‘এই নির্যাতন চূড়ান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র’

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে চার সন্তানের জননীর ধর্ষণের শিকার হওয়াকে মানবাধিকারের চূড়ান্ত লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। ঘটনার বিষয়ে কমিশনের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে এ কথা বলেন তিনি।

গত রবিবার অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের পরের দিন সুবর্ণচরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন এক নারী। নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই নারীর অভিযোগ, ধানের শীষে ভোট দেওয়ায় সুবর্ণচর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক পরিচয় দেওয়া রুহুল আমীনের ১০ থেকে ১২ জন সহযোগী তাকে ধর্ষণ করে। 

দেশজুড়ে আলোচিত ওই ঘটনার যথাযথ তদন্ত করা হবে জানিয়ে রিয়াজুল বলেন, ‘যেকোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় যারা দায়ী, আইনের আওতায় এনে তাদের শাস্তির জন্য আমরা সব সময় লড়াই করি। এই নির্যাতন চূড়ান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত আমরা করব। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা তা গণমাধ্যমকেও জানাব।’

ঘটনার পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) আলাদা দুটি দল তদন্তের অংশ হিসেবে নোয়াখালী গেছে বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির। সেসব দলের সদস্যরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নারী, তার স্বামী ও সন্তানের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘রুহুল আমীনের নির্দেশে ধর্ষণ হলেও ভিকটিম (ভুক্তভোগী) তার নামটি এজাহারে উল্লেখ করেনি বলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এলাকার লোকেরাও একই কথা বলেছে। ভিকটিম কিছুটা সুস্থ হলে তাকে সাহস দিয়ে তার কাছ থেকে রুহুল আমীনের ব্যাপারে তথ্য নেওয়া হবে।’

খুশী আরও জানান, তাদের তদন্ত দল এলাকাবাসীসহ স্মারকলিপি দিয়েছে।  হাসপাতালে ভুক্তভোগীর দেখাশোনা করা হচ্ছে। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় আমরা শক্ত অবস্থান রাখব এবং মানবাধিকার কমিশন যে তদন্ত টিম পাঠিয়েছে, তারাও সব পর্যবেক্ষণ করছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার বিচার আমরা পাব। সে যদি সুস্থ হয়ে এজাহারে রুহুল আমীনের নাম যুক্ত করতে ভয় পায়, তাহলে আমরা ওই অপরাধীর বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে যতটুকু আন্দোলন করা যায়, করব।’

নোয়াখালীর পুলিশ সুপার ইলিয়াস শরিফ জানান, চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) খন্দকার গোলাম ফারুক ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়েছেন। তিনি আরও জানান, মামলায় সোহেল (৩৫), হানিফ (৩০), স্বপন (৩৫), চৌধুরী (২৫), বেচু (২৫), বাদশা আলম ওরফে কুড়াইল্যা বাসু (৪০), আবুল (৪০), মোশাররফ (৩৫) ও ছালা উদ্দিনের (৩৫) নাম উল্লেখ করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার কুড়াইল্যা বাসুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের দিন সোহেল ও স্বপনকে গ্রেপ্তার করে চরজব্বার থানা পুলিশ। 

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিবৃতি : এদিকে নির্যাতনের শিকার গৃহবধূর সুচিকিৎসা, তার ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, আসক, নারীপক্ষ ও হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন সকালে ভোটকেন্দ্রে গেলে এলাকার আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা রুহুল আমীন ওই নারীকে নৌকা প্রতীকে ভোট দিতে বলেন। তিনি রাজি না হওয়ায় তাকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হয়। এরপর রাত ১২টার দিকে ক্ষুব্ধ রুহুল আমীনের নেতৃত্বে এলাকার সন্ত্রাসী মোশাররফ, সালাউদ্দিন, সোহেলসহ ১০-১২ জন ওই গৃহবধূর বাড়িতে হামলা করে এবং ঘরে ঢুকে তাকে ও তার স্বামীকে পিটিয়ে আহত করে এবং গৃহবধূকে ধর্ষণ করে।’

ঘটনার প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

গত রবিবার দুপুরে চরজুবলী ১৪ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে যান ওই গৃহবধূ। ফেরার পথে স্থানীয় সোহেলের সঙ্গে তার বাগ্্বিতণ্ডা হয়। তিনি বাড়িতে চলে যাওয়ার পর ক্ষিপ্ত হয়ে সোহেল সহযোগীদের নিয়ে রাতে গণধর্ষণ করে বলে অভিযোগ গৃহবধূর।