কেদারনাথ : অনেক দিন পর এমন প্রেমকাহিনী

শীতের মৌসুমে এমনিই বাঙালির প্রেম পায়। সারা শহর শালমুড়ি দিয়ে সেজে ওঠে। ‘কেদারনাথ’-এর মতো ছবি তার সঙ্গে শুধু আলাদা মাত্রা যোগ করে দিল। আহা! কত দিন পর এমন মেলোড্রামা! এমন ছবি দেখে বেরিয়ে মনে হয়, প্রেমের গল্প ঠিকভাবে বলতে পারলে, আজও তা উত্তরে হাওয়ার মতোই কাঁপিয়ে দেবে!

উত্তরাখন্ডের বন্যা এ ছবির নেপথ্য কাহিনী। কিন্তু সেই ভয়াবহতা ছাপিয়ে যায় প্রেম। এ যেন কলেরার দিনগুলোতে প্রেমের মতোই। সারা আলি খানের অভিনয় দেখতে দেখতে চোখে জল আসতে পারে। আবার প্রেমে পড়েও যেতে পারেন। শীতের বেগুনি ফুলের মতোই তার উপস্থিতি। অথবা লাল-নীল টুনির মতো। চনমনে। বিপরীতে সুশান্ত সিংহ রাজপুত। জুটি বটে তারা। অবশ্য অভিনয়কে পাল্লা দেয় লোকেশন। এক-একটা শট দেখে মনে হচ্ছিল, বুঝি ক্যালেন্ডারের পাতায় ঢুকে যাচ্ছি। হিমাচল যাওয়ার চির খোয়াব মিটে যেতে পারে এ ছবি দেখে।

রোমিও-জুলিয়েটের মতো টানটান প্রেম। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অমিত ত্রিবেদীর আবহ। পাহাড়ি কেদারনাথ উমাপ্রসাদের কল্যাণে বাঙালির মানসপটে চিরকালের জন্য আঁকা। যুগ যুগ ধরে সেখানে আসছেন মানুষ। তেমনই এক পণ্ডিত পরিবারের মেয়ে সারা ও তার দিদি। প্রতি মাসেই নতুন নতুন প্রেম নিয়ে ছেলেখেলা তার। এমনকি, দিদির বিয়ের পাত্রের সঙ্গেও খেলে ফেলে। তার বদলায় সারার প্রেমিককে ঘিরে বদলা নেয় দিদি।

কিন্তু এই বদলা থেকেই বোন বদলে যায়। সে তার জীবন দিয়ে উঠেপড়ে প্রমাণ করতে লাগে, সে-ও সৎভাবে প্রেম করতে পারে। দরকারে প্রাণ বাজি রাখতেও পিছু হটে না। এখান থেকেই ছবির ক্লাইম্যাক্স শুরু হয়।

ছবির শেষে অনেক ভিএফএক্স এবং হলিউডি কায়দা আছে। আছে প্রেমের জন্য কাঁদোকাঁদো মেলোড্রামা। ভেসে যাওয়া উত্তরাখণ্ড। ভেঙে পড়া পাহাড় ও মাটি। তবু সুশান্তের নাছোড় জেদ। এমন প্রেম কি পরিণতি পাবে? জানা নেই। তার জন্য দেখতে হবে এ ছবি। তবে আমার কাছে ক্লাইম্যাক্সের আগের চলনই শ্রেষ্ঠ মনে হয়। প্রেমের পাওয়ার প্লে, রিভেঞ্জ অনেক বেশি সুন্দর ক্লাইম্যাক্সের থেকে। ভারত বা দুনিয়ায় প্রেমের গল্প কম নেই। তাতে এমন ভয়ানক ক্লাইম্যাক্সও প্রচুর। তাই মাঝের প্রেমের চলন এ ছবিতে খুব জীবন্ত মনে হয়। বিশ্বাস করতেও ইচ্ছে করে।

আবহ, অভিনয়, সম্পাদনা, ক্যামেরা সবকিছুই নিপুণ ছন্দে বাঁধা। অনেক দিন পর এমন ব্যালান্সড ছবি দেখলাম। সাম্প্রতিককালের অন্যধারার প্রেমের হিন্দি ছবি অন্ধাধুন বা স্ত্রীর চেয়েও ভালো লাগে এ ছবি। চোখের বালির মতো উপন্যাসের পরিণতি নিয়ে রবীন্দ্রনাথকে আধুনিকদের তরফে বুদ্ধদেব বসু যথেষ্ট সমালোচনা করেন। রবিঠাকুর তা মেনেও নেন। অনেক বড় শিল্পের ক্ষেত্রেই এই অসংগতি চোখে পড়ে। ক্লাইম্যাক্সে এসে সুতো হারিয়ে যায়। এ ছবিকেও ক্লাইম্যাক্সের বাড়বাড়ন্ত অনাধুনিক করে দেয়।

তবু কোথাও এ ছবি মায়া রেখে যায়। ছবি দেখে বেরিয়ে বারবার মনে হয়, এমন প্রেমের কাহিনী কত দিন পর দেখলাম। এত টানটান যে কলেজপ্রেম মনে পড়ে। শীতের বেলা ফুরিয়ে আসে। মনে হয়, কোথাও মায়া রয়ে গেল। নাকছাবিটি হারিয়ে গেছে হলুদ বনে বনে...