চট্টগ্রামে চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই উধাও হয়ে যাচ্ছে মোটরসাইকেল। তারপর বিভিন্ন হাত ঘুরে চলে যাচ্ছে অন্যজনের হাতে। ভোল বদলে সেই চোরাই মোটর সাইকেলের ইঞ্জিন লাগানো হচ্ছে রিকশাভ্যান বা নৌকায়। চালক একটু অন্যমনস্ক হলেই জনাকীর্ণ স্থান যেমন- বিপনি বিতান, হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার এলাকা থেকে নিমেষে উধাও হয়ে যাচ্ছে মোটরসাইকেল।
গত ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত এক সপ্তাহের ব্যবধানে অন্তত ২০টি চোরাই মোটর সাইকেল উদ্ধার করেছে চট্টগ্রাম নগর পুলিশ। মোটর সাইকেল চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১২ অক্টোবর নগরের সিআরবি কাঠের বাংলো থেকে মো. সুমন (৩০) নামে মোটরসাইকেল ‘চোর চক্রের’ এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আদালতের নির্দেশে তাকে রিমান্ডে আনার পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও ১৪টি চোরাই মোটর সাইকেল উদ্ধার করেছে নগরের চকবাজার ও কেতোয়ালী থানা পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, চট্টগ্রাম নগর ও জেলা জুড়ে বারবার গাড়ি, মোটর সাইকেল, স্কুটি উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসছে। এই ‘কারবারে’ জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এই সমস্ত ঘটনার নেপথ্যে একটিই চক্র কাজ করছে, না কি একাধিক চক্র সক্রিয় এ বিষয়টিই বিশেষভাবে নজরে রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নগর পুলিশের উপকমিশনার হাবিবুর রহমান প্রামাণিক।
‘চট্টগ্রাম শহর এলাকায় মোটর সাইকেল চুরির একাধিক চক্র দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয়। পুলিশের কাছে এ ব্যাপারে কিছু নির্দিষ্ট তথ্য থাকায় সম্প্রতি চোরাই মোটর
সাইকেল তল্লাশিতে জোর দিয়েছে সিএমপি’র বিভিন্ন থানার পুলিশ। সেই তল্লাশি অভিযানেই সাফল্য এসেছে, বলেন সিএমপির সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ।
এর আগে ১২ অক্টোবর চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর সুধারাম থানা এলাকা থেকে ৬টি মোটর সাইকেলসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তাররা হলেন-আব্দুর রহমান ওরফে সুমন ওরফে আনোয়ার (২৭), মাইনুদ্দিন মুরাদ (২৭), শাহাদাত হোসেন (৩০) ও আবু হুরায়রা (৩০)। পুলিশ রিমান্ডে ধৃত আসামি সুমন জানান, দুই মিনিটের মধ্যে একটি মোটর সাইকেল নিয়ে উধাও হয়ে যায় তারা। চোরাই মোটর সাইকেল রাখতেন যার যার হেফাজতে। চুরির জন্য ছদ্মবেশে তারা ঘুরে বেড়াতেন চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন মার্কেট, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।
পুলিশ জানায়, মোটর সাইকেল চুরি চক্রের একটি দল কিছু দিন পরপর জায়গা বদলে এ কাজ করে। এমন কয়েকটি চক্র এখন চট্টগ্রাম শহর ও আশপাশের এলাকায় কাজ করছে। মোটর সাইকেল চুরি করে কেউ কেউ মোটর সাইকেল ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ আলাদা করা হয়। মোটরচালিত ভ্যান রিকশা কিংবা নৌকায় সেই মোটর লাগিয়ে নেওয়া হয়। অন্য যন্ত্রাংশও বিক্রি হয়ে যায়। নগর পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, মোটর সাইকেল চোর চক্র ধরাও পড়ছে। আসামিও ধরা পড়ছে। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে গুরুতাবপূর্ণ তথ্য মিলছে।
নগর পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. হাবিবুর রহমান প্রামাণিক জানান, গত ১২ অক্টোবর সিআরবি কাঠের বাংলো এলাকা থেকে মোটর সাইকেল চোর চক্রের সদস্য মো. সুমনকে (৩০) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চারজন আসামিসহ ছয়টি মোটর সাইকেল উদ্ধার করা হয়। আসামিদের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৭ অক্টোবর আরও দুটিসহ গত এক সপ্তাহে ২০টি চোরাই মোটর সাইকেল উদ্ধারের পাশাপাশি চোর চক্রের আরেক সদস্য মো. ইমরান হোসেনকে (২৮) গ্রেপ্তার করা হয়।
ইমরানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের জোরারগঞ্জ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও চারটি মোটর সাইকেল উদ্ধার করে পুলিশ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যাপাচি আরটিআর ১৫০ সিসি, হিরো হোন্ডা হর্নেট ১৫০ সিসি, হিরো হোন্ডা হাঙ্ক ১৫০ সিসি ও জিক্সার মনোটন ১৫০ সিসির একটি করে মোটর সাইকেল। এ ছাড়া নোয়াখালীর চরজব্বর থানা এলাকা থেকে কোতোয়ালী থানার একটি চুরি মামলার গ্ল্যামার ১১৫ সিসির একটি মোটর সাইকেল এবং চট্টগ্রামের মীরসরাই থানা এলাকা থেকে বাজাজ পালসার ১৫০ সিসির আরেকটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের তথ্য মতে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে পরিচালিত একাধিক অভিযানে ২০টি চোরাই মোটর সাইকেল উদ্ধার করেছে পুলিশ। মামলার তদন্তকারীদের দাবি, গ্রেপ্তার ইমরান হোসেনের বিরুদ্ধে জোরারগঞ্জ থানায় ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট দায়ের করা একটি চুরির মামলাও আদালতে বিচারাধীন।গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা
আন্তঃজেলা মোটর সাইকেল চোর চক্রের সঙ্গে জড়িত। দলের প্রধান আবদুর রহমান। চট্টগ্রামের বিভিন্ন মার্কেট, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও বাসা বাড়ি থেকে মোটর সাইকেল চুরি করে নোয়াখালীর সুধারাম থানা এলাকায় জড়ো করে রাখতো চক্রটি। ২ মিনিটের মধ্যে হাওয়া করে একটি মোটর সাইকেল। চোরাই মোটর সাইকেল সীমান্তে পাচারকারীদের হাতেও তুলে দিত চক্রটি। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম নগরে আস্তানা বেঁধে রয়েছে চক্রটি। নানা থানা এলাকা থেকে চুরি যাওয়া আরও অনেক মোটরসাইকেল তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে মিলবে বলে মনে করছে পুলিশ।
সিএমপির সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ জানান, ধৃত চক্রটি বিভিন্ন স্থান থেকে মোটর সাইকেল চুরি করে নিজেদের হেফাজতে রাখতেন। গ্রেপ্তার আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে চুরি ও বিশেষক্ষমতা আইনে চারটি মামলা, শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ বিভিন্ন আইনে দুটি মামলা রয়েছে।’