বিদায়ে বিষণ্ণ সচিবালয়ে চলছে বরণের প্রস্তুতি

বছরে বায়ান্ন সপ্তাহ, সপ্তাহে পাঁচ দিন এভাবে কারও সঙ্গে পাঁচ বছর, কারও সঙ্গে ১০ বছরের সম্পর্ক। এ সময়ে মন্ত্রিত্বের আনুষ্ঠানিক বেড়াজাল ছিঁড়ে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী মন্ত্রীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ান দূরে রেখে কর্মকর্তাদের চাওয়া ছিল পুরোনো মন্ত্রীরাই থাকবেন নতুন সরকারে। কিন্তু তাদের বেশিরভাগেরই নতুন মন্ত্রিসভায় জায়গা না হওয়ায় হতাশ হয়েছেন কেউ কেউ। দীর্ঘদিনের সহকর্মীকে বিদায় জানাতে তড়িঘড়ি প্রস্তুতি নিতে হয়েছে কর্মকর্তাদের। কোনো কোনো মন্ত্রীর বিদায় অনুষ্ঠানে কর্মকর্তারা স্মৃতিচারণ করতে থাকেন পুরোনো দিনের; সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশের।

গতকাল সোমবার দিনের প্রথমার্ধে বঙ্গভবনে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথগ্রহণের আগে সচিবালয়ে নেমে আসে পুরোনো মন্ত্রীদের বিদায়ের সুর। তড়িঘড়ি করে ফুলের তোড়া সংগ্রহ করে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিদায়ীদের বেশিরভাগই গতকাল শেষ দিনে মন্ত্রণালয়ে গেলেও দু-একজন ছাড়া ‘ফাইল ওয়ার্ক’ করেননি। দিনের শেষার্ধে শুরু হয় নতুন মন্ত্রীদের বরণ করার প্রস্তুতি। তবে নতুন মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্যই শপথের দিনে সচিবালয়ে না গেলেও অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছেন। আজ মঙ্গলবার থেকে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নিয়ে দপ্তরে বসবেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। সকালে নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীদের ফুল দিয়ে কে কীভাবে বরণ করবেনÑ তা চূড়ান্ত করেছেন কর্মকর্তারা।

গতকাল সকালে সচিবালয়ে গিয়ে দেখা যায়, অন্য দিনের মতো পাঞ্জাবি নয়, শার্ট-প্যান্ট, ব্লেজার ও টাই পরে এসেছেন বিদায়ী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সকালে বেশ কয়েকটি ফাইল দেখেছেন তিনি। নতুন মন্ত্রিসভায় তার না থাকার কথা রবিবার দুপুরে জানার পর তাকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন কর্মকর্তারা। কর্মচারীদের দুঘণ্টা সময় দিয়ে সব প্রস্তুতি শেষ করতে নির্দেশ দেন তারা। ওই সময়ের মধ্যেই বেশ কয়েকটি ফুলের তোড়া সংগ্রহ করা হয়, আনা হয় নাশতাও।

সাড়ে ১১টার দিকে অর্থমন্ত্রী চতুর্থ তলার নিজের কক্ষ থেকে তৃতীয় তলার অনুষ্ঠানস্থলে যোগ দেন। ওই সময় তার সঙ্গে ছিলেন নতুন সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবির, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মুসলিম চৌধুরীসহ দুই বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। দুপুর ১টার দিকে অনুষ্ঠান থেকে বের হয়ে নিজের কক্ষে যান মুহিত; সাংবাদিকদের আবদার অনুযায়ী তাদের সঙ্গে ছবি তোলেন। আড়াইটার দিকে মন্ত্রণালয় ছেড়ে যান তিনি।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘রবিবার সকাল পর্যন্ত নিশ্চিত ছিলাম যে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল মাল আবদুল মুহিতই থাকছেন। অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে আমি কয়েক দিন আগে মন্ত্রীকে আরও এক বছর থাকার জন্য অনুরোধ করি। তখন মন্ত্রী বলেছেন, ওটা সম্ভব হতে পারে। তখন থেকেই এ ধারণা ছিল।’ রউফ বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী থাকছেন না, আমার চিন্তায়ও আসেনি। সরকারের দুজন সচিব চেয়েছেন। ধারণা ছিল, তিনিই থাকবেন।’

বিদায় অনুষ্ঠানে মুহিতের সঙ্গে নিজের কর্মজীবনের সময়ের কথা উল্লেখ করে অর্থ বিভাগের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ শাখার উপসচিব বিলকিস জাহান রিমি বলেন, ‘একটি ফাইল সামান্য সংশোধনের জন্য একদিন ভয়ে ভয়ে অর্থমন্ত্রীর রুমে যাই। গিয়ে দেখি উনি অন্য একটি ফাইল দেখছেন। উনি আমাকে বললেন, তুমি ওখানে একটু বসো। ৫ মিনিট সময় দাও। অথচ আমরা যখন সিনিয়র কর্মকর্তাদের রুমে যাই, তারা আমাদের বসতেই বলেন না।’

বিদায়ী বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ গতকাল সচিবালয়ে আসার আগেই জনসংযোগ কর্মকর্তা লতিফ বকশীকে বলেন সাংবাদিকদের ডাকতে; কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে সম্মেলন কক্ষে বসতে। বেলা ২টার দিকে তোফায়েল সরাসরি সেখানে এলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেখতে না পেয়ে তাদের ডেকে আনার নির্দেশ দেন। তারা এলে বিদায়ী ভাষণ দিয়ে শপথ নিতে বঙ্গভবনে যান।

১৯৯৬ সালে বাণিজ্যমন্ত্রী হয়ে তোফায়েলের যোগদানের সময় কর্মরত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এমন একজন কর্মচারী গতকাল প্রায় কাঁদতে কাঁদতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই মেয়াদে গত ৯ বছর ধরে স্যারের দপ্তরে কাজ করলাম। স্যারকে খুবই আপন করে নিয়েছি। এখন বিদায়বেলায় খারাপ লাগছে।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বিদায় নিতে সকালেই দপ্তরে যান নুরুল ইসলাম নাহিদ। তবে তিনি কোনো ‘ফাইল ওয়ার্ক’ করেননি। পরে মন্ত্রণালয়ের সব বিভাগের কর্মকর্তারা বিদায় জানান তাকে। ওই সময় নাহিদ বলেন, ‘দীপু মনি অভিজ্ঞ। আগেও মন্ত্রিসভায় ছিলেন। আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। প্রশাসন চালাতে দক্ষ তিনি। আপনারা তাকে সহায়তা করবেন।’