২০১৮ সালের সেই দুঃস্বপ্নের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসার লড়াইয়ে নেমেছে অস্ট্রেলিয়া। তবে আট বছর আগের সেই উত্তপ্ত আর বিতর্কিত মুহূর্তের সঙ্গে বর্তমানের ২০২৬ সালের সফরে অদ্ভুত এক মিল খুঁজে পাওয়া গেল। সেবার যেমন এক ঝাঁক পরীক্ষিত বোলার আর জোড়াতালি দেওয়া ব্যাটিং লাইনআপ নিয়ে লড়াইয়ে নেমেছিল অজিরা, আজও তাদের গল্পটা প্রায় একই সুতোয় গাঁথা।
পার্থক্য কেবল একটাই, সেদিনের সেই তরুণ বোলিং আক্রমণ আজ প্রায় এক হাজার উইকোর্টের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতায় বলীয়ান। তবে পুরোনো সেই বোলিং শক্তির আড়ালে এবারও অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ যেন এক অজানা শঙ্কা আর অদ্ভুত সব সিদ্ধান্তের ঘূর্ণাবর্তে বন্দি।
দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে টেস্ট সিরিজ মানেই বরাবর এক স্নায়ুক্ষয়ী লড়াই, যেখানে ব্যাটারদের রান খরা আর অপ্রয়োজনীয় ভুলের ছড়াছড়ি থাকে। বর্তমান অজি স্কোয়াডের দিকে তাকালে দেখা যায়, নাথান লায়ন, জশ হ্যাজলউড, প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্কের মতো বিশ্বমানের পেস ও স্পিন জুটি আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত।
কিন্তু তাদের এই শক্তির বিপরীতে ব্যাটিং বিভাগে রয়ে গেছে চরম অনিশ্চয়তা। উসমান খাজা বা ডেভিড ওয়ার্নারের যুগের পর ওপেনিংয়ে ম্যাট রেনশকে থিতু করার চেষ্টা চলছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কঠিন মঞ্চে তাঁর প্রস্তুতি নিয়ে রয়েছে সংশয়। মারনাস লাবুশেন প্রস্তুতি ম্যাচে শতক হাঁকিয়ে কিছুটা স্বস্তি দিলেও ক্যামেরন গ্রিনের চোট দলের মিডল অর্ডারে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
আর এই জায়গায় এসেই শুরু হয়েছে যত্রতত্র বিতর্ক। গ্রিনের বদলি হিসেবে স্কোয়াডে কে আসবেন, এই প্রশ্নে নির্বাচকদের সামনে দাঁড়িয়েছিল দুই বিপরীত মেরুর দুটি নাম: তরুণ কুপার কনোলি কিংবা অভিজ্ঞ নিক ম্যাডিসন। ২৩ বছর বয়সী কনরলির প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বড় কোনো ইনিংস খেলার রেকর্ড বা দীর্ঘ ফরম্যাটে বোলিংয়ের তেমন কোনো সাফল্যের গল্প নেই। তাকে স্কোয়াডে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি পুরোটাই ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর এক জুয়া খেলার শামিল।
অন্যদিকে, ৩৪ বছর বয়সী নিক ম্যাডিসনের অন্তর্ভুক্তি তো আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ। ক্যানসারকে জয় করে ক্রিকেটে ফেরা ম্যাডিসনকে নিয়ে মানুষের সহানুভূতি থাকলেও তিনি গত প্রায় দেড় বছর ধরে প্রতিযোগিতামূলক ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটেই অনিয়মিত।
অনেকে হয়তো এর পক্ষে উদাহরণ হিসেবে স্টিভ স্মিথের নাম তুলতে পারেন, যিনি ‘স্যান্ডপেপারগেট কেলেঙ্কারি’র পর ১৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ঠিকই জাতীয় দলে সফলভাবে ফিরেছিলেন। কিন্তু স্মিথ তো দলে ফেরার আগেই বিশ্বমানের এক ব্যাটার হিসেবে নিজের রেকর্ড পাকা করে রেখেছিলেন। অতীতে যে রানগুলো দিয়ে তখন একজন খেলোয়াড়কে জাতীয় দলে জায়গা দেওয়া সম্ভব হয়নি, বছরকয়েক পর সেই পুরোনো রানগুলোকে ‘বন্ডের সুদের মতো’ জমিয়ে রেখে হঠাৎ তার দলভুক্তির দাবি তোলা সম্পূর্ণ আলাদা এবং অগ্রহণযোগ্য এক বিষয়।
তবে এসবের মধ্যে ম্যাডিসনের এই অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ওঠা নানা সমালোচনার মুখে পড়ে সাফাই গেয়েছেন জাতীয় দলের কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড। দলের এই কঠিন স্কোয়াড ঘোষণার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ম্যাকডোনাল্ড বলেছেন, ‘২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনি শেফিল্ড শিল্ড ক্রিকেটের অন্যতম সেরা পারফর্মারদের একজন ছিলেন।’ তবে ক্রিকেট সমালোচকদের প্রশ্ন, অতীতের সেই পরিসংখ্যান বর্তমানের কঠিন টেস্ট ক্রিকেটের বাস্তবতায় কতটা কার্যকর হবে, যেখানে একজন খেলোয়াড়ের বর্তমান ফিটনেস ও ম্যাচ প্র্যাকটিসই মূল নিয়ামক?
এদিকে অজিদের এই নড়বড়ে ব্যাটিংয়ের চিত্রটি প্রোটিয়া শিবিরেও প্রায় হুবহু প্রতিফলিত হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকা দলও তাদের বোলিং আক্রমণের ওপর ভরসা করে কোনোমতে নিজেদের ইনিংস টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে রয়েছে। তারকা পেসার কাগিসো রাবাদার হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি থেকে ফেরা নিয়ে শঙ্কা কাটছে না, সঙ্গে মার্কো ইয়ানসেন, অ্যানরিখ নরকিয়া কিংবা কেশব মহারাজদের নিয়ে সাজানো একাদশ এক অনিশ্চিত সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
২০১৮ সালের সেবারে সফরে সিরিজের প্রথম টেস্টটা জিতলেও পরের তিনটাই হেরেছিল অস্ট্রেলিয়া। তার উপর জুটেছিল স্যান্ডপেপারগেটের ঘটনা। সেসব তাড়া করে ফিরছে আট বছর পরেও। এবারের সিরিজে তিনটা টেস্ট খেলবে দুই দল। যার প্রথমটি ডারবানে শুরু হবে আগামীকাল (শুক্রবার) থেকে।
‘মেসির মতো বিদায় রোনালদোরও প্রাপ্য’