সমুদ্র ও ভূ-পর্যবেক্ষণে আসছে কৃত্রিম উপগ্রহ

  • প্রয়োজন হবে ৬টি কৃত্রিম উপগ্রহের
  • চলছে সম্ভাবতা যাচাই
  • 'এর মাধ্যমে মৎস্য, কৃষি ও পরিবেশের পাশাপাশি নগরায়ণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, নৌপরিবহন, উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়ও তথ্য পাওয়া যাবে': ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বিএসসিএল
আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৩ পিএম

দেশের বিভিন্ন এলাকার ভূমি, পানি, কৃষি ও পরিবেশের চিত্র সংগ্রহে ভূ-পর্যবেক্ষণ কৃত্রিম  উপগ্রহনির্ভর (আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট) ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী নৌযানকে সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় আনা এবং সমুদ্রসম্পদ ও পরিবেশের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট’ এবং ‘অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম স্যাটেলাইট (এআইএস)’ নামে দুটি প্রকল্পে মোট ছয়টি কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে উৎক্ষেপণ করা ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১’-এর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

ভূ-পর্যবেক্ষণ কৃত্রিম উপগ্রহ (আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট)

বিএসসিএল সূত্র জানায়, ভূ-পর্যবেক্ষণ কৃত্রিম উপগ্রহ হলো এমন একটি বিশেষ মহাকাশযান, যা পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে গ্রহের বিভিন্ন অংশের তথ্য সংগ্রহ করে। এ কৃত্রিম উপগ্রহ ব্যবস্থায় মূলত দুই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে—অপটিক্যাল সেন্সর ও সার বা সিনথেটিক অ্যাপারচার রাডার (এসএআর)। অপটিক্যাল সেন্সর সূর্যের আলোর ওপর নির্ভর করে এবং দিনের বেলায় ছবি ধারণ করতে সক্ষম। অন্যদিকে এসএআর প্রযুক্তি নিজস্ব রাডার সংকেত ব্যবহার করে ছবি সংগ্রহ করে। ফলে মেঘ, বৃষ্টি বা অন্যান্য বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও এ প্রযুক্তির মাধ্যমে স্পষ্ট ছবি ধারণ করা সম্ভব হবে।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত ভূ-পর্যবেক্ষণ কৃত্রিম উপগ্রহটি কৃষি খাতে ফসলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, ফলন অনুমান এবং খরা পরিস্থিতি শনাক্ত করতে ব্যবহার করা যাবে। মৎস্য ও পানি ব্যবস্থাপনায় অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের মানচিত্র তৈরি এবং বন্যার বিস্তৃতি পর্যবেক্ষণেও এটি কাজে লাগবে। এ ছাড়া পরিবেশ পর্যবেক্ষণে বন উজাড় শনাক্তকরণ, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মূল্যায়ন এবং নদীভাঙন পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম উপগ্রহের তথ্য ব্যবহার করা যাবে। শহর সম্প্রসারণের মানচিত্র তৈরি, ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য স্পর্শকাতর এলাকা পর্যবেক্ষণেও এর ব্যবহার হবে।

বিএসসিএল সূত্র জানায়, বর্তমানে বিভিন্ন জরুরি তথ্য ও ছবি সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশকে বিদেশি কৃত্রিম উপগ্রহের ওপর নির্ভর করতে হয়। এসব তথ্য কিনতে ব্যয় বেশি এবং অনেক ক্ষেত্রে জরুরি সময়ে তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য পাওয়া যায় না। এ ছাড়া বিদেশি কৃত্রিম উপগ্রহের ছবি বা তথ্যের অনুরোধ পাঠানোর ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্পর্শকাতর এলাকার তথ্য প্রকাশ পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। নিজস্ব আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট স্থাপন করা গেলে এসব নির্ভরশীলতা ও ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে। 

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে আর্থ অবজারভেশন ডেটা থেকে বিশ্বব্যাপী ৭০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশের নিজস্ব আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট থাকলে দেশীয় সংস্থাগুলো টাকার বিনিময়ে প্রয়োজনীয় ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। এতে বিদেশি স্যাটেলাইটের কাছ থেকে তথ্য কেনার ক্ষেত্রে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে বলেও জানা গেছে।

সমূদ্র পর্যবেক্ষণে এআইএস কৃত্রিম উপগ্রহ (অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম স্যাটেলাইট)

অন্যদিকে স্বতন্ত্র মেরিটাইম এআইএস ব্যবস্থা তৈরির জন্য চারটি লো আর্থ অরবিট (এলইও) কৃত্তিম উপগ্রহ নিয়ে একটি ‘স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন’ গড়ে তোলার কথা ভাবা হচ্ছে। পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে অবস্থানকারী এসব কৃত্রিম উপগ্রহ বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ওপর দিয়ে অতিক্রম করার সময় নৌযানগুলোর এআইএস সংকেত গ্রহণ করবে এবং তা কেন্দ্রীয় ডেটা সেন্টারে পাঠিয়ে দেবে।

জানা  গেছে, পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করতে একটি  কৃত্রিম উপগ্রহের ৯০ থেকে ৯২ মিনিট সময় লাগবে। আর বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরের শেষ সীমা থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত একটি কৃত্তিম উপগ্রহে ১১ থেকে ১২ মিনিট অবস্থান করবে। ফলে চারটি কৃত্রিম  উপগ্রহ থাকলে প্রতি ১০ থেকে ১২ মিনিট পরপর একটি করে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যাবে। এভাবে একটির কাভারেজ শেষ হওয়ার পর অন্য কৃত্রিম উপগ্রহের কাভারেজ শুরু হওয়ার মাধ্যমে সমুদ্রে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা হবে। তবে উদ্যোগটিও এখনও বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি কারিগরি নকশা, অর্থায়ন ও টেন্ডারসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চলছে।

প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় প্রতিটি নৌযানের জন্য একটি স্বতন্ত্র ডিজিটাল পরিচয় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সড়কের যানবাহনের নম্বরপ্লেটের মতো সমুদ্রে থাকা প্রতিটি নৌযানকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা যাবে। নৌযানে থাকা এআইএস ডিভাইস থেকে সেটির নাম ও পরিচয়, তাৎক্ষণিক অবস্থান, গতি ও চলাচলের দিকের তথ্য পাওয়া যাবে। 

এ ছাড়া নৌযান থেকে জরুরি সংকেত বা ‘এসওএস’ পাঠানোর সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো নৌযান গভীর সমুদ্রে দুর্ঘটনা বা বিপদে পড়লে সেখান থেকে সংকেত পাঠানোমাত্রই তা কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টারে পৌঁছে যাবে। একইসঙ্গে আসে পাশে থাকা অন্যান্য নৌযানে সতর্ক সংকেত যাবে। এতে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট স্থানে অভিযান চালাতে পারবে।

বিষয়টি নিয়ে বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, "বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১" এর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রথমে এআইএস স্যাটেলাইট তারপর আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এআইএস স্যাটেলাইটটির মাধ্যমে প্রতি ১০ থেকে ১২ মিনিট পর পর সমুদ্রে বিভিন্ন  নৌযানের অবস্থান শনাক্ত করা যাবে।'

তিনি আরও বলেন, 'আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট থেকে মৎস্য, কৃষি ও পরিবেশের পাশাপাশি নগরায়ণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, নৌপরিবহন, উপকূলীয় ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়ও তথ্য পাওয়া যাবে। এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় শুধু আগাম প্রস্তুতিতেই নয়, দুর্যোগ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আগের ও পরের ছবি তুলনা করে বন্যায় কত পরিমাণ কৃষিজমি, ঘরবাড়ি বা অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিরূপণ করা সম্ভব হবে।'

জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এ স্যাটেলাইট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানান ইমাদুর রহমান।

তিনি বলেন, 'সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড ঘটছে কি না, স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এছাড়া বর্তমানে সামরিক বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা বিদেশি স্যাটেলাইট থেকে ছবি কিনলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় তাদের আগ্রহের বিষয়টি তৃতীয় পক্ষের কাছে জানা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। কিন্তু নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকলে এসব তথ্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে এবং ডেটার নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সহজ হবে।'

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত