ডলার সংকট

বিপিসির তেল খালাস বন্ধ ছিল নভেম্বরে

ডলারের সংকট থাকায় আন্তর্জাতিক ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইটিএফসি) কাছ থেকে নেওয়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে পারেনি রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক। গত নভেম্বরে নির্ধারিত সময়ের বেশ কয়েক দিন পর খণ্ড খণ্ড করে কিস্তি পরিশোধ করেছে ব্যাংক দুটি। জ্বালানি তেলবাহী কার্গো চট্টগ্রাম বন্দরে এলেও ঋণপত্রের (এলসি) মূল্য পরিশোধে দেরি হওয়ায় তেল খালাস বন্ধ রেখেছিল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান।

কিস্তি পরিশোধে দেরি হওয়ায় জরিমানার আশঙ্কা প্রকাশ করে বিপিসি এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকে চিঠি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। এতে আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ হচ্ছে বলে মনে করছে বিপিসি। ঋণের কিস্তি পরিশোধে দেরি না করতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংককে সতর্ক করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

‘বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশ কখনো নির্ধারিত সময় অতিক্রম করেনি’ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল একাধিক অনুষ্ঠানে এ কথা বলেছেন। এ অবস্থায় বিপিসির ঋণ পরিশোধে বিলম্বের ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করেছেন মন্ত্রণালয় দুটির কর্মকর্তারাও।

বিপিসি ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কয়েক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিপিসি সৌদি-আরামকো ও মারবান অপরিশোধিত তেল আমদানির জন্য আইটিএফসি থেকে ঋণ নিয়েছে। আইটিএফসির সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক ছয় মাস পরপর অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে ওই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করার কথা বিপিসির।

তারা জানান, গত ৫ ও ১১ নভেম্বর দুই কিস্তিতে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে আইটিএফসিকে ৫ কোটি ১৮ লাখ ১১ হাজার ৮৫৪ ডলার পরিশোধ করার কথা ছিল। সে মোতাবেক বিপিসি অগ্রণী ব্যাংককে সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধ করে বারবার তাগাদা দিতে থাকে। কিন্তু ডলার সংকটের কথা জানিয়ে অগ্রণী ব্যাংক নির্ধারিত সময়ে ওই অর্থ আইটিএফসিকে পরিশোধ করেনি। ১৪, ১৬ ও ১৯ নভেম্বর তিন কিস্তিতে অগ্রণী ব্যাংক ওই অর্থ পরিশোধ করেছে।

অন্যদিকে, জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে ৫ কোটি ৩৩ লাখ ৭২ হাজার ২১ ডলার কিস্তি দেওয়ার কথা ছিল ২১ নভেম্বর। ডলার সংকটের কথা জানিয়ে জনতা ব্যাংক ২৬, ২৭ নভেম্বর দুখন্ডে ওই কিস্তি পরিশোধ করেছে।

ঋণ পরিশোধে দেরি হওয়ায় গত ২৭ নভেম্বর বিপিসি এক চিঠিতে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সালাম আজাদকে জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরে আসা কয়েকটি কার্গো আগের জ্বালানি তেলের মূল্য পরিশোধ না হওয়ায় তেল খালাসে বিরত আছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের সুনাম ক্ষুণ হচ্ছে এবং দেশে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

২০ নভেম্বর বিপিসি এক চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক কাজী ছাইদুর রহমানকে জানায়, এলসি মূল্য পরিশোধ না করায় চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থিত ইনক-সিঙ্গাপুরের একটি কার্গো জ্বালানি তেল খালাস করছে না। ফলে বিপিসিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

এ দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে ৩১ ডিসেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। তাতে বলা হয়, ‘এলসি খোলা, ঋণ রি-পেমেন্টসহ ডলার লেনদেনের ক্ষেত্রে অগ্রণী ও জনতা ব্যাংক প্রায়ই এ ধরনের অসহযোগিতা করে থাকে। এতে যথাসময়ে অত্যাবশকীয় পণ্য জ্বালানি তেল আমদানিতে বিলম্ব সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ হচ্ছে মর্মে বিপিসি জানিয়েছে।’ 

এদিকে ঋণ পরিশোধে দেরি হওয়ার কারণে আইটিএফসির পক্ষ থেকে জরিমানা আরোপের আশঙ্কার কথা জানিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। ইআরডির মধ্যপ্রাচ্য-১ শাখার সহকারী প্রধান আছাদুল হক গত ১৫ নভেম্বর বিপিসির চেয়ারম্যান মো. শামসুর রহমান এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমকে এ তথ্য জানান। তার পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ৫ নভেম্বরের দুটি ও ১১ নভেম্বরের কিস্তিসহ মোট তিনটি বকেয়া কিস্তি ১৯ নভেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করে জরিমানা মওকুফের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. শামসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাংকগুলো ডলার সংকটের কথা বলে নভেম্বরে ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করেছে। আমার মনে হয়, তখন ডলারের কৃত্রিম সংকট হয়েছিল। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে সবসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের অগ্রাধিকার থাকে। এ খাতে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ডলার ব্যাংকগুলোকে দিতে চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারপরও ব্যাংকগুলো এমন করলে আমাদের আর কিছুই করার থাকে না। এ কারণেই আগে থেকে তাদের অবগত করতে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের এমডি সালাম বলেন, গত বছর বাজারে ডলার সংকটের কারণে অল্প কয়েক দিনের জন্য ঋণ পরিশোধে বিলম্ব হয়েছে। এখন সব ঠিক হয়ে গেছে। তবে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০ বছর ধরে আমরা বিপিসির সঙ্গে কাজ করছি। ঋণ পরিশোধে কোনো সমস্যা হয়নি। নির্বাচনের কারণে ডলারের চাপ থাকায় নভেম্বরে হয়তো কিছুটা হেরফের হতে পারে। কিন্তু কোনো ঋণ পরিশোধ হয়নি এমন নয়। বৈদেশিক ঋণ অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে।’