একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজের ভোটটি দিতে না পারার আক্ষেপ ঝরেছে অনেকের কণ্ঠে। গতকাল রবিবার ভোট দিতে গিয়ে বাধাসহ নানা সমস্যার মুখে পড়েছেন তারা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ভোটাররা এমন অভিযোগ জানিয়েছেন। এসব ভোটারের মধ্যে কেন্দ্রে গিয়েও অনেকে ভোট দিতে পারেননি। কারণ, তাদের ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। আবার কাউকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ভোটার স্লিপ না পেয়েও ভোট দিতে পারেননি অনেকে। নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
ঢাকা-৭ আসনে লালবাগের রহমতুল্লাহ উচ্চ বালক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সুমাইয়া হাসান নামে এক তরুণী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি এবারই প্রথম ভোটার। জার্মানি থেকে ভোট দিতে এসেছি। কিন্তু আমাকে ও আমার আম্মুকে কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিলাম। ব্যর্থ হয়ে বাসায় ফিরে যাচ্ছি।’
ঢাকা-১২ আসনের ভোটার চাকরিজীবী জেসিকা জাহিন। এবারই প্রথম ভোট দিতে কেন্দ্রে গেলেও পারেননি। প্রিসাইডিং অফিসার জানিয়েছেন, তার সিরিয়াল নাম্বারে আরেক নারী ভোট দিয়ে চলে গেছেন।
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসনে ইভিএমে ভোটদানে বহিরাগতদের বাধার অভিযোগ করেন ভোটাররা। এখানে বেশিরভাগ কেন্দ্রে ইভিএম পাহারা দিচ্ছিল বহিরাগতরা। তাদের সামনেই ভোটারদের ব্যালটে সিল দিতে বাধ্য করা হয়। পোলিং ও প্রিসাইডিং অফিসাররা ছিলেন নিতান্ত অসহায়। গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে এ চিত্র চোখে পড়ে। ভোট দিতে গিয়ে এত তিক্ত অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গোলাম মোস্তফার। কখনো ভাবতে পারেননি, সন্তানের বয়সী কেউ তাকে বলবে, ‘ভোট দিলে দাও, নইলে বেরিয়ে যাও।’ নগরীর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোটার তিনি।
বরিশাল-৫ (সদর) আসনের বীণাপাণি কেন্দ্রের ভোটার মাহবুব আলম অভিযোগ করেছেন, কেউ তার ভোট আগেই দিয়ে ফেলেছে। একই কেন্দ্রের ভোটার অধ্যাপক শাহ আজিজুর রহমান বলেন, ‘আমি ভোট দিতে ব্যালট পেপার নিয়ে যাওয়ার সময় আওয়ামী লীগের কর্মীরা তা কেড়ে নিয়ে নৌকায় সিল দিয়েছে।’
সিলেট-১ (মহানগর-সদর) আসনে পাঠানটুলা জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রের প্রধান ফটকে দুপুর ২টার দিকে দেখা যায়, একজন ভোটার টোকেন হাতে নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলছেন। তিনি ভোট দেওয়ার জন্য ভেতরে যেতে চান, তবে দায়িত্বরত পুলিশ তার পথ আগলে বলছেন, ‘আর ভোট দেওয়া লাগবে না, ভোট শেষ।’ একই সঙ্গে ওই পুলিশ সদস্য তার সঙ্গীদের বলেন, কোনো ভোটারকে যেন আর ভেতরে ঢুকতে দেওয়া না হয়।
ঢাকা-১৯ (সাভার) আসনে সকাল সাড়ে ৮টায় কলকাকলী শিক্ষালয় কেন্দ্রে গেলেও ভোট দিতে পারেননি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রতন মিয়া। তিনি অভিযোগ করেন, ভোটার স্লিপ নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশের চেষ্টা করলে স্থানীয় যুবলীগের নেতাকর্মীরা তার হাত থেকে স্লিপ কেড়ে নেয় এবং ‘ভোট হয়ে গেছে’ জানিয়ে বাড়ি চলে যেতে বলে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ সবার সামনে এমন ঘটনা ঘটলেও কেউ ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ রতনের।
পৌর এলাকার জামসিং মহল্লার ভোটার জহির উদ্দিন জানান, ভোটকক্ষে কয়েক যুবক তার হাত থেকে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে নৌকা প্রতীকে সিল দেয়। তিনি বলেন, আমি নৌকায় ভোট দিতে গিয়েছিলাম, কিন্তু নিজের ভোট নিজে না দিতে পারায় কষ্ট পেয়েছি। সাভারের মজিদপুর মহল্লার সান ফ্লাওয়ার মডেল স্কুল কেন্দ্রের মূল ফটক লাগিয়ে রাখতে দেখা যায়। আশুলিয়ার ইয়ারপুর, ঘোষবাগ, নরসিংহপুর, জামগড়া এলাকায়ও একই চিত্র লক্ষ করা যায়। ভোটাররা বাধা পাওয়ায় দুপুর ১২টার মধ্যে ওই এলাকার কেন্দ্রগুলো ফাঁকা হয়ে যায়।
মুন্সীগঞ্জ-৩ (সদর-গজারিয়া) আসনে শহরের মুন্সীগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে নিজের ভোট দিতে না পারায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান শাহিদা বেগম। তিনি অভিযোগ করেন, সকাল ৯টার দিকে ভোটকেন্দ্রের গোপন কক্ষে ব্যালটে সিল দিতে গেলে নৌকা প্রতীকের এজেন্ট তা ছিনিয়ে নেয় এবং জোরপূর্বক নৌকা প্রতীকে সিল দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ক্ষুব্ধ শাহিদা এ সময় নৌকা প্রতীকের এজেন্টকে এমন আচরণের কারণ জানতে চান। ১০ মিনিট ধরে ঘটনার প্রতিবাদ জানান। তবে কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার হালিমা খাতুন এমন কিছু ঘটেনি বলে দাবি করেন।
ঢাকা-১৩ আসনে জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা ইমরান। এ কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট গ্রহণ চলছিল। কিন্তু ভোটার স্লিপ না পেয়ে তিনি ভোট দিতে পারেননি। পরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘সূক্ষ্মভাবে ভোট চুরি করতেই ইভিএমের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ এ আসনে বিএনপির এজেন্ট ছিলেন সুফিয়া। তিনি অভিযোগ করেন, তাকে সকালেই কেন্দ্র থেকে মারধর করে বের করে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘একজন নারী হয়েও মারধরের শিকার হওয়ায় আমি লজ্জিত। আমাকে ভোটও দিতে দেওয়া হয়নি।’
ঢাকা-৯ আসনভুক্ত পূর্ব বাসাবোর বাসিন্দা হাফসা শারমিন। দুপুর ১২টার সময় মা রহিমা আক্তারকে নিয়ে কদমতলা পূর্ব বাসাবো স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে যান। তাদের বাসায় কোনো প্রার্থীর পক্ষ থেকে ভোটার নম্বর ও কেন্দ্রের নামসংবলিত ভোটার স্লিপ পৌঁছানো হয়নি। জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে গেলে তাদের বলা হয় ভোটার স্লিপ লাগবে। কেন্দ্রের বাইরে নৌকা প্রার্থীর প্রতিনিধিরা তালিকা থেকে ভোটার নম্বর বের করে দিচ্ছিলেন। মা-মেয়ে তাদের কাছে ভোটার নম্বর চাইলে তারা দেওয়ার কথা বলে আধঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। পরে উপায় না পেয়ে মা-মেয়ে ভোট না দিয়েই চলে যান। ভোট দিতে না পেরে আক্ষেপ করে হাফসা বলেন, অনেক আশার ভোটটি দেওয়া হলো না। তাদের বাসার এক ভাড়াটিয়াও একই কারণে ভোট দিতে পারেননি বলে জানান তিনি।