ফোডেনের হ্যাটট্রিকে হালান্ডকে ছাড়াই ইতিহাদে সিটির নীরব জয়

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৪ এএম

মাঠের চারপাশে বিশাল বিশাল ফাঁকা আসন আর গ্যালারির অস্বাভাবিক নীরবতা, ইতিহাদ স্টেডিয়ামের পরিবেশটা চ্যাম্পিয়নস লিগের কোনো রাতের মতো মনে হচ্ছিল না। আর্থিক অনিয়মের শাস্তির খাঁড়া ও টানা ম্যাচের ক্লান্তিতে সমর্থকরা মুখ ফিরিয়ে নিলেও মাঠের ফুটবলটা থমকে থাকেনি। আর্লিং হালান্ডকে বেঞ্চে বসিয়ে রেখে ফিল ফোডেনের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ও হ্যাটট্রিকে এইকে এথেন্সকে ৫-১ গোলের বড় ব্যবধানে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি।

পিএসজির কাছে হেরে পথ হারানো সিটিকে আবার জয়ের সরণিতে ফেরাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন ফোডেন। সঙ্গে এলিয়ট অ্যান্ডারসন ও রায়ান শেরকির লক্ষ্যভেদ ইতিহাদের গ্যালারির বিষাদ ভুলিয়ে এনে দেয় সহজ এক জয়।

দীর্ঘ ১০ মাসের গোলখরা আর লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা সামলে ধীরে ধীরে নিজের পুরনো ছন্দে ফিরছেন ফোডেন। হালান্ডের জায়গায় ‘ফ্লস নাইন’ ভূমিকায় খেলে প্রথমার্ধে রিকো লিউইসের পাস থেকে প্রথম গোল করার পর দ্বিতীয়ার্ধের বক্সে দুর্দান্ত দূরপাল্লার শটে ও পরবর্তীতে অভিষিক্ত রিয়ান ম্যাকাডুর ক্রস থেকে নিজের চমৎকার হ্যাটট্রিক সম্পন্ন করেন এই ইংলিশ ফরোয়ার্ড।

ম্যাচের শুরু থেকেই ইতিহাদ স্টেডিয়ামে আক্রমণের পশরা সাজায় সিটি। খেলার ১২ মিনিটের মাথায় এনজো ফার্নান্দেজের নেওয়া একটি ফ্রি-কিক ক্রসবারে লেগে ফিরে এলে ফিরতি বলে দারুণ শটে গোল করে সিটিকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন অ্যান্ডারসন। শুরুর ধাক্কা সামলে বিরতির আগে বেশ কিছুক্ষণ প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করে এইকে এথেন্স। তবে ৩৯ মিনিটে ডানপ্রান্ত থেকে রিকো লিউইসের চমৎকার পাসের নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ব্যবধান ২-০ করেন ফোডেন। যদিও দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ৫৩ মিনিটে স্টেভ্রোস পিলিওস ফাঁকা বল পেয়ে দূরপাল্লার শটে গোল করে গ্রিক ক্লাবটির হয়ে এক গোল শোধ করেন।

তবে সমর্থকদের কামব্যাকের আশা বেশিক্ষণ টিকতে দেয়নি সিটি। মাত্র পাঁচ মিনিট পরই, অর্থাৎ ৫৮ মিনিটে বক্সে চোখধাঁধানো এক ট্রিক বানিয়ে চমৎকার ফিনিশিংয়ে বল জালে জড়িয়ে ব্যবধান ৩-১ করেন ফরাসি ফরোয়ার্ড শেরকি। এরপর শুরু হয় ফোডেনের রাজত্ব। ৬৯ মিনিটে শেরকিরই বাড়ানো দূরপাল্লার বল রিকো লিউইস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাড়ালে বক্সের প্রান্ত থেকে দুর্দান্ত এক প্রথম ছোঁয়ার শটে টপ কর্নার দিয়ে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন ফোডেন। এরপর ৭৭ মিনিটে বদলি নামা অ্যাকাডেমি সতীর্থ রায়েন ম্যাকাডুর নিখুঁত ক্রস থেকে নিপুণ স্পর্শে দলের পঞ্চম এবং নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা হ্যাটট্রিকটি পূর্ণ করেন ২৫ বছর বয়সী এই ইংলিশ তারকা।

নিজের সেরা ফর্মে ফেরা এবং ম্যাচে ভিন্ন ভূমিকায় খেলা নিয়ে টিএনটি স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফিল ফোডেন বলেন, ‘ধীরে ধীরে হলেও আমি সেরা রূপে ফিরছি। এখনও অনেক দীর্ঘ পথ বাকি, তবে আমি সঠিক পথেই আছি। পথচলায় গোল পাওয়াটা অবশ্যই সাহায্য করে। আমি পরিশ্রম করে যেতে চাই এবং কোচ ও দলের জন্য সেরাটা দিতে চাই। আজ যখন ফলস ৯ ভূমিকায় বদলি হয়ে খেললাম, মুহূর্তটি আমি দারুণ উপভোগ করেছি।’ 

ফোডেনের এমন বিধ্বংসী রূপে ফেরার রাতটি ছিল সিটির ডাগআউটে থাকা এনজো মারেস্কার জন্য স্বস্তির। হালান্ডকে বিশ্রাম দিয়ে ১৭ বছর বয়সী অ্যাকাডেমি গ্র্যাজুয়েট ফ্লয়েড সাম্বাকে একাদশে নামানোর যে ঝুঁকি মারেস্কা নিয়েছিলেন, তা ফোডেন ও চেরকিদের কল্যাণে শতভাগ সফল হয়।

ফোডেনের পারফরম্যান্স ও মানসিকতা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে সিটি কোচ মারেস্কা বলেন, ‘প্রথম দিন থেকেই আমি তাকে সেরা ইংলিশ খেলোয়াড়দের একজন মনে করি। গত দুই-তিন বছরে বিভিন্ন কারণে সে নিজের সেরাটা দিতে পারেনি, কিন্তু আমি জানি সে কতটা মানসম্পন্ন। আমরা শুধু তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি, কারণ আমরা নিশ্চিত যে চলতি মৌসুমে সে আমাদের অনেক দূর নিয়ে যাবে।’ 

ইতিহাসে গ্যালারিতে এদিন ছিল এক অদ্ভুত শূন্যতা, ছবি: সংগৃহীত

তবে ইতিহাদে ৬১ হাজার দর্শকধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন আনুষ্ঠানিকভাবে মাত্র ৪০,০৪২ জন দর্শক, যা চলতি মৌসুমে সিটির দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। ঘরের মাঠে এমন খাঁ খাঁ গ্যালারি নিয়েও অবশ্য ক্ষোভ প্রকাশ করেননি সিটির নতুন কোচ।

ফাঁকা গ্যালারি ও সমর্থকদের উপস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে মারেস্কা আরও যোগ করেন, ‘আমার মনে হয় যারা মাঠে এসেছিলেন, তারা চমৎকার ছিলেন। ব্রাইটনের বিপক্ষে আগামী সপ্তাহে আমাদের ঘরের মাঠে দুটি ম্যাচ আছে, আমার কোনো সন্দেহ নেই যে তখন স্টেডিয়ামের পরিবেশ আবার সেরা রূপেই থাকবে।’ 

অন্যদিকে মাঠের ভেতরে সিটির গোলবন্যা আর গ্যালারির নিস্তব্ধতার মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন এইকে এথেন্সের গ্রিক সমর্থকেরা। গ্রিক ক্লাবটি ৫টি গোল হজম করলেও গ্যালারির এক কোণায় থাকা তাদের সমর্থকেরা ম্যাচ শুরুর দুই ঘণ্টা আগে থেকেই গান গেয়ে পুরো পরিবেশ তৈরি করে রেখেছিলেন।

নিজের দলের ভক্তদের এই আত্মনিবেদনে মুগ্ধ হয়ে ম্যাচ শেষে এথেন্সের কোচ মার্কো নিকোলিচ বলেন, ‘আমাদের সমর্থকেরা সত্যি অসাধারণ। স্বাগতিকদের গ্যালারির উপস্থিতি নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না, এটি তাদের বিষয়। বড় হারের পরও কীভাবে তারা দলকে অভিবাদন জানিয়েছে, তা সত্যি প্রশংসনীয়। পরবর্তীতে ওদের জন্য আমাদের আরও সাহসী ফুটবল উপহার দেওয়া দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত