সুবর্ণচরে ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক

সুবর্ণচরে তিন সন্তানের জননী এক গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ-ধর্ষণের ঘটনা দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা-নিপীড়ন-নির্যাতনের ভয়াবহতার চিত্রটি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। নোয়াখালীর প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে এই সংঘবদ্ধ-ধর্ষণ প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচন-পরবর্তী সন্ত্রাসের কাতারে পড়ে। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবানদের দুর্বল প্রতিপক্ষের ওপর নিপীড়নের আরেকটি দৃষ্টান্ত এই ঘটনা। কিন্তু সারা দেশে বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা নারী নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন এবং ধর্ষণ-সন্ত্রাসের ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে একে বিচ্ছিন্ন করে দেখার উপায় নেই। তাতে সমাজে নারী-নিগ্রহের প্রকৃত সত্যটি চাপা পড়ার আশঙ্কা থাকে।

ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের বিচার না হওয়াকেই সমাজে এমন জঘন্য অপরাধ বিস্তারের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে চিহ্নিত করেছেন মানবাধিকারকর্মী, অপরাধবিজ্ঞানী ও সমাজ বিশ্লেষকরা। ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে, ধর্ষণ করে হরহামেশাই ক্ষমতাবানরা পার পেয়ে না গেলে সমাজে এমন অপরাধ কমত বলে অনেকেই মনে করেন। পাশাপাশি ধর্ষণ কিংবা নিপীড়নের শিকার নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য। কেননা, সমাজ নিপীড়নের শিকারের প্রতি সংবেদনশীল না হওয়ায় অনেক সময় তা আড়ালের চেষ্টা করা হয়। তবে, আশার কথা হলো আগের তুলনায় এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছে। এখন যৌন নিপীড়ন কিংবা ধর্ষণের বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা সরব হচ্ছেন, পরিবার ও সমাজও তাদের পাশে থাকতে এগিয়ে আসছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিচার ব্যবস্থা ও পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা। ধর্ষিত নারীর সামাজিক অবস্থান দুর্বল হলে পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে বলে অনেক অভিযোগ আছে। অনেক সময় মামলা হলেও আসামি প্রভাবশালী হওয়ার কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। আর বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক নারী বা তার পরিবারের পক্ষে খরচ চালিয়ে দীর্ঘদিন লেগে থেকে বিচার পাওয়ার সুযোগ হয় না। এ ক্ষেত্রে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের ঘটনায় আশাব্যঞ্জক খবর হলো, ভয়াবহ এই গণধর্ষণের মামলার নয় আসামির মধ্যে সাতজনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে, বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কারণে প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে এই ধর্ষণের মদদদাতা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

সুবর্ণচরের সংঘবদ্ধ-ধর্ষণের রেশ কাটতে না কাটতেই সিলেটে আরেক নারী সংঘবদ্ধ-ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দেশে ধর্ষণের ঘটনা সম্পর্কিত পরিসংখ্যানগুলো খুবই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ৯৪২ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১৮২ জনই সংঘবদ্ধ-ধর্ষণের শিকার হয়, ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয় ৬৩ জন। এখানে, লক্ষ করার মতো বিষয় হলো ধর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে সংঘবদ্ধ-ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে এবং ধর্ষিতাকে হত্যা করার সংখ্যাও বাড়ছে। ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে তিন হাজার ৬০৪টি ধর্ষণের ঘটনায় ৪৯৫ জন নারী ও শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। আর পুলিশের তথ্যানুসারে, ২০১৬ ও ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ধর্ষণের অভিযোগে চার হাজার ৮০০-এর বেশি মামলা হয়েছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এসব সহিংসতার নেপথ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মতো বিষয়গুলো কাজ করে থাকে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে না পারলে ভয়াবহ এই সামাজিক অপরাধ থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। দেশে নারী শিক্ষার হার বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে কর্মজীবী নারীর সংখ্যাও। নারীর প্রতি সহিংসতা-নিপীড়ন-নির্যাতন বন্ধ করতে না পারলে সমাজে নারীর অংশগ্রহণ হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জনসংখ্যার অর্ধেক নারীকে অনিরাপদ রেখে সমাজ বা রাষ্ট্র এগোতে পারবে না। একটি উদার ও গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণে অবশ্যই ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধসহ নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।