ভোটের রাতে ধর্ষণ

হুমকির মুখে নিপীড়িতকে কেবিনে স্থানান্তর

আসামিদের পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়ায় নিরাপত্তাহীনতার কারণে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ভোটের রাতে ধর্ষণের শিকার গৃহবধূকে হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ড থেকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে। এদিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত হিসেবে সন্দেহভাজন আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে একজনকে ওই ঘটনার ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ বলছে পুলিশ। নোয়াখালী সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. খলিলুর রহমান গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ধর্ষণের শিকার ওই নারীর স্বামী মামলার আসামিদের পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়ার ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ করায় তাকে জেলা পুলিশের পরামর্শে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়েছে। ভেতরে নারী পুলিশ সদস্য ও বাইরে পুরুষ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।

হাসপাতালে ওই নারীর স্বামী বলেন, ‘আমার ঘর-ভিটা ছাড়া এলাকায় কোনো সম্পত্তি নাই। এতএব কারো সাথে কোনো শত্রুতাও নাই। ধানের শীষে একটি ভোট দেওয়ায় তারা আমাদের ওপর এ অত্যাচার করল। ধর্ষণের শিকার নারী বলেন, বাড়িতে তার ছেলেমেয়েরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। রুহুল আমিনকে ছাড়া না পেলে তার ছেলেমেয়েদেরকে মাটির তলায় লুকিয়ে ফেলবে বলে গ্রাম্য ডাক্তার সোহেল, একরামনগরের ইব্রাহিম, হাশিম ও জনু মাঝি বাড়ি গিয়ে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে।’

ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার দুজন হলেন হাসান আলী বুলু (৬০), যিনি সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক রুহুল আমিনের ‘প্রধান সহযোগী’ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। আর জসিম উদ্দিন (৩০) সুবর্ণচরের চরজুবলী ইউনিয়নের মধ্যম বাগ্যা গ্রামের মোতাহের হোসেনের ছেলে। তিনি পেশায় একজন কলা বিক্রেতা।

নোয়াখালীর পুলিশ সুপার মো. ইলিয়াছ শরীফ বলেন, মামলার এজাহারে বুলু বা জসিমের নাম ছিল না। তবে পুলিশ তদন্তে নেমে ঘটনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা পায়। দুজনের মধ্যে জসিমকে গতকাল শুক্রবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে চট্টগ্রামের নাজিরহাট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে চরজব্বার থানা পুলিশের একটি দল। পরে চট্টগ্রামের ডাবলমুরিং থানার পশ্চিম মাদারবাড়ি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় হাসান আলী বুলুকে।

গত ৩০ ডিসেম্বর ভোটের রাতে সুবর্ণচরের মধ্যবাগ্যা গ্রামে ওই ধর্ষণের ঘটনার পর এ পর্যন্ত মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে একজন সাবেক ইউপি সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, চারজন ইটভাটা শ্রমিক। মামলার অপর আসামিদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে চরজব্বার থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইব্রাহিম খলিল জানিয়েছেন।

ধর্ষণের শিকার ওই নারীর অভিযোগ, ভোটের সময় নৌকার সমর্থকদের সঙ্গে তার কথাকাটাকাটি হয়েছিল। এরপর রাতে সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক রুহুল আমিনের ‘সাঙ্গপাঙ্গরা’ বাড়িতে গিয়ে তাকে ধর্ষণ করে।

পুলিশ সুপার মো. ইলিয়াছ শরীফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাসান আলী বুলু ওই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী। ভোটকেন্দ্রে তার সঙ্গেই ওই নারীর ঝামেলা হয়েছিল। পরে সে ১০ হাজার টাকায় কয়েকজন ইটভাটা শ্রমিককে ভাড়া করে।

চরজব্বার থানায় ওই নারীর স্বামীর দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিরা তার বসতঘর ভাঙচুর করে, ঘরে ঢুকে বাদীকে পিটিয়ে আহত করে এবং সন্তানসহ তাকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে দলবেঁধে ধর্ষণ করে। এজাহারে মোট নয়জনকে আসামি করা হলেও সেখানে চর জুবলী ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য রুহুল আমিনের নাম না থাকায় বুধবার রাতে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুকের কাছে হতাশা প্রকাশ করেন ওই নারী।

এরপর সেই রাতেই জেলা সদরের একটি হাঁস-মুরগির খামার থেকে রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এ ঘটনার সঙ্গে দলীয় সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করলেও রুহুল আমিন গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে দল থেকে বহিষ্কারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা।

নির্যাতনের শিকার ওই নারী এখন নোয়াখালী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ডাক্তারি পরীক্ষায় তাকে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে জানিয়ে এরই মধ্যে প্রতিবেদন দিয়েছে মেডিকেল বোর্ড।