দেশে গবাদি পশু পালনে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে পশু পালনের ঝুঁকিও। গরু-ছাগলসহ অন্য পশুর সবচেয়ে মারাত্মক জীবনঘাতী রোগ হলো খুরা ও পিপিআর (পেস্ট ডেস পেটেটিস রুমিনেন্ট) রোগ। এ রোগে আক্রান্ত পশুর ৮০ শতাংশেরই থাকে মৃত্যুঝুঁকি। রোগ দুটি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলে গবাদি পশু লালন-পালন ব্যাপক হারে বাড়বে। এ প্রেক্ষাপটে পিপিআর ও খুরা রোগ নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশব্যাপী এ রোগ দুটির ভ্যাক্সিন বিতরণে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো পশুসম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে- ছাগলের জন্য পিপিআর এবং গরুর জন্য খুরা রোগ খুবই মারাত্মক। এজন্য আমরা এই ভ্যাক্সিন উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করতে চাই। নতুন এ প্রকল্পের মাধ্যমে রোগ দুটির টিকা উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়েও জোর দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা আগে উৎপাদনে যাব। নিজেদের সক্ষমতা বাড়াব। এরপরও যদি না পারি তাহলে বাকিটা আমদানি করব। কিন্তু উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতার দিকেই আমাদের নজর থাকবে বেশি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুসারে, ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে দেশে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৪৭ লাখ ৪৫ হাজার। যা আগের বছরের চেয়ে ৩ লাখ ৮৮ হাজার বেশি। এর মধ্যে গরুর সংখ্যা বেড়েছে দেড় লাখ।
অধিদপ্তর বলছে, বিগত কয়েক বছরে মাংসের দাম বাড়ায় গবাদিপশু পালনে আগ্রহী হয়েছেন দেশের খামারিরা। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে পশুর খামার স্থাপনে বেশ আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। এর বাইরে গ্রামগঞ্জে ব্যক্তি পর্যায়ে গরু-ছাগল লালন-পালনও বেড়েছে।
প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রাণিসম্পদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি প্রাণঘাতী রোগ। এর মধ্যে রয়েছে- বিভিন্ন ভাইরাসজনিত খুরা, তড়কা, বাদলা, হাঁস-মুরগির রানিক্ষেত, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডাক-প্লেগ ও ছাগলের পিপিআর। তবে অন্যসব রোগের চেয়ে খুরা ও পিপিআর বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এজন্য রোগ দুটি নিয়ন্ত্রণে ভ্যাক্সিন দেওয়া জরুরি।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ছাগল ও ভেড়ার ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ পিপিআর রোগের টিকা আবিষ্কার করে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)। যশোর ও মানিকগঞ্জ জেলায় দীর্ঘ গবেষণার পর বিএলআরআই পিপিআর রোগ দমনে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়। এখন খামারিরা একটু সচেতন হলেই এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এ প্রেক্ষাপটে ‘পিপিআর রোগ নির্মূল ও খুরারোগ নিয়ন্ত্রণ’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। পরিকল্পনা কমিশনে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবও পাঠিয়েছে অধিদপ্তর। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর সময়ে তা বাস্তবায়নের সময় পাবে অধিদপ্তর।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে দেশব্যাপী পিপিআর ও খুরারোগের ভ্যাক্সিনের সরবরাহ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। ফলে রোগ প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়বে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল নাগাদ দেশের ক্রমবর্ধনশীল জনসংখ্যার চাহিদা পূরণের জন্য প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বাড়াতে হবে। দেশে জমি-স্বল্পতার কারণে প্রাণিজ আমিষের এই চাহিদা পূরণের জন্য গবাদিপশুর সংখ্যা ও উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে সবচেয়ে বড় বাধা বিভিন্ন রোগের আক্রমণ। ফলে এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য আসিফ-উজ-জামান বলেন, প্রকল্পটির মাধ্যমে পশুর প্রাণঘাতী রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকা দেওয়া ও স্বেচ্ছাসেবী ভ্যাক্সিনেটর নিয়োগ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাচাই ও নমুনা সংগ্রহ করা হবে। এ ছাড়া পিপিআর ও খুরারোগের ভ্যাক্সিন উৎপাদন সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। ফলে পশুসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে।
গুরুত্ব বিবেচনায় আগামী একনেক বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।