রাজধানীর বিভিন্ন ক্লাব, ফ্ল্যাট-বাসা ও ভার্চুয়াল জগতে আবারও বিস্তার ঘটেছে অবৈধ ক্যাসিনো ও জুয়ার। ২০১৯ সালের শেষভাগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের দীর্ঘ বিরতির পর পুরনো ও নতুন সিন্ডিকেটগুলো কৌশলে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সেই রেশ না কাটতেই জুয়ার আসর, অবৈধ অর্থের লেনদেন, প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে আলোচিত হচ্ছে। ক্যাসিনোর পাশাপাশি নতুন করে যোগ হয়েছে মোবাইলঅ্যাপ ও ওয়েবসাইটভিত্তিক ‘ডিজিটাল জুয়া’র বিষয়টিও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে পর্দার আড়ালে চলছে প্রতিদিন শতকোটি টাকার অবৈধ কারবার। এতে নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষ। জুয়ার টাকা বিদেশেও পাচার হচ্ছে।
পুলিশসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০১৯ সালে রাজধানীসহ দেশজুড়ে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে তোলপাড় চলে। নিষিদ্ধ সংগঠন যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও খালিদ হোসেনের নেতৃত্বে ক্যাসিনো কারবার চালানো হয়। বিশেষ করে ঢাকার ক্লাবপাড়ায় এসব অপকর্ম হয়ে আসছিল দীর্ঘদিন ধরেই। আওয়ামী লীগের আমলে মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় এক সময় ওয়ান টেন ও থ্রি কার্ডের মতো জুয়া চলত। তখন যুবলীগের শীর্ষ নেতাদের নিয়ন্ত্রণেই মূলত ঢাকার বিভিন্ন ক্লাব ও ভবনে বিদেশের আদলে অবৈধ ক্যাসিনো গড়ে উঠতে থাকে। আর এ খাত থেকে প্রতিদিন ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং কিছু গণমাধ্যম কর্মীর নাম করে মোটা অঙ্কের চাঁদা উঠানো হতো। এখনো কেউ কেউ ক্যাসিনোসহ জুয়ার আসর বসিয়ে অর্থ কামাচ্ছে বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
শতকোটি টাকার রমরমা বাণিজ্য : বিভিন্ন ক্লাবপাড়া, অভিজাত এলাকার ফ্ল্যাট ও আবাসিক ভবনে নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে তৈরি করা হয়েছে জুয়ার আস্তানা। তবে আগের চেয়ে বর্তমান সিন্ডিকেট প্রযুক্তিনির্ভর অপকর্ম চালাচ্ছে। বিশেষ করে টেবিল ক্যাসিনোর পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পোর্টস বেটিং ও ভার্চুয়াল ক্যাসিনো খেলা হচ্ছে। জুয়ার টেবিল পরিচালনায় দেশীয়দের পাশাপাশি থাইল্যান্ড, নেপাল ও মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞ কারবারদেরও আনাগোনা আছে বাংলাদেশে। তা ছাড়া অনলাইন জুয়ার নিয়ন্ত্রণ বা প্রধান সার্ভার চালানো হচ্ছে চীন, নেপাল বা নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলো থেকে। এজেন্ট ও হুন্ডি চক্র মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে প্রতিদিন শতকোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে।
জুয়ায় নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ : ক্যাসিনো ও অনলাইনের এই মরণনেশায় তরুণ সমাজ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বেশি আসক্ত। জুয়ার অর্থ জোগাতে গিয়ে বহু পরিবার হচ্ছে সর্বস্বান্ত। এমনকি অনলাইন জুয়ার ঋণের টাকা মেটাতে না পেরে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে। সহজেই দ্রুত ধনী হওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হচ্ছে। এই ফাঁদে পড়ে জমানো মূলধন, জমিজমাসহ সহায়-সম্বল হারিয়ে রাস্তায় বসছেন অনেকে।
মামলার তদন্তে কচ্ছপ গতি : ২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী ঝটিকা অভিযানের পর যুবলীগ নেতা সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, জি কে শামীম ও সেলিম প্রধানসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছিল। চাঞ্চল্যকর এসব মামলায় প্রভাবশালী ঠিকাদার ও ক্লাব কর্তারা গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই মামলাগুলোর অগ্রগতি নেই বললেই চলে। বহু মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারছে না পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায়। তা ছাড়া আসামিদের অনেকেই জামিন নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছেন। অনেকেই পরবর্তী সময় রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে নিজেদের পুনর্বাসিত করার চেষ্টা করছেন। দীর্ঘ সময় ধরে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় জনমনে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। আবার কোনো মামলার তদন্ত দীর্ঘায়িত হলে অপরাধলব্ধ অর্থ শনাক্ত করা, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদের প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণও কঠিন হচ্ছে।
হুন্ডি ও অর্থ পাচারের নতুন রুট : ক্যাসিনো ও জুয়ার কালো টাকা শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। অর্থ পাচারের অন্যতম বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে জুয়া। জুয়ার আসর থেকে উপার্জিত বিপুল পরিমাণ অর্থ হুন্ডি, বাইনান্স ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে চলে যাচ্ছে দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এটি বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বিরাট বড় ধস নামাচ্ছে। পুলিশের একটি গোপন বার্তা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তদন্তে উঠে এসেছে, বিপুল পরিমাণ মুদ্রা দেশ থেকে অবৈধভাবে বের হয়ে যাওয়ায় জাতীয় অর্থনীতি ও রিজার্ভের ওপর প্রভাব পড়ছে।
নজরদারি ও সাইবার ট্র্যাকিং : এসআরবি, ডিবি ও সিআইডির সাইবার ইউনিট রাজধানীর স্পোর্টস ক্লাব, সন্দেহভাজন ফ্ল্যাট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে নজরদারি জোরদার করেছে। অবৈধ জুয়ার অ্যাপ ও শত শত ওয়েবসাইট বন্ধের জন্য টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে তালিকা পাঠানো হচ্ছে। পুরনো ১৮৬৭ সালের ‘পাবলিক গ্যাম্বিং অ্যাক্ট’ ডিজিটাল ক্যাসিনো দমনে অকার্যকর থাকায় সরকার অনলাইন জুয়া, বেটিং ও অর্থ পাচার রোধে নতুনভাবে কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে। এই প্রসঙ্গে পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্যাসিনো সংক্রান্ত পূর্বে দায়ের হওয়া আলোচিত মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করা হবে। ইতিমধ্যে বিশেষ নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টগুলোর অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ক্যাসিনো বা জুয়ার দেশের আইনশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও সামাজিক নৈতিকতার জন্য চরম হুমকি।
ক্যাসিনোর অর্থে বিশাল অট্টালিকা : পুলিশের একটি বিশেষ নোটে বলা হয়েছে, ক্যাসিনো ও জুয়ার অর্থ পাচার হয়েছে সিঙ্গাপুরে। এখনো তা অব্যাহত আছে। সিঙ্গাপুরের বুগিছ, ল্যাস্তা, উত্তমপার্ক, সিটিহল, রাফেল প্লেস, তোয়াজ লিং, চাংগী ও মোস্তফা সেন্টারসহ আশপাশ এলাকায় বাংলাদেশিদের আনাগোনা বেশি। অনেক বাংলাদেশির ফ্ল্যাট-বাড়ি রয়েছে। কারও কারও আছে ব্যবসায়িক কোম্পানিও। অঢেল সম্পদের মালিক সাবেক কাউন্সিলর মোমিনুল হক সাঈদ বর্তমানে পরিবার নিয়ে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন। ২০১৫ সালে ক্যাসিনোর বিপ্লব ঘটে যুবলীগ নেতা সম্রাটের হাত ধরে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে তারা জুয়া খেলতে সিঙ্গাপুর যাওয়া শুরু করেন। ওই সময় সম্রাট ও সাঈদের পরিচয় হয় ক্যাসিনো পরিচালনায় অভিজ্ঞ কয়েকজন নেপালি নাগরিকের সঙ্গে। এখনো নেপালিরা ছদ্মবেশে বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করছে।
ক্যাসিনো ও জুয়ায় যারা সক্রিয় : পুলিশের তথ্যানুযায়ী, ওমর ফারুক ওরফে কানা ফারুক, টিটু, বান্ডিল সেলিম, মোল্লা হাসান, শুটার আমিনুল, সাবেক কাউন্সিলর গোলাম আশরাফ তালুকদার, শহীদ রেজা বাচ্চু, কদ্দুস মকদম ওরফে ফেন্সিডিল মকদম, সানী, মাহবুবুল হক হিরক, শুটার আমিনুল, নেপালি নাগরিক বিনোদ মানাসী, দীনেশ, ছোট রাজকুমার, বড় রাজকুমার, অজয় পারকাল, হিলমি ও কৃষ্ণা, জুয়ারি সেন্টু, দীনেশ, রাজকুমার, অজয় পাকরাল, তছলিম, জসিম উদ্দিন, এটিএম গোলাম কিবরিয়া, প্রদীপ, আওয়াল পাটোয়ারি, কাশেম, মোবাশ্বের, আলী হোসেন প্রমুখ। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্যাসিনো থেকে যারা নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন তাদের তালিকা করা হচ্ছে। তারা যেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারেন সেই জন্য বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় সতর্কবার্তা জারি করা আছে।
নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী : পুলিশ সূত্র জানায়, নতুন করে ক্যাসিনো ঝড়ের শঙ্কা দেখা দেওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গোয়েদা সংস্থাগুলো রাজধানীর বিভিন্ন ক্লাবপাড়া ও সন্দেহভাজন স্থানগুলোতে বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে। ঢাকা মহানগরীসহ দেশের বড় বড় শহরের ক্লাবগুলোতে যেকোনো ধরনের অবৈধ জুয়া বা ইনডোর গেমের নামে ক্যাসিনো বাণিজ্য রোধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ফ্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিদেশে পাচারের অভিযোগে সিআইডি গত ৩০ সেপ্টেম্বর স্নিগ্ধ সিকদার নামে একজনকে বেনাপোল স্থলবন্দর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। একাধিক অনলাইন জুয়া সাইটের পরিচালনা ও এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন তিনি। এ ছাড়া অনলাইন জুয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১২ জুলাই নড়াইল থেকে জসিম উদ্দিন ও সুমন রায় নামে দুজনকে; গত ৭ জুন টাঙ্গাইল থেকে মো. সোলায়মান, মো. সাগর মিয়া ও জুয়েল রানা; গত ১৬ জুন নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে রায়হান খান, পাভেল রহমান, ও আবু জোবায়ের সানি এবং ১৯ আগস্ট রাজশাহীর চন্দ্রিমা থানার পদ্মা আবাসিক এলাকা থেকে সৈয়দ জামান ও রুহুল কুদ্দুস ওরফে বাপ্পী এবং গত ১৩ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাবলু মিয়া, মনির হোসেন, নূর সাফায়েত ইপ্তি ও শামীম আল মামুনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।
আরমান ও জাকিরকে খুঁজছে পুলিশ : সম্রাট ও খালিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ক্যাসিনো থেকে চাঁদা তোলা কাকরাইলের বিপাশা হোটেলের বয় জাকির হোসেন ও গুলিস্তানের হকার আরমানকে খুঁজছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা গা-ঢাকা দিলেও এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে চলছে এসব অপকর্ম। জামিনে মুক্ত হয়ে তারা এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
১০ বছর কারাদন্ড ও ৫ কোটি টাকা জরিমানা : দেশে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ লেনদেন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পরিচালিত জুয়ার বিস্তার রোধে যুগোপযোগী নতুন আইন প্রণয়ন করেছে সরকার। প্রায় ১৫৯ বছর আগে প্রণীত আইন রহিত করে জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ নামে নতুন আইন কার্যকর করা হয়েছে। নতুন আইনে প্রথমবারের মতো অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল বেটিং, ফ্যান্টাসি বেটিং, ই-স্পোর্টস বেটিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ম্যাচ ফিক্সিং এবং স্পট ফিক্সিংয়ের মতো ডিজিটাল অপরাধের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে এসব কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী জুয়া পরিচালনার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদন্ড এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে সংঘবদ্ধভাবে অথবা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদন্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে।