আন্দোলন নয়, ট্রাইব্যুনালে যাবে ঐক্যফ্রন্ট

৩০ ডিসেম্বরের আগে নির্বাচন থেকে সরে আসতে বিএনপির প্রার্থীদের কেউ কেউ অনুরোধ জানিয়েছিলেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে। তখন তিনি প্রার্থীদের স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, ভোট শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সরে আসা যাবে না। এ নিয়ে দলের প্রার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। এ অবস্থায় গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলীয় প্রার্থীদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন মহাসচিব। বৈঠকে উপস্থিত জামালপুর-৩ আসনের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল দেশ রূপান্তরকে প্রার্থীদের ক্ষোভের প্রতিক্রিয়ায় মির্জা ফখরুল কী বলেছেন তা জানান। বলেন, মির্জা ফখরুল বলেছেন, আমি এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকার সিদ্ধান্ত নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সবার সঙ্গে আলাপ করে দিয়েছি। বাবুল বলেন, বৈঠকে মির্জা ফখরুল নির্বাচনে অনিয়মের তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরে আগামী ৭ দিনের মধ্যে প্রার্থীদের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আপিল করার পরামর্শ দিয়েছেন। এজন্য প্রার্থীদের হাতে একটি করে ফরম তুলে দেওয়া হয়। তবে বৈঠকে মহাসচিব যে পরামর্শ দিয়েছেন, তার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ৫ বছরের বৈধতা দেওয়া হলো। কারণ নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করলে তার ফয়সালা হতে হতে পাঁচ বছর চলে যায়। বিগত দিনে যারা আপিল করেছেন তাদের এভাবে বছরের পর বছর পার করতে হয়েছে। ততদিনে সংসদের নির্ধারিত ৫ বছর মেয়াদ পার হয়ে যায়। ক্ষোভের সুরে তিনি বলেন, জাতিসংঘসহ যাদের ভরসায় বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকল তাতে কি লাভ হলো? তারা কি বিএনপির সঙ্গে শেষ পর্যন্ত থাকল? থাকল না। কারণ নির্বাচনের পরে জাতিসংঘ যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এড়াতে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।  

গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ব্যাপক কারচুপির বিষয়ে’ জানতে গতকাল গুলশান কার্যালয়ে ডাকা হয়েছিল বিএনপি প্রার্থীদের। দুপুরে গুলশান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অংশ নেন ১৭৮ জন প্রার্থী। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেউ কেউ ঢাকায় থাকলেও এ বৈঠকের বিষয়ে তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। বৈঠকের শুরুতে বিএনপি মহাসচিব ফখরুল সূচনা বক্তব্যে বলেন, নির্বাচন থেকে সরে আসার বিষয়ে দলের কোনো কোনো প্রার্থী তার কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নির্বাচনে থাকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা এককভাবে নেননি। লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনসহ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করেই নির্বাচনে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, এখন কঠিন সময়। এই মুহূর্তে ভুল বোঝাবুঝির কোনো সময় নেই। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে সবকিছু মোকাবিলা করতে হবে।

রুদ্ধদ্বার বৈঠকে দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন আজিজুল বারী হেলাল, মেজর (অব.) শাহজাহান ওমর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নির্বাচিত বিএনপি দলীয় প্রার্থী হারুন অর রশীদসহ কয়েকজন। তারা তাদের বক্তব্যে নিজ নিজ এলাকার ‘নির্বাচনে কারচুপির তথ্যপ্রমাণ’ তুলে ধরেন। বৈঠক শেষে হেলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তিনি নীতিনির্ধারকদের জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকা যায় না। খোদ প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ঐক্যবদ্ধভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। বিএনপি রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করতে পারে। কিন্তু প্রতিপক্ষ পুলিশ হলে তাদের সঙ্গে টিকে থাকা সম্ভব নয়।

শাহজাহান ওমর দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৈঠকে তিনি তার নির্বাচনী এলাকার অনিয়মের কথা তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি বিএনপির পক্ষ থেকে যে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল তার সমালোচনা করেন। এ সময় মির্জা ফখরুল তাকে দলীয় ফোরামে এ বিষয়ে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ঐক্যফ্রন্টের এই বৈঠকে এসব বিষয় তুলে ধরা ঠিক হবে না।  

বৈঠক শেষে ফ্রন্টের মুখপাত্র বিএনপি মহাসচিবের নেতৃত্বে সাত সদস্যর প্রতিনিধিদল অবিলম্বে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবিতে স্মারকলিপি দিতে যায় ইসিতে। যাওয়ার আগে গুলশানে উপস্থিত সাংবাদিকদের মির্জা ফখরুল বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদে যোগ দিচ্ছে না বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করলে আবার শপথ থাকে নাকি? নির্বাচনের নামে নিষ্ঠুর প্রতারণা ও প্রহসন করা হয়েছে অভিযোগ করে মির্জা ফখরুল বলেন, এ কারণে ঐক্যফ্রন্ট ফল প্রত্যাখ্যান করে পুনর্র্নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে।

জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুষ্ঠু ভোটের দাবি জানাবে ফ্রন্ট : বৈঠকে অংশ নেওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রার্থীদের কাছ থেকে ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল, ভোট ডাকাতির তথ্য ও অভিযোগের প্রমাণ সংগ্রহের মাধ্যমে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে অভিযোগ আকারে দেওয়া হবে নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে। আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশি কূটনীতিকদেরও বিষয়গুলো জানানো হবে। বিদেশি কূটনীতিকদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলা হবে যে, আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো সুষ্ঠু ভোট হওয়া সম্ভব নয়। তাই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি সুষ্ঠু ভোটের দাবি জানাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।