নির্বাচনে কিশোর গ্যাং নিয়ে উদ্বিগ্ন পুলিশ

কিশোর গ্যাংগুলোর দ্বন্দ্বে খুনের ঘটনা সারা দেশেই আলোচিত। রাজধানীর উত্তরায় গত বছর গ্যাং দ্বন্দ্বে এক কিশোর খুন হওয়ার পর সন্তানের অপরাধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন অভিভাবকরা। এমন প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এই গ্যাংগুলোর বড় অংশ প্রকাশ্য তৎপরতা বন্ধ করে দিলেও কৌশল পাল্টে সক্রিয় রয়েছে কয়েকটি দল। নির্বাচনকে সামনে রেখে পুলিশের চিন্তার কারণ হয়েছে এই গ্যাংগুলো। সম্প্রতি ঢাকায় এক সভায় সব রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ও পুলিশ সুপারদের (এসপি) কিশোর গ্যাংদের নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাবেদ পাটোয়ারী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে থেকে কিশোর অপরাধীরা নির্বাচনে অস্ত্র ব্যবহার করে ভোটারদের হুমকি দিতে পারে।  ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ক্রাইম অ্যানালাইসিস (অপরাধ বিশ্লেষণ) বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, রাজধানী ও আশপাশে কিশোর-তরুণদের ৩৫টি দল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো ‘নয়ন গ্রুপ’, ‘হৃদয় গ্রুপ’, ‘মিশন গ্রুপ’, ‘নাইন এম এম’, ‘একে ৪৭ ’, ‘ফাইভ স্টার’, ‘ডিসকো বয়েজ’।

ডিএমপির উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমান জানান, কিশোররা যাতে নির্বাচনে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অংশ নিতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক পুলিশ। পুলিশের আরেক কর্মকর্তা জানান, রাজধানীর উত্তরায় পাঁচটি, ধানমন্ডিতে তিনটি, তেজগাঁওয়ে দুটি এবং কাফরুল, মোহাম্মদপুর, তুরাগ, নিউমার্কেট, কাঁঠালবাগান, হাতিরপুল, যাত্রাবাড়ী, কেরানীগঞ্জ, শাহজাহানপুর, খিলগাঁও এলাকায় একটি করে দল সক্রিয়। প্রতিটি দলে ১০ থেকে ১৫ অপরাধী রয়েছে।

কাফরুলের ইব্রাহিমপুর এলাকার কিশোর অপরাধীদের অন্যতম নয়ন গ্রুপ। এই দলে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও ছাত্র রয়েছে। দলের প্রধান বাবু ও সহযোগী নয়ন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত। স্থানীয় একজন জানান, তারা দলবদ্ধভাবে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে, মাদক সেবন ও বিক্রি করে। ভোটের সময়ে তারা রাজনৈতিক দলের পক্ষ নিয়ে কাজ করছে। তবে দলটির প্রধান নয়ন ও সহযোগী বাবুর দাবি, প্রতিপক্ষের লোকজন কুৎসা রটাচ্ছে।

হাতিরপুল এলাকায় সক্রিয় হৃদয় গ্রুপ নামের কিশোরদের একটি দল। তাদের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হোসেন হায়দার বলেন, পুলিশি তৎপরতায় তারা এখন ‘ভালো ছেলে’।

কলাবাগান থানার ওসি ইয়াসির আরাফাত বলেন, কিশোর ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান চলছে। কিশোরদের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নিউমার্কেট ও এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় কাজ করে কিশোরদের দল ‘মিশন গ্রুপ’। এই দলে ঢাকা কলেজের ছাত্র হারুনুর রশিদ খান ও মইনুল ইসলাম, আইডিয়াল কলেজের জাহিদ রয়েছে।

রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় ‘নাইন এম এম’, ‘একে ৪৭’ ও ‘ফাইভ স্টার’ নামে তিনটি কিশোর দল সক্রিয়। সম্প্রতি তাদের বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ধানমন্ডির ৯/এ এলাকায় নাইন এম এম গ্রুপ সক্রিয়। তাদের দলনেতা ইসমাইল হোসেন। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সহসভাপতি। ধানমন্ডি ৭/এ এলাকায় থাকা ‘একে ৪৭’ গ্রুপের নেতৃত্ব দেন মুকুল শিকদার। তিনি ধানমন্ডি থানা ছাত্রলীগের সহসভাপতি বলে পুলিশের কাছে তথ্য এসেছে। আর ফাইভ স্টার গ্রুপের কার্যক্রম রবীন্দ্র সরোবর ও আশপাশের এলাকায়। দলটির প্রধান ইট্টু ওরফে ইন্তু ধানমন্ডি থানা ছাত্রলীগের কর্মী।

এই গ্রুপগুলোর একটির নেতা মুকুল শিকদার বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে তার বিরুদ্ধে এসব ‘মিথ্যা’ ছড়ানো হচ্ছে।  তুরাগ থানা এলাকায় ১৫ জনের একটি দল সক্রিয়। পুলিশের খাতায় তাদের নাম ‘তালাচাবি গ্রুপ’। তাদের বিষয়ে তুরাগ থানার ওসি নূরুল মোত্তাকিন জানান, তিনি থানার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব দলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছেন।

উত্তরায় ‘পাওয়ার বয়েজ’, ডিসকো বয়েজ, ‘বিগ বস’, ‘নাইন স্টার’, ‘নাইন এম এম বয়েজ’সহ বেশ কয়েকটি দল রয়েছে। এসব দলের মধ্যে ‘ডিসকো বয়েজ’ ও ‘বিগ বস’ দ্বন্দ্বে গত বছরের জানুয়ারিতে খুন হয় স্কুলছাত্র আদনান কবীর। একই বছরের ১৮ জানুয়ারি তেজকুনিপাড়ায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে প্রাণ হারায় আবদুল আজিজ নামের এক কিশোর। চলতি বছরের ৩১ আগস্ট মেহেদী নামের একজন নিহত হয় কিশোর অপরাধীদের হাতে।