আনন্দ-বেদনায় মুহিতের বিদায়

 আমার কষ্টের আছে একটাই বিষয়, সেটি হলো প্রফেসর ইউনূস আমাদের বিরোধিতা করেই চলেছেন, খামাখা

নতুন মন্ত্রিসভায় শপথ নেওয়ার জন্য সবাই যখন রবিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে টেলিফোন পাচ্ছিলেন, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তখন মিরপুর শের-ই বাংলা স্টেডিয়ামে বিপিএল খেলা দেখছিলেন। ততক্ষণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জেনে গেছেন, নতুন মন্ত্রী পাচ্ছেন তারা। বিভিন্ন সময় অবসরে যেতে চাওয়া অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত শেষ সময়ে আরও এক বছর দায়িত্ব পালনের আগ্রহ দেখানোর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে করে এলেও শেষ পর্যন্ত থাকতে পারলেন না।

১০ বছরে দায়িত্ব পালনকালে আলোচিত-সমালোচিত নানা ঘটনা থাকলেও তার সময়েই জাতিসংঘের কাছ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রাথমিক সুপারিশপত্র পেয়েছে বাংলাদেশ। ওই মুহূর্তটিকে তিনি তার সাম্প্রতিককালের সেরা সময় বলে উল্লেখ করেছেন দেশ রূপান্তরের কাছে। গত অক্টোবরে ইন্দোনেশিয়ার পর্যটন নগর বালিতে বসে দেশ রূপান্তরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মুহিত বলেন, গত মার্চে যখন জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)’র কাছ থেকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রাথমিক সুপারিশ পেলাম, ওটাই ছিল অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমার সবচেয়ে সেরা সময়।

অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব পালনকালে ব্যাংক খাতে বড় ধরনের কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। সোনালী ব্যাংকের শেরাটন শাখা থেকে হলমার্কের ২৬৬৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। তার মেয়াদকালে ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এ সব ঘটনায় অর্থমন্ত্রীর বিভিন্ন বক্তব্য সংসদের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় তখনকার গভর্নর ড. আতিউর রহমানকে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনাও তখন দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করে।

২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সরানোর ঘটনাও সারা দেশে আলোচিত হয়। ওই সময়কার কথা স্মরণ করে মুহিত বলেছেন, ১০ বছর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছেন ওই ঘটনা থেকেই।

‘আমার কষ্টের আছে একটাই বিষয়, সেটি হলো প্রফেসর ইউনূস আমাদের বিরোধিতা করেই চলেছেন, খামাখা। তিনি ক্রিয়েটিভ জিনিয়াস। গ্রামীণ ব্যাংকের জবটা তিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি সেটা করেছেন। কিন্তু তিনি নিজেকে গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক ভেবে বসলেন। তার সঙ্গে আমার প্রবলেম তো সেখানেই। আমি তাকে বললাম, তুমি গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদটা এখন ছাড়ো। সে তো তা করল না। আমাকে উল্টা প্রস্তাব দিল, আমাকে চেয়ারম্যান করে দেন। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম যে, সে চেয়ারম্যান হলে এমডি’র কাজও সেই করতে থাকবে’- দেশ রূপান্তরকে বলেছেন মুহিত।

‘রাবিশ, স্টুপিড ও বোগাস’ শব্দ ব্যবহারে দক্ষ মুহিত। বিভিন্ন সময়ই এসব শব্দ ব্যবহার করে সমালোচিত আবুল মাল আবদুল মুহিত রাজনীতির মারপ্যাঁচের ঊর্ধ্বে উঠে সংসদের ভেতরে ও বাইরে প্রায়শই সত্যি কথা বলেছেন। বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় প্রকাশ্যেই আবদুল হাই বাচ্চুকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। তবে পারেননি। দেশে এত ব্যাংকের দরকার নেই জানালেও রাজনৈতিক কারণে যে নতুন নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে হচ্ছেÑ সে কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন ৮৬ বছর বয়স্ক মুহিত।

দেশের ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে নানা উদ্যোগ নিয়েও সফল হতে না পারা মুহিত নতুন মন্ত্রীর জন্য বেশ কিছু

সুপারিশ রেখে যাচ্ছেন বলে আগেই সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তিনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে যে ‘মিরাকল’ অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, অবসর সময়ে তা নিয়ে গবেষণা করবেন বলে ক’দিন আগেই এক অনুষ্ঠানে বলেছেন তিনি।