কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে ‘স্ত্রী’ পরিচয়ে রাত কাটিয়েছিলেন কুমিল্লায় ধর্ষণের পর হত্যার শিকার স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন (১৫)। নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের খবর প্রকাশের পর থেকেই কক্সবাজারে অবস্থান করছেন অভিযুক্ত প্রেমিক রাজু। অন্যদিকে, দ্রুত বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে তাজমিনকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে রয়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া (৩৫)।
ঘটনার পর থেকে স্থানীয় সচেতন মহল রাজুকে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রেমের সম্পর্কের টানে অপ্রাপ্তবয়স্ক একটি মেয়েকে ফুসলিয়ে বাসা থেকে বের করা, ভুয়া পরিচয়ে হোটেলে রাত কাটানো এবং তথ্য গোপন করাও গুরুতর অপরাধ। তাকে আইনের আওতায় আনলে অনেক সত্য তথ্য বেরিয়ে আসবে। তবে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ হত্যাকাণ্ডে রাজুর সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য মেলেনি; ঘটনাটিতে অটোরিকশাচালক সুমন একাই জড়িত ছিলেন।
কক্সবাজারের কলাতলীর তিনতলা একটি আবাসিক হোটেলের নিবন্ধন খাতা থেকে জানা যায়, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে রিয়াজ উদ্দিনের সঙ্গে ৩০২ নম্বর কক্ষটি ভাড়া নেন তাজমিন। সেখানে তার নাম ‘তানজু আক্তার’ ও বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করে রিয়াজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। অন্যদিকে, রিয়াজের বাড়ি বান্দরবানের লামা এলাকায় উল্লেখ করা হয়।
হোটেল সূত্রে জানা যায়, এক রাত অবস্থানের পর ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা হোটেল ত্যাগ করেন। এরপর রিয়াজ ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসের ৯০০ টাকার একটি টিকিট কেটে তাজমিনকে কুমিল্লার উদ্দেশে ট্রেনে বা বাসে তুলে দেন বলে তার এক সহকর্মী জানান। জানা গেছে, রিয়াজ গত তিন বছর ধরে কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে চাকরি করছেন। তবে ঘটনার পর থেকেই ছুটিতে গিয়ে মুঠোফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে রয়েছেন তিনি।
পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তাজমিনের কথা-কাটাকাটি হয়। এতে অভিমান করে সে বাসা থেকে বের হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে চলে যায়। সেখান থেকেই ফেসবুকে পরিচয় হওয়া রিয়াজের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাজমিন। রিয়াজ তাকে কক্সবাজারে আসার জন্য বিকাশে ৫০০ টাকা পাঠান।
রিয়াজের এক সহকর্মীর দাবি, কুমিল্লায় ফেরার পথেও তাজমিনের সঙ্গে রিয়াজের মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল। এমনকি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠার পরও তাজমিন চালকের তথ্য রিয়াজকে জানিয়েছিল। কিন্তু রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের মুঠোফোনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে গেলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরদিন গণমাধ্যমে হত্যার খবর দেখে রিয়াজ আত্মগোপনে চলে যান।
কক্সবাজার থেকে ফিরে বাড়ি পৌঁছানোর পথেই সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়ার খপ্পরে পড়ে তাজমিন। গত ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ভোরালজগপুর উত্তরপাড়া গ্রামের একটি ধানখেতের আইল থেকে তার নিথর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর চট্টগ্রাম থেকে অটোরিকশাচালক সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়। আদালতে সুমন ধর্ষণের পর তাজমিনকে শ্বাসরোধে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, নিহত তাজমিনের মুঠোফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণসহ অন্যান্য বিষয়ে নিবিড় তদন্ত চলছে। গ্রেপ্তার আসামি আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন। রাজুর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানা যাবে।
তাজমিন হত্যা মামলার আসামি সুমন মাদকাসক্ত, ভেঙেছেন নিজ সংসারও
ফেসবুকে ১৭ দিনের সম্পর্কে কক্সবাজার ভ্রমণ, ফিরতি পথে নিভল তাজমিনের প্রাণ