কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনকে (১৪) ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া একাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে ধারণা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। হত্যার পর তাজমিনের মুঠোফোন নিয়ে পালিয়ে যান তিনি। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মুঠোফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টায় কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) পঙ্কজ বড়ুয়া।
পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন তাজমিনকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তবে হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ জানায়, গত ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর গ্রামের একটি ধানখেতের আইলের পাশে তাজমিনের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। পরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
তাজমিন কুমিল্লা নগরের ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার স্থায়ী বাড়ি যশোরে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লার রেসকোর্স এলাকায় বসবাস করত সে।
যেভাবে হত্যাকাণ্ড
পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন জানিয়েছেন, গত ৮ অক্টোবর রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে তিশা বাস কাউন্টারের সামনে থেকে তাজমিনকে তার বাবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তোলেন তিনি। এ জন্য ৩০০ টাকা ভাড়া ঠিক হয়। অটোরিকশায় ওঠার পর তাজমিন তাকে ১০০ টাকা দিয়ে কলা ও রুটি কিনে আনে।
পরে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে চাঁদপুরগামী সড়ক হয়ে বিজরা বাজার ঘুরে তাজমিনকে নির্জন একটি স্থানে নিয়ে যান সুমন। সেখানে গিয়ে অটোরিকশা বন্ধ করে দেন তিনি। জায়গাটি অন্ধকার ও নির্জন হওয়ায় তাজমিন ভয় পেয়ে স্থানটি সম্পর্কে জানতে চায়। সুমন তাকে জানান, এটি রেসকোর্স নয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন তাজমিন অটোরিকশা থেকে নেমে পালানোর চেষ্টা করলে সুমন তাকে আটকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তাজমিন চিৎকার শুরু করলে সুমন তার গলা চেপে ধরেন। এতে দুজনই মাটিতে পড়ে যান এবং তাজমিন নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে সুমন তাজমিনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছেন। পরে ধানখেতে নিয়ে তার মাথা মাটিতে চেপে ধরে মৃত্যু নিশ্চিত করেন বলে জানিয়েছেন তিনি। এরপর তাজমিনের ব্যাগ থেকে আইফোন নিয়ে ব্যাগটি ধানখেতে ফেলে দেন।
মুঠোফোন নিয়ে চট্টগ্রামে পালান
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে অটোরিকশাটি রেখে কাছাকাছি একটি মসজিদের সামনে যান সুমন। সেখানে একটি পুকুরে গোসল করে অটোরিকশা নিয়ে বাখরাবাদ এলাকায় চলে যান। ওই এলাকার একটি জলাশয়ে তাজমিনের আইফোন লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামে পালিয়ে যান তিনি।
অটোরিকশার নিবন্ধনের সূত্র ধরে পুলিশ গাড়িটির মালিক হিসেবে লালমাই উপজেলার আবুল হাসেমকে শনাক্ত করে। বৃহস্পতিবার রাতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্ত আসামি অটোরিকশার চালক সুমনের পরিচয় জানতে পারে পুলিশ। পরে শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সুমনের দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে, বাখরাবাদ এলাকার একটি পুকুরপাড়ের জলাশয় থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, সুমনের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। কয়েক বছর আগে বিয়ে করে তিনি কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জয়নগর গ্রামে ঘরজামাই হিসেবে বসবাস শুরু করেন।
এ ঘটনায় লালমাই থানায় হত্যা মামলা হয়েছে। জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও থানা-পুলিশ যৌথভাবে তদন্ত করছে। হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কক্সবাজার থেকে ফিরেছিল তাজমিন
পুলিশ জানায়, তাজমিনের মুঠোফোনের কললিস্ট ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে তার চলাচল সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল সে। তবে মুঠোফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণে পুলিশ জানতে পারে, সেদিন সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। পরদিন ৫ অক্টোবর কুমিল্লায় ফিরে ভোররাতে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়।
৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন। পুলিশের ভাষ্য, সিসিটিভি ফুটেজে তাকে একটি গাড়ি থেকে একা নামতে দেখা গেছে। আশপাশের কয়েকটি ক্যামেরার ফুটেজে মুঠোফোন হাতে ও কাঁধে ব্যাগ নিয়ে তাকে ঘোরাফেরা করতেও দেখা যায়। পরে সে সড়কের দিকে চলে গেলে আর তার চলাচল ক্যামেরায় ধরা পড়েনি।
মরদেহ উদ্ধারের পর তাজমিনের বাবা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বুধবার গভীর রাতে মেয়ে মোবাইলে মেসেজ বার্তা ও লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে আটকে রাখার কথা জানায় এবং উদ্ধারের অনুরোধ করে। তবে তিনি তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। ভোরে মেসেজ দেখে মেয়ের পাঠানো লাইভ লোকেশন অনুসরণ করে সেখানে গিয়ে মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি জানতে পারেন।
মৃত্যুর আগে তাজমিন আইফোন চার্জ দেয় ১৫ মিনিট, এরপর কোথায় যায় সে?
লাইভ লোকেশন পাঠিয়েও বাঁচেনি তাজমিন, গ্রেপ্তার অটোচালক