তাজমিন হত্যা: মায়ের সঙ্গে অভিমান, ঘরছাড়া কিশোরীর করুণ পরিণতি

চার মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে কুমিল্লার কিশোরী জান্নাতুল তাজমিনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর থেকে নিয়মিত কথা হতো তাদের। সেই যোগাযোগের সূত্র ধরেই গত ৫ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে একা কক্সবাজারে আসে তাজমিন। সেখান থেকে ফেরার পথেই কুমিল্লায় ধর্ষণের পর তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১১ পিএম

বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার মনির আহমদের ছেলে রিয়াজ উদ্দিন। প্রায় তিন বছর ধরে কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে চাকরি করেন তিনি। গত ছয় মাস ধরে কাজ করছেন কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে চন্দ্রিমা উদ্যানসংলগ্ন একটি রিসোর্টে। 

চার মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে কুমিল্লার কিশোরী জান্নাতুল তাজমিনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর থেকে নিয়মিত কথা হতো তাদের। সেই যোগাযোগের সূত্র ধরেই গত ৫ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে একা কক্সবাজারে আসে তাজমিন। সেখান থেকে ফেরার পথেই কুমিল্লায় ধর্ষণের পর তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।

এ বিষয়ে রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘গত ৪ অক্টোবর তাজমিন আমাকে জানায়, তার হাতঘড়িটি বান্ধবীকে দেওয়ার কারণে মা প্রতিদিন বকাঝকা করেন। মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে সে বাসা থেকে বের হয়ে গেছে। তখন সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে ছিল। পরে আমাকে মুঠোফোনে কল দিয়ে কক্সবাজার আসার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করে। আমিও তার কথায় রাজি হয়ে কক্সবাজার আসার জন্য তাকে বিকাশে ৫০০ টাকা পাঠিয়ে দিই।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরপর ৫ অক্টোবর সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে রাত ১টার মধ্যে কক্সবাজারে পৌঁছায় তাজমিন। প্রথম দিন তার একা থাকার ব্যবস্থা করে দিই। পরদিন আমরা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে একটি রিসোর্টে রাত কাটাই। এর আগে কলাতলীর হোটেল ওশান প্যারাডাইসের কাছে একটি এজেন্ট কাউন্টার থেকে তার জন্য ফেরার টিকিট সংগ্রহ করি। পরদিন বুধবার তাকে বাসে তুলে দিই এবং ৫০০ টাকা দিই।’

বাস কাউন্টারটির পরিচালক আসহাব আব্দুল্লাহ বলেন, মঙ্গলবার রাত সাড়ে আটটার দিকে তাঁর কাউন্টার থেকে টিকিটটি কেনা হয়। এ সময় কিশোরীর সঙ্গে রিয়াজ উদ্দিন ছিলেন, যিনি তার পূর্বপরিচিত। কিশোরীটি কে, জানতে চাইলে রিয়াজ তাকে নিজের বান্ধবী বলে পরিচয় দেন।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল জোনে কুটুমবাড়ি রেস্তোরাঁর পাশের সড়কের একেবারে শেষ প্রান্তে মেঘলা রিসোর্ট। সেখানেই স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে রাত কাটান নিহত কিশোরী ও রিয়াজ উদ্দিন।

রিসোর্টের নিবন্ধন খাতা অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে রিয়াজ ও তাজমিন ৩০২ নম্বর কক্ষটি ভাড়া নেন। তবে সেখানে তাজমিনের নাম ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স ১৮ বছর হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়। পরদিন ৭ অক্টোবর সকাল ১১টার দিকে তারা রিসোর্ট ছেড়ে যান। সিসিটিভি ফুটেজেও তাদের একসঙ্গে রিসোর্ট থেকে বের হতে দেখা যায়।

রিসোর্টের নিবন্ধন খাতায় রিয়াজের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ও দুটি মুঠোফোন নম্বর থাকলেও নিহত তাজমিনের কোনো পরিচয়পত্রের তথ্য ছিল না।

এ বিষয়ে মেঘলা রিসোর্টের ফ্রন্ট ডেস্ক ব্যবস্থাপক মো. আবছার বলেন, তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে কক্ষ ভাড়া নিয়েছিলেন। বিয়ের কাবিননামা চাওয়া হলে তারা জানান, বিয়ে হয়েছে অল্প কিছুদিন আগে। তাই এখনও কাগজ তোলা হয়নি।

আবছার বলেন, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ তরুণের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করলেও কিশোরীর কোনো পরিচয়পত্র নেয়নি। সাধারণত তাদের রিসোর্টে অন্তত একজনের পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা হয়।

কক্সবাজারে দুই দিন অবস্থানের সময় তাজমিনের বাবা তাকে বারবার ফোন করে বাড়ি ফেরার তাগিদ দিচ্ছিলেন বলে জানিয়েছেন রিয়াজ উদ্দিন। এ কারণে বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি তাজমিনকে বাসে তুলে দেন এবং হাতখরচের জন্য ৫০০ টাকা দেন। বাস ছাড়ার পর তাজমিনের লাইভ লোকেশন দেখছিলেন বলেও জানান রিয়াজ। তার দাবি, কুমিল্লায় পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল।

রিয়াজের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, রাত আনুমানিক দুইটার দিকে কুমিল্লায় পৌঁছে তাজমিন তাকে জানায়, বাড়ির মূল ফটক বন্ধ। এরপর সে স্টেশনে ফিরে যায়। পরে স্টেশনে এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকের সঙ্গে দেখা হয়েছে বলে রিয়াজকে জানায় তাজমিন। ওই চালক তার বান্ধবীর বাবা এবং সে তার বাড়িতেই রাত কাটাবে—এমনটাই তাজমিন তাকে জানিয়েছিল বলে দাবি করেন রিয়াজ।

বিষয়টি শুনে রিয়াজ তাজমিনকে সেখানে যেতে নিষেধ করেন। তাকে নিজের বাড়ির ফটকের নিচে অপেক্ষা করতে অথবা বাবাকে ফোন দিতে বলেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে রাত দুইটার দিকে তাজমিন ফোন কেটে দেয়।

রিয়াজ আরও বলেন, রাত ২টা ১৬ মিনিটে হোয়াটসঅ্যাপে তাজমিন তাকে বার্তা পাঠায়, ‘সমস্যা নাই, আমি আমার একটা আঙ্কেলের বাসায় আসছি, কালকে বাসায় চলে যাবো।’

এরপর তাজমিনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আর যোগাযোগ করতে পারেননি বলে দাবি করেন রিয়াজ।

পরদিন সকালে তাজমিনের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল করেও সাড়া পাননি বলে জানান তিনি। পরে তাজমিনের এক বান্ধবীর মাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর জানতে পারেন বলে দাবি করেন রিয়াজ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত