অরাজনৈতিক সংগঠন দাবি করে আসা হেফাজতে ইসলামের মধ্যস্থতায় কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামি দলের জোট গঠন করা হয়েছে। জোটে থাকা দলগুলোকে সরকার ও বিরোধী জোট ছাড়ার চাপও দিয়েছেন হেফাজত নেতারা। তবে দলগুলো জোট ছাড়তে রাজি হয়নি।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে হেফাজতের মহাসচিব সাজিদুর রহমানের সভাপতিত্বে সাতটি দলের নেতাদের অংশগ্রহণে এক বৈঠকে ‘সমমনা ইসলামি দলসমূহ’ নামে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ সাতটি দল হচ্ছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট (রাজী), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন।
এর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি (ইজহার) বর্তমানে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক। আর জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে রয়েছে। দল তিনটি তাদের আগের জোটের পাশাপাশি সমমনা জোটেও থাকবে।
আলাপকালে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো জোটের অনেক কাজ বাকি। এটা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হবে না কি অরাজনৈতিক হবে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আগামী ডিসেম্বর মাসে একটি বৈঠক হওয়ার কথা, সেখানে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। অনেক আগে ‘সমসমনা ইসলামি দলসমূহ’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম ছিল। আমার দেশ ও জাতির স্বার্থে আবারও ঐক্যবদ্ধ হয়েছি।
১১ দলীয় ঐক্য জোটে থাকা না থাকা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদেরকে শর্ত দিয়েছিল ১১ দলীয় জোট ছাড়ার। কিন্তু আমরা সেই শর্তে রাজি হইনি। আমার ১১ দলীয় জোটে আছি।
এদিকে, গতকালের বৈঠকে সাতটি দলের তিনজন করে ২১ জন ও হেফাজতে ইসলামের তিন নেতা উপস্থিত ছিলেন। রাজধানীর খিলগাঁওয়ে মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে এসব তথ্য জানান বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন। তিনি বলেন, হেফাজতে ইসলামের সহযোগিতায় আমরা সাতটি দল সমমনা ইসলামি দলসমূহের ব্যানারে একত্রিত হয়েছি। আমাদের জোটের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা হওয়া পর্যন্ত হেফাজতের নেতৃত্ব আমাদের সহযোগিতা করবেন। আমরা রাজনৈতিকভাবে ওই জোটগুলোয় থাকব। আর সামগ্রিক পরিস্থিতি, ইসলামবিরোধী তৎপরতা নিয়ে আমরা এই জোট থাকব। স্থানীয় নির্বাচনেও সমমনা দলসমূহের ব্যানারেও সক্রিয় থাকতে পারি। বৈঠকে সাতটি দলের প্রতিটির তিনজন করে সদস্য নিয়ে ২১ জনের একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠিত হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কওমি ঘরানার বিভিন্ন দল একাধিক জোটে যায়। তারা পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়। শুরুতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে ইসলামী আন্দোলন থাকলেও নির্বাচনের আগ মুহূর্তে তারা জোট থেকে বের হয়ে যায়। খেলাফত মজলিস নির্বাচনের পর জোট থেকে বের হয়ে যায়। অন্যদেরও এই জোট ছাড়তে হেফাজতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহর আহ্বানে গত ১৬ জুলাই ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামি দলের নেতারা ‘নীতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ’ হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। এরপর গত ২৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতেই লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করে সাত দল। সেদিন জানানো হয়েছিল, লিয়াজোঁ কমিটির সদস্যরা ঢাকায় ২২ অক্টোবর বৈঠক করে ঐক্যের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতৃত্বের তত্ত্বাবধানে কওমি মাদ্রাসাগুলোর দলগুলোর একটি ঐক্যপ্রচেষ্টা চলছিল। এরই অংশ হিসেবে সাতটি দলের একটি ব্যানার হয়েছে।
অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজত রাজনৈতিক জোটের রূপরেখা তৈরি করে দিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হেফাজত রূপরেখা দেয়নি। পরামর্শক হিসেবে মুরব্বির মতো ভূমিকা পালন করেছে। অন্য জোটে থাকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আস্তে আস্তে তারা ফিরে আসার চেষ্টা করবে। এখনো সরাসরি ফিরে আসবে বলে কেউ নিশ্চিত করেনি। তবে পরোক্ষভাবে মনে হয়েছে তারা ইতিবাচক। হেফাজতে ইসলাম কওমি অঙ্গনের দলগুলোকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে মাত্র।
বৈঠকে অংশ নেওয়া অন্যদের মধ্যে জমিয়তের সহ-সভাপতি জুনায়েদ আল হাবীব, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বাহাউদ্দীন জাকারিয়া, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির সাখাওয়াত হোসেন ও আহমদ আলী, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আব্দুল কাদির ও মহাসচিব সাখাওয়াত হোসেন রাজী এবং হেফাজতের নায়েবে আমির আবদুল আউয়াল ও আইয়ুব বাবুনগরী উপস্থিত ছিলেন।