জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উচ্চ আদালত প্রায়ই বিভিন্ন আদেশ, রায় ও নির্দেশনা দিয়ে থাকে। কিন্তু এসব নির্দেশনা আদতে পুরোপুরি পালন ও বাস্তবায়ন হয় না। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ প্রতিনিয়তই উদাসীনতা, নিষ্ক্রিয়তা ও অবহেলার পরিচয় দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, রাজনৈতিক মদদপুষ্ট প্রভাবশালীদের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। যদিও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা পালন সবার জন্য বাধ্যতামূলক এবং তা অবজ্ঞা করা হলে সেটি হবে আদালত অবমাননার শামিল। আর যত প্রভাবশালীই হোক, নির্দেশনা অমান্যকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এ বিষয়ে জনসাধারণকে আরও সচেতন হতে হবে বলেও মনে করছেন তারা।
মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে সড়ক দুর্ঘটনারোধ, হাইড্রোলিক হর্ন, নদীদূষণ বন্ধসহ জনগুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন সময়ে রিট আবেদন করা হয়। এসব মামলায় বিভিন্ন সময়ে উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশনাও আসে। এইচআরপিবির সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা জনস্বার্থে এ পর্যন্ত ২৮০টি মামলা করেছি। এর মধ্যে ৫০টি মামলায় রায় ও নির্দেশনা এসেছে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, জনস্বার্থে আদালতের নির্দেশনার পরও তা কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের কেউ কেউ নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা প্রভাবশালী বা অর্থশালী এবং যাদের বিরুদ্ধে আদালতের রায় যায় তারা বিভিন্নভাবে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে।’
সড়কে নানা অব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরেই বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। ২০০৯ সালের জুনে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের (পরে প্রধান বিচারপতি) নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রায়ে ২০১০ সালের মধ্যে দেশের সব সড়কযানে গতি নিয়ন্ত্রক যন্ত্র স্থাপন, সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা, সব ট্রাফিক সদর দপ্তরে গতি নিয়ন্ত্রক মনিটরিং ব্যবস্থা স্থাপনসহ আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। স্বরাষ্ট্র, সংস্থাপন ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং বিআরটিএ-কে (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ) এসব নির্দেশনা কার্যকর করতে বলা হয় রায়ে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও ওই রায় বাস্তবায়ন করা হয়নি। এ ছাড়া ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বিচারপতি জিনাত আরার নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সড়ক দুর্ঘটনারোধে পাঁচ দফা নির্দেশনা দেয়। এতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০০১-এর ৮ বিধি অনুযায়ী মহাসড়কের পাশে ১০ মিটারের মধ্যে স্থাপনা তৈরিতে অনুমতি দেওয়ার বিধান বাতিল, নির্দেশনার পাঁচ বছর পর চালকদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি পাস নির্ধারণ, গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে ডিভাইডার তৈরি এবং পথচারীদের জন্য প্রয়োজনীয় আন্ডারপাস নির্মাণ, স্কুলের সিলেবাসে ট্রাফিক নিয়ম অন্তর্ভুক্ত করা এবং মোটরযান অধ্যাদেশ আইন সংশোধন করে অপরাধের সাজা ও জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোর কথা বলা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হলেও হাইকোর্টের এসব নির্দেশনা ও আদেশ যেমন বাস্তবায়ন হয়নি, তেমনি সড়কে মৃত্যুর মিছিলও থামেনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পুরো রাজধানীর প্রায় সব ফুটপাত হকারদের দখলে; যা ট্রাফিক জ্যামের অন্যতম কারণ। এ ছাড়া ফুটপাত দখলে থাকায় জনভোগান্তিও চরমে পৌঁছেছে। মতিঝিল, গুলিস্তান, পল্টন, সদরঘাট এলাকার ফুটপাতে এ চিত্র আরও ভয়াবহ। অথচ ফুটপাত দখলমুক্ত করতে একাধিকবার হাইকোর্ট থেকে আদেশ ও নির্দেশনা এসেছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতায় এ চিত্র পাল্টায়নি খুব একটা। ২০০১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এক রায়ে রাজধানীর ফুটপাত ও চলাচলের পথকে জনসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী এবং পথচারীদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। এ ছাড়া জিরো পয়েন্ট থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ২০১২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আদেশ দিয়েছিল হাইকোর্টের অন্য একটি বেঞ্চ। কিন্তু আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় ফুটপাতগুলো এখনো হকারদের দখলে। জনসাধারণকে ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
দুর্বোধ্য ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) যেন বিড়ম্বনার আরেক নাম। প্রেসক্রিপশনে চিকিৎসকদের লেখা এতটাই অপাঠযোগ্য ও দুর্বোধ্য যে, প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়তে হয় রোগী-স্বজন ও ওষুধ বিক্রেতাদের। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রতিকারের জন্য হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়। পরে ২০১৭ সালের ১০ জানুয়ারি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এক আদেশে প্রেসক্রিপশন পড়ার উপযোগী করতে ও প্রয়োজনে কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে প্রেসক্রিপশনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ ও রুল জারি করে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাইকোর্টের ওই আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো উদাসীন চিকিৎসকরা। তারা আগের মতোই দুর্বোধ্যভাবে প্রেসক্রিপশন লিখছেন। ফলে ভোগান্তিও বাড়ছে।
বিভিন্ন যানবাহনে থাকা পরিবেশ দূষণকারী হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ ও তা বন্ধে পদক্ষেপ নিতে ২০১৭ সালে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। পাশাপাশি ঢাকার পাঁচটি এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকার যেসব স্থানে বেশি শব্দদূষণ হয় পর্যবেক্ষণ দল গঠন করে সেসব স্থানে শব্দদূষণের মাত্রা নির্ধারণ এবং শব্দ যাতে বেশি না হয় সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে হাইকোর্টের আদেশের পরও রাজধানীসহ সারা দেশের চিত্র পাল্টায়নি। যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার আগের মতোই চলছে। বিকট শব্দে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে প্রতিনিয়তই।
ঢাকার পাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীকে রক্ষা করতে নদী তীরবর্তী অবৈধ স্থায়ী ও অস্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদে ২০০৯ সালের জুনে এক আদেশে নদীর সীমানা নির্ধারণ করে সীমানায় পাকা খুঁটি বসানো, নদীর তীরে হাঁটার পথ নির্মাণ, নদীর তীরে বনায়ন ও নদীগুলো খনন করাসহ ১২ দফা নির্দেশনা দেয়। ভূমি, স্বরাষ্ট্র, অর্থ, নৌপরিবহন, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। তবে হাইকোর্টের নির্দেশে নদী রক্ষায় বিভিন্ন সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও আদতে তা আলোর মুখ দেখেনি।
২০১২ সালে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এক রায়ে ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দায়ী চালকের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পুলিশ বিভাগকে নির্দেশ দেয়। এ ছাড়া ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালালে সড়ক পরিবহন আইনেও শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু রাজধানীতে মূল সড়কে ট্রাফিক সিগন্যাল ও যানজট শুরু হলেই ফুটপাতগুলোতে দাপটে ও অবাধে মোটরসাইকেল চলাচল করছে। এরপর ২০১৭ সালের অক্টোবরে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এক আদেশে ঢাকনাবিহীন ট্রাক কিংবা ভ্যানে বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহন বন্ধ এবং রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণে পদক্ষেপ নিতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়। কিছুদিন এ আদেশ পালন করা হলেও এর ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘সংবিধানের বিধানে আদালতের আদেশ কার্যকর করার কথা বলা আছে। কেউ যদি সেই নির্দেশনা কার্যকর না করে, তাহলে সংবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা আছে। সংশ্লিষ্ট অমান্যকারীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার ব্যবস্থা নেওয়া যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা জনস্বার্থে মামলা করেন তারা হয়তো অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরবর্তী সময়ে আর লেগে থাকেন না। যে কারণে কিছু ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনাও ওইভাবে কার্যকর হয় না। তাই শুধু মামলা করলেই হবে না, লেগেও থাকতে হবে।’
এ বিষয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে জনসংখ্যা, যানবাহনসহ সবকিছু বেড়েছে, সমস্যাও বেড়েছে। তাই কিছু ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। তবে আদালতের নির্দেশনার পরও যে তা কার্যকর হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। যেসব নির্দেশনা সরকার বা স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষ বাস্তবায়ন করতে পারে, কিন্তু করে না সেক্ষেত্রে আদালত অবমাননার অভিযোগের ব্যবস্থা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের মানুষ যদি সচেতন না হয়, তাহলে রাষ্ট্রই বা কী করবে? তাই শুধু সরকারের ওপর নির্দেশ দিলেই হবে না, জনগণকে আরও মনোযোগী ও সচেতন হতে হবে।’