অসংগতিকে তিনি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেন বলে নিপুণভাবে তুলেছেন।’

মোট ৪১টি ছড়া স্থান পেয়েছে গ্রন্থটিতে। প্রতিটি ছড়ার সঙ্গে রয়েছে নান্দনিক অলংকরণ, যা গ্রন্থটির বিষয়বস্তুকে আরও প্রাণবন্ত করেছে। ছড়াগুলোর বিষয়বৈচিত্র্যও লক্ষণীয়। সমাজের অসংগতি, নৈতিকতার অবক্ষয়, দেশপ্রেমের সংকট, দলীয় আনুগত্যের অন্ধতা, সুযোগসন্ধানী চরিত্র, মানবিক বিপর্যয়, ইতিহাস বিকৃতির প্রবণতা, মতের দ্বন্দ্বে সমাজের বিভাজন—সময়ের নানা অসুখই এখানে ছন্দের ভাষা পেয়েছে।

এ বই তাই ঘুম পাড়ানোর বই নয়; বরং ঘুম ভাঙানোর বই। অনেকটা ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে খুকুর পরে রাগ করো’ কিংবা ‘তোমরা যারা বুড়ো খোকা, ভারত ভেঙে ভাগ করো’—এই ধরনের তির্যক অথচ গভীর সামাজিক ব্যঙ্গের উত্তরাধিকার বহন করে বইটি। ছড়ার সরলতার আড়ালে লেখক যে প্রশ্নগুলো ছুড়ে দেন, সেগুলো পাঠকের বিবেককে অস্বস্তিতে ফেলে।

গ্রন্থের নাম-ছড়াতেই সেই প্রতিবাদের সুর স্পষ্ট—

‘সত্য কথা বলতে মানা,
সত্য পথে চলতে মানা,
কারণ
সত্য কথায় শত্রু বাড়ে,
মা করেছে বারণ।’

এরপরই আসে শৈশবে নেওয়া শপথ, নজরুলের কথা এবং ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা। সমাজের প্রতি ক্ষোভ, সময়ের প্রতি অভিমান এবং নিজের বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত না হওয়ার এক অন্তর্গত আকুতি—সব মিলিয়ে এই ছড়াগুলো যেন একজন দেশপ্রেমী তরুণের একান্ত স্বগতোক্তি নয়, বরং সমষ্টির হয়ে উচ্চারিত এক বয়ান।

পেশাগত জীবনে সংবাদকর্মী হওয়ায় লুৎফুর রহমানের ছড়ায় সংবাদভাষার উপস্থিতিও লক্ষণীয়। ‘শোক সংবাদ’, ‘হারানো বিজ্ঞপ্তি’, ‘ব্রেকিং নিউজ’—এমন শিরোনামই পাঠককে কখনো সংবাদপত্রের পাতায়, কখনো সমাজের অন্দরমহলে নিয়ে যায়। সংবাদকর্মীর চোখে দেখা বাস্তবতা তাঁর ছড়ায় রূপ নেয় সামাজিক বিবেকের প্রশ্নে।

‘মতবিরোধ’ ছড়ার শুরুতেই রয়েছে চমৎকার ব্যঙ্গ—

‘মা ও দাদির মতের বিরোধ মিষ্টি পানের খিল্লিতে,
বাপ ও দাদার বিরোধ আছে পিন্ডি এবং দিল্লীতে।’

পারিবারিক মতপার্থক্য থেকে জাতীয় রাজনীতির বিভাজন—দুই লাইনের এই সেতুবন্ধনই লুৎফুরের ছড়ার শক্তি। সামান্য পরিসরে বৃহৎ বাস্তবতাকে ধরতে পারার দক্ষতা তাঁর ছড়াকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।

‘শোক সংবাদ’ ছড়াতেও রয়েছে এমনই তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ—

‘বাড়ছে দেশে ধর্মশালা, মসজিদ এবং গীর্জা,
আদর্শেতে সিরাজের অভাব, এখন বেশি মীরজাফর।’

দুটি পঙ্‌ক্তির অন্ত্যমিলের আড়ালে এখানে উঠে এসেছে আদর্শের সংকট, নৈতিকতার অবক্ষয় এবং সুবিধাবাদী চরিত্রের বিস্তার। ছড়ার সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—অল্প কথায় অনেকখানি কথা বলে ফেলা।

মেকি দেশপ্রেমের বিরুদ্ধেও লেখকের কণ্ঠ সরব। ‘কদর’ ছড়ায় তিনি লিখেছেন—

‘ভাষার কদর ফাগুন মাসে আগুনঝরা পলাশে,
অন্যদিনে ফাটায় গলা ভিনভাষাতে গলা সে।’

ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আমাদের মৌসুমি ভালোবাসার যে দ্বিচারিতা, কবি সেটিকেই ব্যঙ্গের আয়নায় দেখিয়েছেন। ‘নিখোঁজ সংবাদ’ কিংবা ‘ভুলছি কেন’-এর মতো ছড়ায়ও নিজের সমাজ, সংস্কৃতি ও শিকড় থেকে দূরে সরে যাওয়ার বেদনা প্রকাশ পেয়েছে।

‘ধর্ষিতার সাক্ষাৎকার’ ছড়াটি গ্রন্থের অন্যতম আলোচিত ও বেদনাবিধুর রচনা। সাংবাদিকতার প্রশ্নোত্তর কাঠামো ব্যবহার করে কবি সেখানে তনু হত্যার প্রসঙ্গকে তুলে ধরেছেন—

‘নাম কী তোমার—তনু,
ডাকতো বাপে—মনু,
চাচ্ছো কী আজ—বিচার,
নাম কী বাপের—নিছার।’

অল্প কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতে একটি নির্মম সামাজিক বাস্তবতার যে প্রতিচিত্র ফুটে ওঠে, তা পাঠককে থমকে দেয়। একইভাবে ‘আজকের সংবাদপত্র’ ছড়ায় উঠে এসেছে রাহাজানি, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানুষের নিরাপত্তাহীনতার চিত্র। সংবাদপত্রের ভাষা এখানে কেবল খবরের ভাষা হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে সময়ের বিবেকের ভাষা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত