দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম মাধ্যম প্রবাসীদের উপার্জন প্রেরণ। মাত্র দুদিন আগে সংবাদমাধ্যমে প্রবাসী আয়ে উল্লম্ফনের বার্তা জাতীয় অর্থনীতিতে এর জোগানের শক্তির ফের জানান দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের অক্টোবর মাসের প্রথম ছয় দিনে দেশে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছে ৬৩ কোটি মার্কিন ডলার। দেশীয় মুদ্রায় যা দাঁড়ায় ৭ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা। এর একদিন পরেই দেশ রূপান্তরসহ সহযোগী সংবাদমাধ্যমগুলোতে উঠে এসেছে, প্রবাসীদের দেশে আয় প্রেরণে খরচ বৃদ্ধির বার্তা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ৮ অক্টোবর দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর সেবার খরচ বৃদ্ধি, বিভিন্ন ধরনের ফি ও কর আরোপ এবং বিভিন্ন দেশের মুদ্রার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামার কারণে প্রবাসী আয় প্রেরণের খরচ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ছোট অঙ্কের প্রবাসী আয় প্রেরণে খরচ তুলনামূলক বেশি।
আমরা জানি, বৈধ পথে প্রবাসী আয় প্রেরণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ প্রবাসীদের প্রণোদনা দেওয়াসহ নানাভাবে যখন উৎসাহ দিয়ে আসছে, তখন এই পদক্ষেপ পরস্পরবিরোধী বলে আমরা মনে করি। আমরা জানি, হুন্ডির মাধ্যমে দেশে প্রবাসী আয় আসা বাড়তে থাকায় সরকারের ক্ষতির চিত্র স্ফীত হওয়ার প্রেক্ষাপটেই প্রবাসীদের অনুপ্রাণিত করতে সরকারি তৎপরতা বাড়ে। কিন্তু এখন প্রবাসীদের আয় প্রেরণে খরচ বৃদ্ধির ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব বহুমুখী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে আয় প্রেরণের খরচ বাড়তে থাকলে প্রবাসীদের অনেকেই হয়তো কম খরচের বিকল্প হিসেবে হুন্ডির দিকে ঝুঁকতে পারেন। তাতে বৈধ পথে প্রবাসী আয় আসার প্রবাহে ভাটা পড়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। যেসব দেশ থেকে অর্থ প্রেরণের খরচ বেশি, সেসব দেশের আর্থিক খাতগুলোর সঙ্গে আলোচনাক্রমে দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া বাঞ্ছনীয়। একই সঙ্গে আরও বড় পরিসরে বৈধ পথে প্রবাসী আয় ধরে রাখতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খরচ কমানোর বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে হুন্ডির মতো অবৈধ পথ রুদ্ধ করে ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাসী আয় প্রেরণে উৎসাহ আরও জোরদার করা জরুরি। প্রবাসীদের চিন্তায় অভিঘাত করে, এমন যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া বা বাস্তবায়ন করা থেকে বিরত থাকা উচিত, দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে। মনে রাখা দরকার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে
থাকা অর্থনীতিতে ফিরে স্বস্তি এনে দিয়েছে প্রবাসী আয়। আমাদের মতো নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত অর্থনীতির জন্য তা কতটা স্বস্তির সঙ্গে আশাসঞ্চারী বিষয় এরও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নি®প্রয়োজন। মনে রাখার বিষয় আরও আছে। যেমন রিজার্ভের পাশাপাশি ডলারের জোগানেও প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এ আয় ডলার জোগানের দায়বিহীন এক উৎস। এর বিপরীতে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয় না অথবা কোনো দায়ও পরিশোধ করতে হয় না। তাই প্রবাসী আয় বাড়লে ডলারের স্থিতি তুলনামূলক বেশি বাড়ে।
প্রবাসী আয়ের পথ মসৃণ রাখতেই হবে। আমরা মনে করি, ব্যাংক খাতসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা যদি সুচারু করা যায়, তাহলে এর সুফল আরও বড় পরিসরে দৃশ্যমান হতে বাধ্য। যেসব উপসর্গ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রতিবন্ধক হিসেবে বিদ্যমান সেগুলোর নিরসন ঘটিয়ে সেবার পথ সুগম করতে হবে। প্রবাসীরা তাদের আয় দেশে প্রেরণের পর তা উত্তোলন করতে গিয়ে গ্রহীতা যদি উন্নতমানের সেবা পান, তাহলে বৈধ পথে প্রবাসী আয় প্রেরণকারীর সংখ্যাও নিশ্চয়ই বাড়তে থাকবে। প্রবাসী কর্মীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মূলত নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য। তাদের অনেকেরই সচেতনতার অভাবের পাশাপাশি দেশে বৈধভাবে আয় প্রেরণের ব্যাপারেও জানার অনেক ঘাটতি রয়েছে। তা ছাড়া যে মাধ্যমে তারা বেশি মুনাফা পাবেন সেদিকেই ধাবিত হবেন, এটাই স্বাভাবিক। আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার কোনো ত্রুটির অসাধু চক্র যাতে সুযোগ নিতে না পারে, এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।