ইন্দোনেশিয়ার সুন্দা প্রণালীর উপকূলে সুনামির আঘাতে ২২০ জনের বেশি মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবারের এ ঘটনায় অন্তত ৮৪৩ জনের বেশি আহত হয়েছে বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছে; শত শত ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। সুনামির কারণ হিসেবে ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের উদ্গিরণের ফলে সমুদ্রতলে সৃষ্ট ভূমিধসের কথা বলা হচ্ছে।
দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার মুখপাত্র সুতোপো পুরবো নুগরোহোর উদ্ধৃতি দিয়ে এএফপির খবরে বলা হয়, স্থানীয় সময় শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে সুনামি আঘাত হানে। অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে জীবিতদের জন্য অনুসন্ধান চালাচ্ছে। সুনামিতে মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। উদ্ধারকর্মীরা দুর্গত এলাকা থেকে লোকজনকে সরিয়ে নিচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ান জিওফিজিক্যাল এজেন্সি (বিএমকেজি) বলছে, এই সুনামির সৃষ্টি হয়েছে ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সাগরতলে ভূমিধসের কারণে। এর সঙ্গে পূর্ণিমার প্রভাব যুক্ত হয়ে বিপুল শক্তি নিয়ে সৈকতে আছড়ে পড়েছে সুনামির ঢেউ। অধিকাংশ মৃত্যুর খবর এসেছে ইন্দোনেশিয়ার পান্দেগলাং, দক্ষিণ লামপাং ও সেরাং এলাকা থেকে। জাভা ও সুমাত্রা দ্বীপের মাঝখানে এই সুন্দা প্রণালীই জাভা সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
সুন্দা প্রণালীর ব্যানটেন প্রদেশে পানির দেয়াল আঘাত আছড়ে পড়ে সৈকতমুখী হোটেল ও বাড়িঘর ভাসিয়ে দিয়ে যায়। তখন প্রাণ বাঁচাতে মানুষ রুদ্ধশ্বাসে ছুটছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য।
ট্যানজুং লেসাং বিচ রিসোর্টের ভীতিকর ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কয়েক ডজন পর্যটক ও স্থানীয়রা মিলে পপ ব্যান্ড সেভেনটিনের পরিবেশনা দেখছিল। তখন হঠাৎ ঢেউ এসে মঞ্চ বিধ্বস্ত করে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শী নরওয়ের আলোকচিত্রী ওইস্তেইন লুন্ড অ্যান্ডারসন বিবিসিকে বলেন, বিপুল জলরাশি যখন উঠে আসতে শুরু করে, তিনি তখন পশ্চিম জাভার আনিয়ার সৈকতে ছিলেন। ক্রাকাতোয়ার উদগিরণের ছবি তোলার চেষ্টায় ছিলেন তিনি। তখন তার পরিবারের সদস্যরা হোটেলে ঘুমাচ্ছিলেন। সন্ধ্যায় ওই আগ্নেয়গিরি লাভা উগরে দিলেও রাতে সবই ছিল বেশ শান্ত। এর মধ্যেই হঠাৎ সাগর থেকে বিশাল এক ঢেউ সৈকতে উঠে আসতে দেখে উল্টো ঘুরে দৌড়াতে শুরু করেন অ্যান্ডারসন।
তিনি বলেন, সুনামির দুটি ঢেউ পরপর উপকূলে আঘাত হানে। এর মধ্যে প্রথমটি ততটা জোরালো না থাকায় তিনি দৌড়ে হোটেলে ফিরতে পারেন। হোটেলে ফিরে স্ত্রী আর সন্তানকে জাগানোর পরপরই দ্বিতীয় ঢেউ আসার শব্দ পান অ্যান্ডারসন। জানালা দিয়ে তিনি দেখতে পান, ওই ঢেউ ছিল প্রথমটির তুলনায় অনেক বড়। সেই বিপুল জলরাশি যখন হোটেল পেরিয়ে যাচ্ছিল, রাস্তায় থাকা গাড়িগুলোকে ভাসিয়ে নিচ্ছিল। অ্যান্ডারসন ও হোটেলের সবাই আতঙ্কে কাছে একটি উঁচু জায়গায় জঙ্গলের মধ্যে সরে যান।
আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ জেস ফিনিক্সকে উদ্ধৃত করে বিবিসি বলছে, আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাতের সময় ফুটন্ত লাভার কারণে ভূগর্ভের তুলনামূলকভাবে শীতল শীলাস্তর ভেঙে ভূমিধসের সৃষ্টি হতে পারে। আর ক্রাকাতোয়ার একটি অংশ যেহেতু সাগরে নিমজ্জিত, সেখানে ভূমিধসের ফলে সুনামি সৃষ্টি হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সম্প্রচারিত নাটকীয় ভিডিওতে দেখা যায়, ‘সেভেনটিন’ নামে একটি পপ গ্রুপের উন্মুক্ত কনসার্টে হঠাৎ বিশাল ঢেউয়ের দেয়াল আছড়ে পড়ে ব্যান্ড সদস্যদের মঞ্চ থেকে ছিটকে ফেলে দিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ফ্রন্টম্যান রিফিয়ান ফাজারসায়াহ ইনস্টাগ্রামের এক পোস্টে লেখেন, ব্যান্ডের ব্যাসিস্ট ও রোড ম্যানেজার মারা গেছেন।
এএফপির খবরে বলা হয়, সুনামির পরে উপকূলীয় অঞ্চলের ছবিগুলোতে সৈকতজুড়ে উপড়ে যাওয়া গাছের সারি ও আবর্জনার স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যায়। ঢেউয়ের তোড়ে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া স্টিলের টিনের ছাদ আছড়ে পড়ে জাভার পশ্চিম উপকূলে জনপ্রিয় কারিতা সৈকতে।
সুনামির আঘাতের সময় কারিতা সৈকতে ছিল ১৫ বছরের কিশোর মুহাম্মদ বিনতাং। তার বর্ণনায়Ñ হঠাৎ পানির তোড় এসে সুপরিচিত এই পর্যটনকেন্দ্র অন্ধকারে ছেয়ে ফেলে। সে এএফপিকে বলেছে, ‘ছুটি কাটাতে আমরা ৯টায় সেখানে পৌঁছাই এবং হঠাৎ করেই পানি চলে আসেÑ অন্ধকার হয়ে যায়, বিদ্যুৎ চলে যায়। বাইরে জঞ্জালের স্তূপ, আমরা এখনো রাস্তায় নামতে পারছি না।’
এই প্রণালীর অপরদিকে ল্যামপুং প্রদেশের তরুণ লুৎফি আল রাসইদ এএফপিকে বলেন, জীবনের ভয়ে তিনি পালিয়ে কালিয়ান্দা সৈকতে যান। ‘আমার মোটরবাইক স্টার্ট নিচ্ছিল না। তাই আমি সেটা রেখেই দৌড় দিই। আমি প্রার্থনা করতে করতে যতদূরে পারি দৌড়াতে থাকি।’
আগ্নেয়দ্বীপ ক্রাকাতোয়ায় ১৮৮৩ সালে ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ওই সময়ও ১৩৫ ফুট উঁচু ঢেউ নিয়ে সৈকতে আঘাত হানে সুনামি, প্রায় ৩০ হাজার মানুষ সে সময় সাগরে ভেসে যায়। দীর্ঘদিন সুপ্ত থাকার পর সাম্প্রতিক সময়ে ক্রাকাতোয়া আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। গত শুক্রবার ওই আগ্নেয়গিরি থেকে প্রায় সোয়া দুই মিনিট উদগিরণ হয়। এর ফলে পর্বতের এক হাজার ৩০০ ফুট উঁচু পর্যন্ত ছাইয়ের মেঘ ছড়িয়ে পড়ে।
ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থানের কারণে ইন্দোনেশিয়ায় প্রায়ই ভূমিকম্প হয়। বিশ্বের সক্রিয় আগ্নেয়গিরিগুলোর অর্ধেকের বেশি রয়েছে যে এলাকায়, সেই ‘আগ্নেয় মেখলার’ মধ্যেই ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান। এর আগে সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরে ভূমিকম্প ও সুনামিতে ইন্দোনেশিয়ার পালু শহরের বালারোয়া ও পেতোবো এলাকায় অন্তত দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ২০০৪ সালে সুমাত্রা দ্বীপে শক্তিশালী ভূমিকম্প ও সুনামিতে ভারত মহাসাগরের উপকূলজুড়ে ১৪টি দেশের দুই লাখ ২৬ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।